বিশ্বরাজনীতির মারপ্যাঁচে করোনা ভ্যাকসিন

আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০২০, ১৩:২৬

বিশ্বব্যাপী বয়ে চলছে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ। গত বছরের নভেম্বরে চীনের হুবেই প্রদেশে করোনা ভাইরাসের প্রথম কেস পাওয়ার পর কেউ হয়তো কল্পনাও করতে পারেনি এই ভাইরাস পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে জনজীবন বিপর্যস্ত করে ফেলবে। বিজ্ঞানী ও গবেষকদের আশঙ্কা, শীতে এই ভাইরাস আবারও প্রকট আকার ধারণ করতে পারে। পুরো বিশ্বের নজর এখন করোনার ভ্যাকসিনের দিকে। ভ্যাকসিন নিয়ে তাই সাধারণ মানুষের জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। ‘কবে আসবে করোনার ভ্যাকসিন?’— এ জিজ্ঞাসা সবার।

খুব দ্রুত করোনার ভ্যাকসিন বাজারে আনার জন্য উন্নত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে প্রথম থেকেই একধরনের প্রতিযোগিতা চলে আসছিল। একটি কার্যকর ভ্যাকসিন বাজারে নিয়ে আসতে সাধারণত ৫ থেকে ১০ বছরের দীর্ঘ গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন। কিন্তু করোনা মহামারি ঠেকাতে ভ্যাকসিন আবিষ্কারের জন্য গবেষণা ও উত্পাদনের নিয়ম-কানুনের শর্ত কিছুটা শিথিল করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এরই মধ্যে কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন আবিষ্কারের সুখবরের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বে সবার মধ্যে আশার আলো জ্বলতে শুরু করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, খুব শিগিগরই বাজারে আসতে পারে করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন। কিন্তু ভ্যাকসিনের বিষয়টি শুধু এর আবিষ্কারের প্রশ্নেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক রাজনীতি, জাতীয় রাজনীতি, সমাজনীতিসহ রাষ্ট্রীয় যোগাযোগ—সবকিছুই জড়িত। এটি শুধু করোনা টিকার জন্যই সত্য নয়; করোনা ভাইরাসের আগেও বিশ্ব প্রত্যক্ষ করেছে ইবোলা, সার্স ও মার্স নামের জীবনবিনাশী সংক্রামক ব্যাধির দাপট।

বিশ্ব যখনই কোনো সংক্রামক ব্যাধি দ্বারা সংক্রমিত হয়েছে, ঠিক তখনই মানবহিতৈষী কর্মোদ্যোগের পাশাপাশি হেঁটে চলেছে আত্মকেন্দ্রিকতা, উগ্র-জাতীয়তাবাদ কিংবা পুঁজিবাদের কলুষিত রূপ। একই রকম পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে ভ্যাকসিন আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে। কারণ, করোনার ভ্যাকসিন উত্পাদনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কোটি কোটি ডলারের বাণিজ্য আর বিশ্ব রাজনীতি। একটি কার্যকর ও নিরাপদ টিকা আবিষ্কার করার জন্য প্রয়োজন বিপুল পরিমাণ সম্পদের বিনিয়োগ ও পর্যাপ্ত অর্থ। উন্নয়নশীল ও দারিদ্র্যপীড়িত দেশগুলোর মোট জনসংখ্যার উল্লেখযোগ্য অংশই যেখানে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে, সেখানে এসব দেশের পক্ষে ভ্যাকসিন আবিষ্কারের পেছনে এই বিপুল পরিমাণ সম্পদের বিনিয়োগ করা সম্ভব হয় না। ধনী দেশগুলোর সদিচ্ছা ও অনুগ্রহের ওপরই নির্ভরশীল এসব দেশের ভবিষ্যত্ ভ্যাকসিনেশন প্রক্রিয়া। ইতিমধ্যে অনেক উন্নত দেশ যেমন—ব্রিটেন, রাশিয়ায় ব্যাপক মাত্রায় ভ্যাকসিনেশন চলছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আশা করছে, আগামী বছরের শেষ নাগাদ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে থাকা দেশগুলোর টিকা পাওয়ার একটা প্রবল সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। ফলে উন্নত ও শক্তিশালী দেশগুলোর পাশাপাশি উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশগুলোরও ভ্যাকসিন পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

কিন্তু এত সব অগ্রগতির পেছনেও রয়েছে কলুষিত রাজনৈতিক মনোভাব। সেটি হচ্ছে ‘টিকা জাতীয়তাবাদ’, যাতে কিছু দেশ নিজের টিকা নিয়ে একা থাকতে চায়। উপেক্ষা করতে চায় পুরো বিশ্বকে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, দ্রুত ও কার্যকর পন্থায় মহামারি মোকাবিলায় জাতীয়তাবাদের লাগাম টেনে ধরা ছাড়া উপায় নেই। এধরনের কঠোর জাতীয়তাবাদকে পুঁজি করে কোনো মহামারি মোকাবিলা করা অতীতেও সম্ভব হয়নি, বর্তমানেও সম্ভব হবে না। এধরনের জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি কোনো সমস্যার সমাধান তো করেই না, উলটো সমস্যা মোকাবিলার পথে বাধা সৃষ্টি করে আরো বহুমাত্রায় দীর্ঘায়িত করে।

বিশ্ব রাজনীতি থেকে এই ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদের ঝুঁকি কখনই সমূলে দূর করা সম্ভব নয়। তবে আশার কথা এই যে, বিজ্ঞানীরা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতামূলক কিছু অলাভজনক সংগঠন ইতিমধ্যে এগিয়ে এসেছে। উল্লেখযোগ্য একটি উদ্যোগ হচ্ছে কোভ্যাক্স (Covid-19 Vaccine Global Access – COVAX)। সংস্থাটি এই ভ্যাকসিনে যেন বিশ্বের সব দেশের সমানভাবে ন্যায্য এবং ন্যায়সঙ্গত অধিকার রক্ষা হয়, সেটি নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যত বেশি দেশ কোভ্যাক্সে যোগ দেবে, তত বেশি যৌক্তিক বিতরণ, বিপণন ও ব্যবস্থাপনা সহজসাধ্য হবে, যা মহামারি মোকাবিলায় ‘টিকা জাতীয়তাবাদ’ রুখতে বহুলাংশে সহায়ক হবে।

সংকটের এই মুহূর্তে বিশ্বকে সতর্ক থাকতে হবে ‘টিকা জাতীয়তাবাদের’ উত্থান সম্পর্কে। ভূ-রাজনীতিতে বিরোধ থাকতেই পারে, কিন্তু জনস্বাস্থ্যের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ের ক্ষেত্রে সেই শত্রুতা টেনে আনা মোটেও সমীচীন নয়। তাই মানবতার কথা চিন্তা করে হলেও সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া উচিত করোনা ভ্যাকসিনের পেটেন্ট। উগ্র-জাতীয়তাবাদী কিংবা পুঁজিবাদীদের হাতে বন্দি না হয়ে ভ্যাকসিন হোক সব দেশের, সব মানুষের জন্য উন্মুক্ত।

লেখক : শিক্ষার্থী, ইতিহাস বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন