আচ্ছা বলুন তো, জীবন আগে নাকি রাজ্যের সম্পদ? যদি জীবনটাই না থাকে তাহলে পৃথিবীর সমস্ত সম্পদ কি আপনার কোনো কাজে আসবে? অবশ্যই না। তাহলে কেন আমরা জীবনের মায়া ত্যাগ করে ঈদ কেনাকাটার জন্য এতটা উদ্গ্রীব, কেন প্রচণ্ড ভিড়ের মাঝেও প্রিয়জনের কাছে ছুটে চলার এত তাড়া? নাকি আমরা এতটাই আবেগি জাতি, যে অন্যের জন্য তো নয়ই, এমনকি নিজের জীবনের মায়াও ত্যাগ করে আমরা ক্রমাগত ছুটে চলেছি ক্ষণিকের ভোগবিলাসের দিকে।
আপনি যখন এই করোনাকালীন সময়টিতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রিয়জনের জন্য পোশাকটি কিনছেন বা ফেরিঘাটের শত বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে বাড়ি যাচ্ছেন, আপনার সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের সবার জন্য আপনি যে কোনো অদৃশ্য অশনিসংকেত নিয়ে যাচ্ছেন না, তার নিশ্চয়তা কি আপনি দিতে পারবেন? আচ্ছা চিন্তা করুন তো, আপনার সেই বহু কষ্টলব্ধ পোশাক পরে বা আপনার সঙ্গে সাক্ষাতের পর যদি আপনার পরিবারের কোনো সদস্য করোনাক্রান্ত হন বা কোনো কারণে মৃত্যুবরণ করেন, আপনি কি সারা জীবনে নিজেকে ক্ষমা করতে পারবেন? একবারের জন্যও কি নিজের বিবেকের কাছে দায়ি থাকবেন না?
আচ্ছা একবার ভাবুন তো, একটা সংসার চালনার ক্ষেত্রে আমরা কি শুধু পরিবারের একজন সদস্যের কথা মাথায় রেখে পুরো মাসের বাজেট নির্ধারণ করি, নাকি পরিবারের অন্য সব সদস্যের বিষয়টিও নজরে আনতে হয়? আচ্ছা, মাসিক বাজেটের কথা না হয় বাদই দিলাম, প্রতিদিনের সপ্তব্যঞ্জন রান্না করেন যিনি, তিনি কি শুধু একটি মাত্র উপকরণ দিয়ে সপ্তব্যঞ্জন রান্না করতে পারবেন? কখনই না।
তাহলে একটু চিন্তা করে দেখুন তো, সংসারের মতো একটা ছোটো পরিসরে সবকিছু সঠিকভাবে সম্পাদনের ক্ষেত্রে যদি এত চিন্তা ভাবনার প্রয়োজন হয়, তাহলে একটি রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে একজন রাষ্ট্র পরিচালককে কত কিছু বিবেচনায় রাখতে হয়? ঠিক একইভাবে, একটি দেশের সরকার প্রধান যখন দেশটির সব ধরনের মানুষের কথা বিবেচনায় রেখে সে দেশের গার্মেন্টস বা শপিংমলগুলোকে সীমিত পরিসরে খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তখন আমাদের বোঝা উচিত শুধু বিশেষ মহলকে প্রাধান্য দেওয়ার চাইতে এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, সব আনুষঙ্গিক বিষয়গুলোও যে সরকারের নজরে আছে তা আমাদের সবাইকে অনুধাবন করানো। তবে এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বিষয়টি হলো, সরকার আনুষঙ্গিক প্রয়োজনীয় সতর্কতা মেনে সীমিত পরিসরে শপিংমল বা গার্মেন্টস খোলার অনুমতি দিলেও, আপনি নিজের দিক থেকে সর্বোচ্চ সাবধানতা অবলম্বন করছেন তো? নাকি শপিংমল খোলার আনন্দে বিভোর হয়ে জ্যাম ঠেলে ঈদ শপিংয়ে ব্যস্ত দিন কাটাচ্ছেন?
তাই বলছি, অন্যের কাজে ত্রুটি-বিচ্যুতি খোঁজা তো অনেক হলো, এবার আসুন না একটু নিজের দিকে তাকাই, একটু নিজের পরিশুদ্ধি সাধন করি। শপিংমলে বা কাছে গিয়ে বিপদ হওয়ার সম্ভাবনাকে না বাড়িয়ে, দূরে থেকে ভালো রাখার এবং ভালো থাকার চেষ্টা করি। চলছে রমজান মাস, এ মাসটি আমাদের শেখায় সংযমি হতে, নিজের কামনা, বাসনা, স্বার্থপরতা বা আত্মকেন্দ্রিকতাকে বিসর্জন দিতে। এই মাসটির সম্মানার্থেও কি আমরা নিজেদের আরাম-আয়েশ থেকে বের হয়ে এসে সমাজের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারি না? ঈদুল ফিতরের জামার টাকাটা না হয় এবার সদকা হিসেবেই দিলাম। এবারের ঈদ আনন্দটা না হয় এভাবেই সবার মাঝে ভাগ করে দিলাম। এ মাসের এই ত্যাগের প্রতিদানটা না হয় সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকেই নিলাম। অন্যান্য বছরগুলোয় না হয় শুধু নিজের স্বাচ্ছন্দ্য আর আরামের কথাই ভাবব। একটা ঈদই তো, না হয় একটা বছরের ঈদই মাটি হলো, সামনের বছরগুলোর আনন্দের জন্য এই বছরটাকে না হয় জলাঞ্জলিই দিলাম। খুব কি বড়ো ক্ষতি তাতে? ১৯৭১ সালেও তো আমরা ঠিক মতো ঈদ করতে পারিনি, তাই বলে কি স্বাধীনতার আনন্দ পরবর্তী বছরগুলোতে কম ছিল? আসুন না আরো একটাবার প্রিয়জনের জন্য, প্রিয় মাতৃভূমির কিছু ছোটো-বড়ো চাওয়াকে বিসর্জন দিয়ে সুন্দর একটা পৃথিবী রচনা করি।
লেখক : শিক্ষক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
