ছয়.
সাজানো গোছানো ছিমছাম শহর মেলবোর্ন। দু বছর আগে অব্দি মেলবোর্ন ছিল বিশ্বের সবচাইতে বাসযোগ্য শহর। ২০১৯-এ অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনা এই দৌড়ে অনেকটা এগিয়ে গেছে। কারণ একটাই, সম্প্রতি এই শহরে কিছু উন্নয়নমূলক কাজ চলছে, তাই ধুলোবালি উড়ছে মেলবোর্নের বাতাসে।
মনে মনে হাসেন ডিটেকটিভ অলোকেশ। হায় রে ধুলোবালি! বাংলাদেশে ধুলো আর বালি মিশিয়ে আমরা ভাত মেখে খাই। ধুলো না থাকলে সে কীসের শহর!
বাসযোগ্য শহরের তালিকায় এগিয়ে আছে সুইজারল্যান্ডের জুরিখ, জাপানের ওসাকা, টোকিও, নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড শহর, কানাডার ভ্যাংকুভার ইত্যাদি। আমরাও এগিয়ে আছি, তবে পেছন দিক থেকে। ফার্স্ট না হোক, অবাসযোগ্যের তালিকায় সেকেন্ড আমরা হবই।
উর্বীর কাছে সবচে ভালো লাগে এখানকার ফুলের বাগান, নির্ভেজাল খাবার আর ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম। মাই-কি দিয়ে যেথায় খুশি সেথায় যাও। লোকজন একেবারেই কম, কেউ কারো কাজে নাক গলায় না (হয়তো সেই নিষ্ঠুর নাককাটা খুনির ভয়ে), রাস্তায় বেরোলে কপাল ভালো হলেই কেবল কারো সঙ্গে দেখা হয়।
সেই কুকুরটার সঙ্গে আবারও দেখা হয় উর্বীর। বেচারা কুকুরটা মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে শুয়ে আছে। মালিক এলে তাকে হয়তো অভ্যর্থনা জানাবে।
এটা খুব ভালো জাতের কুকুর। আলপাইন ম্যাসটিফ। বেটার ব্রিড। কুকুর বিষয়ে অলোকের বেশকিছু জানাশোনা আছে। গড়পড়তা কুকুরের চেয়ে আলপাইন ম্যাসটিফের হাইট ও লেন্থ দুটোই বেশি। এদের গায়ে প্রচুর লোম। দুলে দুলে হাঁটে, বেশ ছুটতেও পারে। এরা খুব হিংস্রও, তবে জাতে অলস। পড়ে পড়ে ঘুমোতেই বরং বেশি আগ্রহী ম্যাসটিফ জাতের কুকুররা।
পাশের বাড়িতে একটা চমৎকর দেখতে ফুলের ঝোপ আছে। কী নাম এর? লেখা নেই। কিন্তু উর্বীকে সেটা জানতেই হবে। স্মার্টফোনে ফুলের ছবি তুলে ‘গুগল-ম্যাচ’ করতেই ফুলের নাম জানা গেল। এই ফুল কয়েক রকম হয়। যেটা দেখতে নীল তার নাম ব্লু-বেল। আর যেটা লাল তার নাম ক্রিসমাস বেল। ঘণ্টার আকৃতি তাই হয়তো এই নাম। আরেকরকম ফুল আছে, ওয়ারাতাহ্। তত দৃষ্টিনন্দন নয়, তবে বেশ বড়ো সাইজের ফুল। বাইরেটা আমাদের আতাফলের মতো দেখতে।
চেরি স্ট্রিট থেকে আলিমা রোড, গ্রিনসবুর্গ। খুব একটা দূরে নয়, কিন্তু অচেনা পথ তাই বেশি মনে হয়। বৈকালিক জলখাবার সেরে আলিমা রোডের দিকে হাঁটতে থাকেন উর্বী আর অলোকেশ। উদ্দেশ্য, নাককাটা টনির প্রতিবেশী সেই পিটারের সঙ্গে দেখা করা। অচেনা মানুষ পিটার, তার ওপর আবার কোনো রেফারেন্স নেই। সে দেখা করতে রাজি হবে কি না তা-ই বা কে জানে!
চলো তো, দেখি কী হয়! অলোকেশ বললেন। মরার আগেই ভূত হবার কোনো মানে হয় না।
এখানে বাস বা ট্রেন, কিংবা ট্রামলাইন নেই। কারণ গ্রিনসবুর্গ একেবারেই আবাসিক এলাকা। বেশিরভাগের একটা করে গাড়ি আছে, তাই হাঁটতে না চাইলে গড়িয়ে যেতে পারে। কিন্তু অলোকের তো গাড়ি নেই তাই পা-ভ্যান চালিয়ে যেতে হচ্ছে।
আইভান হো থেকে একটা সরু রাস্তা ইগলমন্ট ও রোজানা হয়ে চেরি স্ট্রিট গিয়েছে। ওটাই আবার দুটো শাখা গজিয়ে একটা গেছে গ্রিনসবুর্গ হয়ে আলিমা রোড, আরেকটা বাঁয়ের দিকে বেঁকে গেছে ওয়াইরা স্ট্রিট। ম্যাপ দেখে দেখে হাঁটছে ওরা। পথ ভুল হলে তখন প্রফেসর কিমকে ফোন করবে। তার গাড়ি এসে ওদের সঠিক গন্তব্যে তুলে নিয়ে যাবে।
ওই তো প্লেন্টি রিভার। উর্বী বলল।
হুঁ! তা-ই তো। নদীর পাড়ে বসে অনেকেই বড়শি দিয়ে মাছ মারছে। এখানে ভাড়ায় ফিশিং হুঁক পাওয়া যায়।
বাহ্ ভালো তো! অলোকেশ বললেন। অবকাশ যাপনের সুবর্ণসুযোগ। যারা এখানে বড়শি হাতে বসে আছেন, তাদের বেশিরভাগ বুড়ো। বয়স অন্তত সত্তর। দেখে ভালো লাগল অলোকের। এমন দৃশ্য বাংলাদেশে সচরাচর দেখা যায় না। মানুষ বুড়ো হলে সমাজ-সংসারে তার কদর কমে যায়। একসময়কার দোর্দণ্ডপ্রতাপ মানুষটিও তখন শিশুর মতোন অসহায় হয়ে পড়ে।
উর্বীর খুব ইচ্ছে সে একটা ওল্ডহোম বা বৃদ্ধাশ্রম বানাবে। সেখানে অসহায় যারা তারা থাকবে, আনন্দফূর্তি করবে। অলোকেশ অবশ্য এর ঘোর বিরোধিতা করেন। তার মতে বুড়ো বয়সে বাবা-মাকে দেখাশোনা করা সন্তানের দায়িত্ব। স্বার্থপরের মতো শুধু নিজের সুখ-সুবিধার কথা ভেবে কিছুতেই সে এই দায়িত্ব এড়াতে পারে না। সো, নো ওল্ডহোম। সন্তানকেই তার বাবা-মাকে দেখভাল করতে হবে। এ বিষয়ে দেশে আইন পাশ হয়েছে। এবার তার কঠোর প্রয়োগ চাই। করতে হবে। বৃদ্ধাশ্রম ভাঙতে হবে।
ওরা পথ ভুল করেনি। পিটারের বাড়ি খুঁজে পেয়েছে খুব সহজেই। ভাগ্যিস সে বাড়িতেই ছিল। মেলবোর্নের শহরতলিতে বেশিরভাগ বাড়ি দেড় তলা। ডুপ্লেক্সও বলা যায়। এরা সহজ শৌখিন মানুষ, বাড়ি ভাড়াটাড়া কম দেন। বাইরে কনকনে ঠান্ডা। দু-দুটো র্যাপার, সঙ্গে ওভারকোট জড়িয়েও ঠক্ ঠক্ করে কাঁপছে উর্বী। মেয়েটা বড্ড শীতকাতুরে! আদুরেও বটে।
পিটারের বাড়ির সামনে গিয়ে উঁকিঝুঁকি মারে উর্বী। এই এক বদঅভ্যেস। ‘বাঙালি হ্যাবিট’ বলা যায়। অমনি উঁকি মারা। এতে অনেকে খুব অস্বস্তি বোধ করেন। আপনিও করবেন, যদি অচেনা কেউ আপনার বাড়ির আশপাশে উঁকি মারে।
স্টপ দিস উর্বী। ওই দ্যাখো একজন আসছে। অলোকেশ বললেন।
এক্সকিউজ মি, আপনি কি জানেন মিস্টার পিটার কোথায় থাকেন?
তাতে ভয়ংকর এক মুখভঙ্গি করল লোকটা। যেন অলোক তার গার্লফ্রেন্ডের খবর জানতে চাচ্ছে। আজব তো! এই নাকি সভ্যতা!
আমি পিটারের খবর জানতে চাইছি। টনির প্রতিবেশী! জানেন কিছু? ফের বললেন অলোকেশ। স্বভাবতই এবার তার কণ্ঠ বেশ বেসুরো শোনায়।
একটু সময় নেয় লোকটা। তারপর বলে, ইট’স পিটার। বলুন তাকে আপনার কী দরকার?
থতমত খান অলোকেশ। এজন্যই তবে লোকটা অমন অদ্ভুত মুখভঙ্গি করছিল! নাকের ডগায় চশমা রেখে ওটা খুঁজলে যেমন হয় আর কি!
ওহ্ স্যরি। আমি একজন ডিটেকটিভ। প্রফেসর কিমের নাম আপনি শুনে থাকবেন। তিনি আমার বিশেষ বন্ধু।
এপাশ-ওপাশ মাথা নাড়ে পিটার। নাহ, চিনি না। আদার বেপারির আবার জাহাজের খবর! কী দরকার শুনি!
ওকে, চেনেন না তো! ইন্সপেক্টর হুক! তাকে চেনেন তো? পুলিশ অফিসার। বেশ ভাব নিয়ে অলোক বললেন।
এবার একটু সাড়া লক্ষ করা যায়। অলোক তাকে একের পর এক জেরা করতে থাকেন। টনি আপনার নেইবার, তা-ই না?
জি স্যার। পত্রিকায় পড়েছেন তো! পিটার বলল। তার ইংরেজি অ্যাকসেন্ট সুবিধার নয়। উর্বীর বুঝতে কষ্ট হয়।
ইয়েস, আই রেড ইট। অলোক মৃদু হাসলেন। প্রশংসাসূচক হাসি। যাতে পিটার লোকটা আবার বিগড়ে না যায়। বলতে গেলে সে তুরুপের তাস। খরচ হয়ে গেলে নাককাটার বিষয়ে বিশদ তথ্য পাওয়া যাবে না।
জানেন, আপনার বন্ধু টনির নাক কাটা গেছে? কাজের কথায় এলেন অলোকেশ।
মাথা নাড়ল পিটার। তার মানে সে জানে।
কাজটা কে করেছে, এনি আইডিয়া পিটার?
নো আইডিয়া। শ্রাগ করল পিটার। বস্তুত, এই কেসে তার খুব একটা আগ্রহও লক্ষ করা গেল না।
আচ্ছা, টনির কোনো শত্রু ছিল কি? শুনেছি সে মাছের কারবার করতো! আই মিন ফিশ মারচেন্ট!
অদ্ভুত হেসে পিটার বলল, তা অবশ্য ছিল। এই জগতে কার না শত্রু আছে! শিশু আর পাগল ছাড়া সবারই কিছু শত্রু থাকে। একটু থেমে পিটার একটা আজব কথা বলল। ‘জানেন তো স্যার, শত্রু থাকা ভালো। এনিমিজ ফাইন্ড ইওর ফল্টস। এ বাবদ সে কোনো পয়সাও নেবে না। ফুল ফ্রি সার্ভিস। দেন ইউ ক্যান কারেক্ট ইট।’
উর্বী হেসে ফেলল। দারুণ যুক্তি! এই ব্যাটারে বগলদাবা করে বাংলাদেশে নিয়ে গেলে হয়। তখন সে দেখবে কত কত শত্রু! কত রকম ও রঙের শত্রু। একটা ছোটাতে গিয়ে আরো দশটা পেছনে লাগবে। লাইফটা তখন পুরাই কয়লা। ফুল অব শত্রুজ! হা হা হা!
(চলবে)
