করোনা ভাইরাস এবং যুব সমাজের ভূমিকা

আপডেট : ৩০ এপ্রিল ২০২০, ০০:৪৯

করোনার গ্রাসে সমগ্র বিশ্ব আজ থমকে গেছে, থমকে গেছে বিশ্বায়নের চাকা, থমকে গেছে বিশ্বের অর্থনীতির চাকা, থমকে গেছে মানুষে মানুষে সরাসরি যোগাযোগ। তৈরি হয়েছে বৈশ্বিক দূরুত্ব পাশাপাশি চলছে সামাজিক দূরুত্ব, শুধু টিকে আছে ভার্চুয়াল জগত। ভার্চুয়াল জগতই একমাত্র মাধ্যম যার মাধ্যমে   প্রত্যেকে প্রত্যেকের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে যাচ্ছে। এই করোনা সংকটকালে নেটওয়ার্কিং এর ক্ষেত্রে প্রযুক্তি একমাত্র উপায় যার মাধ্যম সকল প্রকারের যোগাযোগ রক্ষা করাসহ প্রত্যেকটি কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বিশ্বায়ন আজ বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক ডিভাইসের মধ্যে সীমাবদ্ধ, এর মাধ্যমেই চলছে সকল কার্যক্রম। বিভিন্ন সভা, উপস্থাপনা, সম্মেলন, পড়াশুনা, কোর্স, আউটসোর্সিং এমনকি ব্যবসা-বাণিজ্যও পরিচালিত হচ্ছে অনলাইনের মাধ্যমে। এই সকল প্রযুক্তি ব্যবহারে সবচেয়ে এগিয়ে যে জনগোষ্ঠী তারা  হলো যুব সমাজ। বর্তমানে বিশ্ব তারুণ্যের সদস্য ১.২ বিলিয়ন, যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ১৬%। এই যুব সমাজ আজকে সবচেয়ে বেশি প্রযুক্তিনির্ভর যারা কিনা সামনের সময়কে নেতৃত্ব দিবে।  

বৈশ্বিক অর্থনীতির সমান্তরালে বা তুলনামূলক দ্রুততর গতিতে এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ। জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা, সকল ক্ষেত্রে প্রযুক্তির পদচারণা এবং অর্থনীতির অগ্রগতি বিশ্বকে যখন নিয়ে যাচ্ছিল আরো নতুন সভ্যতার দিকে, তখন সাম্প্রতিক সময়ে করোনাভাইরাস এর আক্রমণে বিশ্ব হঠাৎই থমকে দাঁড়িয়েছে। করোনাভাইরাস সংকটের কবলে স্থানীয়, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অর্থনীতি এক বড় হুমকির মুখে। বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদগণ ইতোমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছেন, বিরাট এক অর্থনৈতিক মন্দার কবলে পড়তে যাচ্ছে বিশ্ব। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে লকডাউন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য স্থগিতাবস্থার বিরূপ প্রভাব ইতোমধ্যেই পড়তে শুরু করেছে। যার প্রভাব পূর্বের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।     

বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে দ্রুতগতিতে আগামীতে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি ও প্রভাবশালী হিসেবে গড়ে উঠতে আমরা বদ্ধ পরিকর, আর এই প্রত্যাশা এবং প্রতিজ্ঞার পেছনে মুল শক্তি যুব সমাজ। আর এই করোনাভাইরাস সংকট অবসান হওয়ার পরবর্তীতে প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়াবে অর্থনীতি ও প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারের সংকট। তারুণ্যনির্ভর দেশে এই সংকট মোকাবেলায় তরুণ সামাজকেই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব পালন করতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ যুবসমাজ যা প্রায় ৫ কোটি ৩০ লাখ। বাংলাদেশের এই যুব সমাজের মধ্যে মোট তারুণ্যের ৪৭% শিক্ষায় নেই, চাকরি করছেন এবং বিকল্প কর্মসংস্থান খুঁজছেন না এর মধ্যে পুরুষ রয়েছে ৮৭.২% এবং নারী রয়েছেন ১২.৮% । পাশাপাশি মোট তারুণ্যের ৩৮% শিক্ষায় নেই, কিন্তু চাকরি ও করছেন না এর মধ্যে নারী রয়েছে ৯২.৬% এবং পুরুষ রয়েছে ৭.৪%। বাকি ১৫% তারুণ্যের মধ্যে শিক্ষার্থী রয়েছে ৮% এবং অন্যান্য রয়েছে ৭%। 

বাংলাদেশের যে সকল তরুণ কর্মসংস্থানের মাধ্যমে অর্থনৈতিক খাতে অবদান রাখছেন তার মধ্যে কৃষিতে ২৪%, শিল্পতে ৩০% এবং সার্ভিসে রয়েছে ৪৬%। এর মধ্যে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ২১.০৯%, হাউসহোল্ড এ ১৫.৫৯%, সরকারি প্রতিষ্ঠানে ৩.৩৮%, এনজিও ০.৭৬, ব্যক্তিগত পর্যায়ে ৫৮.২৪% এবং অন্যান্য সেক্টরে ০.৯৫% কর্মরত রয়েছে যারা অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। 

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ যুবসমাজ। ৫.৩ কোটির এই বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে:

দক্ষ ও প্রশিক্ষিত করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত করাটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারলেই বাংলাদেশ ২০৩০ সালে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা এবং ২০৪১ সালে উন্নত বাংলাদেশ হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাড়াতে পারবে। বাংলাদেশ যখন এ সকল লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এগিয়ে যাচ্ছে তখনই সামনে এসে দাঁড়ালো বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯। করোনাভাইরাস টেনে ধরলো আমাদের এগিয়ে যাওয়ার চাকা। কিন্তু আমাদের থেমে যাওয়া চাকাকে আবার সচল করতে প্রয়োজন সকল প্রকার প্রস্তুতি, প্রয়োজন সংকল্প, প্রয়োজন নিজেদের গড়ে তোলা এবং প্রস্তুত হতে হবে আমাদের তরুণদেরকে এই সংকট উত্তোরণের। এই করোনা ভাইরাস সংকটকালীন সারাদেশ যখন লকডাউন তখন তথ্য প্রযুক্তির সহযোগিতায় তরুণরা যেভাবে নিজেদের প্রস্তুত করতে পারে: 

দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য অনলাইন কোর্স:

এই তথ্য প্রযুক্তির যুগে সব কিছুই এখন সবার হাতের নাগালেই। তাই তরুণরা ঘরে বসেই করতে পারে নিজের প্রয়োজন মতো দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য অনলাইন কোর্স যা তাকে সামনের সময়গুলোতে নিজেকে প্রস্তুত করতে সহায়তা করবে। এর মধ্যে ডিজিটাল মার্কেটিং, বিভিন্ন ইংলিশ কোর্স, ডাটাবেজ ম্যানেজমেন্ট কোর্স, বিভিন্ন সফটওয়্যার ডেভলপমেন্ট কোর্স, কমিউনিকেশনের দক্ষতা বৃদ্ধির কোর্স, লাইফ স্কিল ট্রেনিং, কম্পিউটার এবং তথ্য ভিত্তিক দক্ষতা বৃদ্ধির কোর্স, ভাষাগত বিভিন্ন কোর্স, ডাটা অ্যানালাইসিস কোর্সসমূহ খুবই প্রয়োজনীয় যা তরুণদের দক্ষ করে তুলতে সহায়তা করবে।

ক্রিয়েটিভ এবং ডিজাইনিং কোর্স:

তথ্য প্রযুক্তি এবং সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে তরুণের প্রস্তুত করে তুলতে প্রয়োজন বিশেষায়িত বিভিন্ন দক্ষতা ভিত্তিক কোর্স তার মধ্যে রয়েছে ওয়েব ডেভেলপমেন্ট কোর্স, গ্রাফিক্স ডিজাইনিং কোর্স, প্রোগ্রামিং, মোবাইল এপ্লিকেশন ডেভেলপমেন্ট কোর্স, ভিডিও এডিটিং এন্ড অ্যানিমেশন কোর্স, সফটওয়্যার স্কিল ডেভেলপমেন্ট কোর্সসমূহ। 

উদ্যোক্তা হয়ে উঠা:

বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বেশি যে বিষয় নিয়ে আলোচনা হয় সেটা হলো উদ্যোক্তা হওয়া। চাইলেই তো আর উদ্যোক্তা হওয়া যায় না, তার জন্য প্রয়োজন প্রস্তুতি, নতুন সৃষ্টিশীল আইডিয়া যার মাধ্যমে অন্যের হয়ে কাজ না করে নিজে উদ্যোগ নিয়ে কাজ করা এবং অন্যদের কর্মসংস্থান এর ব্যবস্থা করা যায়। কারণ  বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বড় সংকট হলো কর্মসংস্থান তৈরি করা সেই সংকট মোকাবেলা করতে প্রয়োজন উদ্যোক্তা তৈরি করা যা নিয়ে সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগ এবং পরিকল্পনা ইতোমধ্যেই গ্রহণ করছে। উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য প্রয়োজন নতুন সৃষ্টিশীল আইডিয়া সেই আইডিয়াটাকে কিভাবে বাস্তবায়িত হবে সেটা নিয়ে পরিকল্পনা তৈরি করা। এই সকল বিষয়ে বিভিন্ন অনলাইন ভিত্তিক স্টার্টআপ এন্ড অন্ট্রাপ্রেনারশিপ কোর্স রয়েছে, সেগুলোর মাধ্যমে যারা উদ্যোক্তা হতে চায় তারা নিজেদের প্রস্তুত করতে পারে।

এগ্রো, হস্ত, কুটির শিল্প বেইজড অনলাইন ট্রেনিং:

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনও কৃষির উপর অনেকটা নির্ভরশীল। বাংলাদেশের এখন অনেক তরুণ এগ্রো, হস্ত, কুটির শিল্প বেইজড বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করছেন এবং অনেকের পরিকল্পনা রয়েছে। এখন যারা এই পেশায় রয়েছে তাঁরা অনেকেই বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ নিয়েছেন বা অনেকেই প্রশিক্ষণ ছাড়াই কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। এই সময়ে প্রত্যেকই নিজেদের প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা অনুযায়ী বিভিন্ন অনলাইন ভিত্তিক প্রশিক্ষণ নিতে পারেন। যা সামনের সময় গুলোতে অর্থনৈতিকভাবে আমাদের অনেক এগিয়ে নিয়ে যাবে। 

সেচ্ছাসেবীমূলক কাজে নিজেকে নিয়োজিত করা:

করোনাভাইরাস সংকটকালীন সময়ে সবচেয়ে জরুরী বিষয় হচ্ছে সেচ্ছাসেবীমূলক কাজে নিজেকে নিয়োজিত করা। তরুণরাই পারবে এই সংকটকালে অসহায় ও আর্থিকভাবে অসচ্ছল মানুষের পাশে দাড়াতে। এখনকার সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বিষয় হচ্ছে কৃষকের পাশে দাঁড়ানো। এখন ধান কাটার মৌসুম, তাদের ধান কাটতে সহযোগিতা করে খাদ্য সংকট থেকে দেশকে রক্ষা করা আমাদের মহান দায়িত্ব। নিম্ন আয়ের মানুষ যারা দেশকে বিভিন্ন সেবা প্রদান করে যাচ্ছে তাদের পাশে দাড়াতে হবে এই সংকটে। বাংলাদেশের খেটে খাওয়া মানুষের টাকায় আমাদের রাষ্ট্র পরিচালিত হচ্ছে, তাঁদের অর্থে আমরা পড়াশুনা করছি। এখনই সময় তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর, সময় এখন আমাদের দায়িত্ব পালনের। এছাড়া আমাদের দেশে করোনায় আক্রান্তদের পাশে দাঁড়ানো, তাদের সেবা দান করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। 

যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে সংকট থেকে উত্তরণ:

প্রত্যেকটি কমিউনিটিতে এলাকার যুব সমাজ সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করে সেচ্ছাসেবী ধর্মী কাজের পরিকল্পনা করে তা বাস্তবায়ন করতে পারে যা কিনা প্রত্যেক কমিউনিটির সমস্যা গুলো সমাধান করবে এবং পাশাপাশি সেইসব বিষয়গুলো নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে সচেতনতা তৈরি হতে পারে। এছাড়া সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে যুব সমাজ যৌথভাবে অনলাইন ভিত্তিক বা অন্যান্য অর্থনৈতিক উদ্যোগের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করতে পারে যা সংকটকালীন ও পরবর্তী সময়ে তাদের নিজেদেরকে স্বনির্ভর করে তুলবে ও জাতীয় অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রাখবে।

প্রায় অর্ধেকের মতো যুবসমাজ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাইরে রয়েছে। তাদেরকে যদি অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সাথে যুক্ত করা যায় তাহলে আমরা আমদের অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জন করতে সক্ষম হবো। তার জন্য আমাদের যুব সমাজের প্রয়োজন আগ্রহ, প্রস্তুতি এবং নিজেদেরকে সামনের সময়ের জন্য প্রস্তুত করে তোলা।  কারণ সামনের সময়টা আসছে আত্মনির্ভরশীলতা আর স্বাবলম্বী হয়ে উঠার সময়। সংকট পরবর্তী বিশ্ব যখন আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবে, বাংলাদেশের শক্তি হতে পারে একটি দক্ষ ও প্রশিক্ষিত তারুণ্য এবং সেই তারুণ্য শক্তিকে কাজে লাগানোর জন্য উপযুক্ত একটা ব্যবস্থা।

লেখক: মোহাম্মদ মামুন মিয়া- মেম্বার, ট্রাস্ট্রি বোর্ড এবং সাবেক সভাপতি, জাতিসংঘ যুব ও ছাত্র সমিতি বাংলাদেশ।

ইত্তেফাক/বিএএফ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন