বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর সংস্কৃতিতে ও মুসলমানদের জীবনে হিজরি সনের গুরুত্ব অপরিসীম। অথচ হিজরি সন কবে আসে কবে যায়, তা হয়তো আমাদের অনেকেরই জানা থাকে না।
ইসলামী আরবি বর্ষপঞ্জিকার সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিজরতের পুণ্যময় স্মৃতি, তাই যুগ যুগ ধরে মুসলমানদের কাছে হিজরি সাল অনেক গুরুত্ব বহন করে আসছে। আল্লাহতায়ালার অপার কৃপায় আমরা ১৪৪২ হিজরি বর্ষে প্রবেশ করার তাওফিক পেয়েছি, আলহামদুলিল্লাহ।
যদিও মুসলমানদের রোজা, হজ, ঈদ, কোরবানিসহ ইসলামের বিভিন্ন বিধি-বিধান হিজরি সনের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বর্তমান যুগে তা কেবল রমজান ও ঈদের হিসাব রাখার মধ্যেই যেন সীমিত। আমাদের অধিকাংশ সন্তানরাই হয়তো আজ জানেনা হিজরি সাল কি আর আরবি মাসগুলোর নাম। আরবি মাসগুলো-মহররম, সফর, রবিউল আউয়াল, রবিউস সানি, জুমাদাল উলা (জমাদিউল আউয়াল), জুমাদাল উখরা (জমাদিউস সানি), রজব, শাবান, রমজান, শাওয়াল, জিলকদ ও জিলহজ।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিজরতের ঘটনাকে কেন্দ্র করেই হিজরি সনের শুভ সূচনা হয়। ইসলামী সন তথা হিজরি সন মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলা আলাইহি ওয়াসাল্লামামের মক্কা থেকে মদিনা হিজরতের ঐতিহাসিক তাৎপর্যময় ঘটনার অবিস্মরণীয় স্মারক।
আল্লামা শিবলি নোমানি রহমতুল্লাহ আলাইহি সুপ্রসিদ্ধ আল ফারূক গ্রন্থে উল্লেখ করেন- হজরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে ১৬ হিজরি সনের শাবান মাসে খলিফার কাছে একটি দাপ্তরিক পত্রের খসড়া পেশ করা হয়, পত্রটিতে মাসের উল্লেখ ছিল; সনের উল্লেখ ছিল না। দূরদৃষ্টিসম্পন্ন খলিফা বললেন, পরবর্তী কোনো সময়ে তা কীভাবে বোঝা যাবে যে এটি কোন সনে পেশ করা হয়েছিল? অতঃপর তিনি সাহাবায়ে কেরাম ও অন্যান্য শীর্ষ পর্যায়ের জ্ঞানী-গুণীদের পরামর্শে হিজরতের ১৬ বছর পর ১০ জুমাদাল উলা মুতাবিক ৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দে হিজরি সন প্রবর্তনের এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। হিজরতের বছর থেকে সন গণনার পরামর্শ দেন হজরত আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু। পবিত্র মহররম মাস থেকে ইসলামি বর্ষ শুরু করার পরামর্শ প্রদান করেন হজরত উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু। (বুখারি ও আবু দাউদ)
হিজরি বছরের প্রত্যেকটি মাসেরই রয়েছে বিশেষ গুরুত্ব। হিজরি সনের প্রথম মাস মহররম। ইসলামে এ মাসের অনেক গুরুত্ব ও তাৎপর্য রয়েছে। মহররম মাস শুধুমাত্র কারবালার ঘটনা স্মরণ করার মাস নয় বরং মুসলিম বিশ্বকে নতুন করে গড়ে তোলার দৃঢ় প্রতিজ্ঞার মাস ।
মহররম শব্দের অর্থ সম্মানিত। ইসলামের ইতিহাসে এই মাসটি এমন কতগুলো উল্লেখযোগ্য স্মৃতিবিজড়িত, যে স্মৃতিসমূহের সম্মানার্থেই এই মাসকে মহররম বা সম্মানিত বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তাইতো এ মাসের ৯, ১০ অথবা ১০, ১১ তারিখে ২টি রোজা রাখা উত্তম।
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে হজরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রোজা রাখার জন্য এত অধিক আগ্রহী হতে দেখিনি যত দেখেছি এই আশুরার দিন এবং রমজান মাসের রোজার প্রতি।’ (বুখারি)
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক মাসের নতুন চাঁদ দেখে দোয়া পড়তেন-আল্লাহুম্মা আহিল্লাহু আলাইনা বিল আমানি ওয়াল ঈমানি, ওয়াস সালামাতি ওয়াল ইসলামি-রাব্বি ওয়া রাব্বুকাল্লাহ।
আরও পড়ুন: বিএনপি বাংলাদেশে ‘দুর্নীতির বিষবৃক্ষ’ রোপণ করে গেছে : প্রধানমন্ত্রী
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আপনি আমাদের জন্য এই চাঁদকে নিরাপত্তা, ঈমান, শান্তি এবং ইসলামের সঙ্গে উদিত করুন। (হে চাঁদ) আল্লাহই আমার ও তোমার রব।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস: ৩৪৫১)
আমাদের প্রত্যাশা হিজরি নতুন বছর বিশ্ববাসীর জন্য বয়ে আনবে শান্তি ও নিরাপত্তা আর দূর হবে মহামারি করোনা এবং বন্ধ হবে ধর্মের নামে রক্তপাত।
দয়াময় প্রভুর দরবারে আমাদের সকাতর প্রার্থনা, হে প্রভু! আপনি আমাদেরকে ক্ষমা করে নতুন বছরকে আমাদের জন্য কল্যাণময় করুন, আমিন।
লেখক: ইসলামী গবেষক ও কলামিস্ট
ইত্তেফাক/এএএম
