পাবনার ব্যবসায়ীরা প্রায় ৩ কোটি টাকার চামড়া নিয়ে শঙ্কায়

আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০২০, ১৭:৫১

পাবনার চামড়া ব্যবসায়ীরা কোরবানি পশুর প্রায় ৩ কোটি টাকার কাঁচা চামড়া কিনে সমস্যায় পড়েছেন। চামড়ার কোম্পানির কাছ থেকে বকেয়া পুরো টাকা না পাওয়া, ঋণ, ধার ও দেনা করে বেশি দাম দিয়ে চামড়া কিনে আদৌ মূল টাকা তুলতে পারবেন কিনা, এ ধরণের শঙ্কা ভর করেছে ব্যবসায়ীদের মধ্যে। 

পাবনা শহরের চামড়ার গোডাউনপাড়ায় গিয়ে কথা হয় বেশ কয়েকজন চামড়ার আড়তদারের সাথে। জেলার ৯ উপজেলার বিভিন্ন স্থান থেকে কাঁচা চামড়া আড়তদারের প্রতিনিধিরা ক্রয় করে তুলে আনছেন শহরের মহাজনদের কাছে। পাবনায় এবার প্রায় ৩ কোটি টাকার চামড়া ক্রয় করেছে বিভিন্ন আড়তদার। তারমধ্যে প্রায় কোটি টাকার চামড়া পাবনা সদর ও পৌর এলাকা থেকে সংগ্রহ করেছেন ব্যবসায়ীরা। সরকার নির্ধারিত মূল্য নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে রয়েছেন ব্যবসায়ীরা। ঘোষিত মূল্যে তারা ক্রয় করবেন নাকি চামড়ার কোম্পানিগুলো ক্রয় করবে তা নিয়ে অজানা শঙ্কা কাজ করছে ব্যবসায়ীদের মধ্যে। 

নতুন চামড়া ব্যবসায়ী চন্দন বলেন, ‘কোরবানির পশুর চামড়া বিশেষ করে গরু ৪০০ থেকে ৭০০ টাকায় আর ছাগল ২০ টাকা থেকে ৬০ টাকার মধ্যে ক্রয় করেছেন। একটি গরুর চামড়া ক্রয় করা, পরিবহন, শ্রমিক ও লবণ দিয়ে তৈরি করতে কমপক্ষে ২০০ টাকা খরচ হয়েছে। একটি চামড়া প্রস্তুত করতে কমপক্ষে ১ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। অনুরূপভাবে প্রতিটি ছাগলের চামড়াতে এক থেকে দেড়শ টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু এই চামড়া কোন সমস্যা ছাড়াই কোম্পানিগুলোকে দিতে পারবেন কিনা এটা নিয়ে রয়েছে তাদের মধ্যে আতঙ্ক। 

আরও পড়ুন: কাহালুতে করোনা উপসর্গে ১ জনের মৃত্যু

চামড়া ব্যবসায়ী রবিউল ইসলাম কিরণ বলেন, ‘ইতিমধ্যে গরুর চামড়া প্রায় ১ হাজার ২০০ আর ছাগলের চামড়া কমপক্ষে ২ হাজার ২০০ পিস ক্রয় করেছেন। লবণ দিয়ে সেগুলো সংরক্ষণের ব্যবস্থাও করেছেন। এখন বাকি কোম্পানির কাছে হস্তান্তর। কিন্তু দাম নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়। তারা যে দামে চামড়াগুলো সংগ্রহ করেছেন এবং প্রস্তুত করে আশানুরূপ দাম পাওয়া নিয়ে পড়েছেন দারুণ বিপাকে।

সংগ্রহ করা চামড়া যাতে নির্বিঘ্নে কোম্পানিগুলো গ্রহণ করে এবং আমরা যাতে আর্থিকভাবে ক্ষতির সন্মুখীন না হই সেই ব্যাপারে সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন কিরণ।

এছাড়াও কয়েকজন চামড়া ব্যবসায়ী বলেন, ‘ঢাকার পরে পাবনার চামড়া ব্যবসায় বেশ সুনাম ছিল। কিন্তু দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের কারণে লাভজনক এই ব্যবসা আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে এসেছে। এই শিল্পকে ধ্বংস করতে একটি মহল বা চক্র উঠে পড়ে লেগেছে বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই। 

দেশের এই ব্যবসা ধ্বংসের পেছনে পার্শ্ববর্তী ভারত ও চীনের সম্পৃক্ততার দাবি জানিয়ে তারা বলেন, ‘এক সময়ে বাংলাদেশের চামড়ার কদর ছিল বিশ্ব বাজারে। কিন্তু আজ আমাদের দেশের চামড়া দিয়েই ভারত ও চীন বিশ্বে বাহবা আদায় করছে।’

চামড়া শিল্পের সুদিন ফিরিয়ে আনতে সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানান তারা। 

ব্যবসায়ীরা বলেন, ‘এবার চামড়ায় ব্যবহার করা লবণের দামও বেড়ে গেছে। তাদের ঘরে এসে প্রতি বস্তা লবণ সাড়ে ৬০০ টাকা পড়েছে। লেবার মজুরিও বৃদ্ধি পেয়েছে। তাছাড়া পাড়া মহল্লা থেকে ফড়িয়া ব্যাপারী স্বল্প মূল্যে সংগ্রহ করলেও তা আমাদের কাছে এসে চড়া দামে বিক্রি করছে। ফলে এই ব্যবসায় মধ্যসত্বভোগী হচ্ছেন সবচেয়ে লাভবান। আর হতাশা, দুশ্চিন্তা এবং শঙ্কা নিয়ে সময় পার করছি আমরা। 

চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইমদাদুল হক ইদু ইত্তেফাককে জানান, ‘সরকারিভাবে ঘোষিত চামড়ার দাম নিয়ে আমরা ধোঁয়াশার মধ্যে আছি। মৌসুমি চামড়া ক্রেতাদের অলস টাকায় ইচ্ছেমতো দামে চামড়া কেনার ফলে কষ্ট হলেও আমাদের তাদের সাথে তাল মিলিয়ে চামড়া ক্রয় করতে হচ্ছে।’

ইদু বলেন, ‘চামড়া কেনার জন্য ৩০ লাখ টাকা লোন দেওয়া হয়েছে ব্যাংক থেকে। সরকারিভাবে জুন পর্যন্ত সুদ না নেওয়ার কথা থাকলেও ব্যাংক সেটা মানেনি। তারা জুন পর্যন্ত সুদ কেটে নিয়েছে।’ 

ইদু বলেন, ‘ঢাকার ট্যানারি কোম্পানিগুলো আমাদের ২৩ ফুটের বেশি চামড়া নেবে না। অথচ আমার সংগ্রহ করা চামড়ার প্রায় অর্ধেক চামড়াই তার চেয়ে বড়। তাছাড়া কোরবানি ঈদের চামড়া বড় হয়েই থাকে। এটাও একটা সমস্যার মধ্যে ফেলেছে। তবে প্রতিবারই চামড়া পচন ধরতো। কিন্তু এবারে চামড়া সংরক্ষণ করা হয়েছে খুব ভালোভাবে।’  

ইত্তেফাক/এএএম