কিডনি ক্রয়-বিক্রয় চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে জয়পুরহাটের কালাই উপজেলায় আব্দুস সাত্তার (৫৪) নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গতকাল বুধবার দিবাগত রাতে বগুড়া সদর উপজেলার পৌরপার্ক এলাকা থেকে প্রযুক্তির সহায়তায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগষ্ট) দুপুরে তাকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।
গ্রেপ্তার আব্দুস সাত্তার কালাই উপজেলার বহুতি গ্রামের মৃত আব্দুল জব্বার খলিফার ছেলে। পুলিশের দাবি, তিনি দীর্ঘদিন ধরে কিডনি কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত একটি চক্রের অন্যতম প্রধান দালাল। পুলিশ জানিয়েছে, তার বিরুদ্ধে কিডনি কেনাবেচাসহ কালাই থানায় পাঁচটি মামলা রয়েছে।
কালাই থানার তদন্ত কর্মকর্তা দীপেন্দ্র নাথ সিংহ আজ বিকেলে এসব তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, ‘কিডনি-সংক্রান্ত প্রতারণার মামলাটি থানায় গ্রহণের পর এজাহারভুক্ত আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু করা হয়। প্রযুক্তির সহায়তায় গতকাল রাতে বগুড়া সদরের পৌরপার্ক এলাকায় অভিযান চালিয়ে আব্দুস সাত্তারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’
দীপেন্দ্র নাথ সিংহ আরও বলেন, ‘সকালে আব্দুস সাত্তারকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। মামলার অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’
পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, সবশেষ যে মামলায় আব্দুস সাত্তারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাতে অভিযোগ করা হয়েছে—আর্থিক সংকটে থাকা গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ এলাকার মন্টু মিয়াকে কিডনি বিক্রির জন্য ১০ লাখ টাকা দেওয়ার প্রলোভন দেখানো হয়। পরে তাকে ঢাকায় নিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো হয় এবং কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য নেপালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
এজাহারে আরও বলা হয়, চলতি বছরের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে মন্টু মিয়াকে অগ্রিম ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। পরে তাকে নেপালের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার একটি কিডনি অপসারণের কয়েক দিন পর তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়।
মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, দেশে ফেরার পর চুক্তি অনুযায়ী বাকি ৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন মন্টু মিয়া। তবে আব্দুস সাত্তারসহ অন্য দালালেরা টাকা না দিয়ে বিভিন্নভাবে টালবাহানা করতে থাকেন।
কিডনি বিক্রির টাকা না পেয়ে গত ১৩ জুন জয়পুরহাট আমলি আদালতে মামলা করেন মন্টু মিয়া। মামলায় বগুড়া সদর উপজেলার নিশিন্দারা গ্রামের সাব্বির আহমেদ, শিবগঞ্জ উপজেলার কিচক মল্লিকপাড়া গ্রামের সুমন আলী, কালাই উপজেলার উদয়পুর ইউনিয়নের পাইকপাড়া গ্রামের আব্দুল মান্নান ও সাইদুর রহমান, লওনা গ্রামের আব্দুস সাত্তার এবং নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার ছোট হোসেনপুর রাজাগঞ্জ এলাকার তারেক আজম ওরফে বাবলু চৌধুরীকে আসামি করা হয়। আদালতের নির্দেশে ওই দিনই মামলাটি কালাই থানায় রেকর্ড করা হয়।
মামলার এজাহারে তারেক আজম ওরফে বাবলু চৌধুরীকেও কিডনি ক্রয়-বিক্রয় চক্রের সঙ্গে জড়িত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে অভিযোগ করা হয়, তিনি ঢাকার রায়েরবাগ এলাকায় অবস্থান করে জয়পুরহাটে দালাল নিয়োগের মাধ্যমে দরিদ্র মানুষকে কিডনি বিক্রিতে প্রলুব্ধ করতেন এবং দেশে-বিদেশে কিডনি কেনাবেচা করতেন।
কালাইয়ে দীর্ঘদিন ধরে কিডনি ক্রয়-বিক্রয়কারী একটি দালাল চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। তাঁদের দাবি, দরিদ্র, ঋণগ্রস্ত ও আর্থিকভাবে অসচ্ছল মানুষকে টার্গেট করে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে কিডনি বিক্রিতে রাজি করানো হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রশাসনের নজরদারি ও আইনগত তৎপরতার কারণে কিছু সময় এ ধরনের কর্মকাণ্ড কম থাকলেও গত এক বছরে আবারও চক্রটি সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
স্থানীয়ভাবে আগে থেকেই ‘কিডনির হাট’ হিসেবে আলোচিত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে উপজেলার মাত্রাই ইউনিয়নের ভেরেন্ডি, উলিপুর, সাতার, কুসুমসাড়া, অনিহার, ভাউজাপাতার, শিবসমুদ্র, পাইকশ্বর ও ইন্দাহার; উদয়পুর ইউনিয়নের তালোড়া-বাইগুনি, বহুতি, মোহাইল, থল, বাগইল, মাস্তর, জয়পুর বহুতি, নওয়ানা বহুতি, দুর্গাপুর, উত্তর তেলিহার, ভুষা, কাশিপুর, বিনইল ও পূর্ব কৃষ্টপুর; আহম্মেদাবাদ ইউনিয়নের রাঘবপুর, বোড়াই, হারুঞ্জা, নওপাড়া ও বালাইট গ্রামের নাম স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়।
এ ছাড়া নতুন করে কালাই পৌরসভার আওড়া, সীতাহার ও দুরুঞ্জ-নয়াপাড়া মহল্লা, জিন্দারপুর ইউনিয়নের এলতা, ইমামপুর, বেগুনগ্রাম, করিমপুর ও হাজিপুর-ঘাটুরিয়া এবং পুনট ইউনিয়নের জালাইগাড়ী, পাঁচগ্রাম, জগডুম্বর ও শান্তিনগর এলাকার নামও স্থানীয়ভাবে আলোচনায় এসেছে।
মানবদেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন, ১৯৯৯ অনুযায়ী, জরুরি প্রয়োজনে অসুস্থ নিকটাত্মীয়কে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ডোনেট করার সুযোগ থাকলেও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্রয়-বিক্রয় নিষিদ্ধ। আইনের ৯ ধারায় অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বেচাকেনা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই আইনের ১০(১) ধারায় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ক্রয়-বিক্রয় কিংবা এ কাজে সহায়তার জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে।

