আজ ২০২১ ঈসায়ী নববর্ষের শুরু। সবাইকে এ নববর্ষের শুভেচ্ছা। আমরা ইসায়ী সাল লিখে যে এডি লিখি এর অর্থ হল আননা ডুমিনো (এডি) বা লিডার অব দ্যা ইয়ার। লিডার অব দ্য এয়ার বলে ঈসা (আ)কে বুঝানো হয়েছে।
এ সালের সাথে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সরাসরি সম্পর্ক যেমন আছে, আব্রাহামিক রিলিজিয়ন হিসেবে ইসলাম ধর্মেরও একটি যোগসূত্র এখানে পাওয়া যাবে। ত্রয়োদশ পোপ গ্রেগরী খ্রিস্ট্রীয় কেলেন্ডারের যে সংস্কার করেন তাই আজ সারা বিশ্বে ব্যাপৃত হয়ে আছে। এ সালটি এখন ধর্মীয় মোড়কের বাইরে এসে সার্বজনীনতা পেয়েছে।
আমাদের শিক্ষা, অর্থবছর এমনকি দৈনন্দিন দিনপঞ্জী খ্রিস্ট্রীয় সনের সাথে মিলিয়ে থাকি। এরূপ সার্বজনীন বছরের সমাপনান্তে সমাপ্ত বছরের পর্যালোচনা আর ভবিষ্যতের শুভ কামনার দু‘আতে খারাপ কিছু আছে বলে মনে হয় না। কিন্তু তখনই এটা খারাপ বা অনৈতিক দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা দেয়,যখন আমরা দেখি এ দিনে অন্যান্য ধর্মের বিশ্বাসীরা তো বটেই মুসলিম পরিবারেও ধর্মীয় সীমার বাইরে গিয়ে এ দিনকে অন্য সংস্কৃতির আবহে উদযাপন করা হয়।
থার্টি ফাস্ট উদযাপনের নামে উশৃংখল আচরণ করা হয়, মদ নারীর হৈ হুল্লোড়ে অসামাজিকতার বিষ ছড়িয়ে যায়। দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এসব বিষয় সম্পূর্ণরূপে নিষেধ করলেও অনেকে নির্দেশনার বাইরে গিয়ে উগ্র উচ্ছ্বাস প্রদর্শন করেন। তা মোটেও কাম্য নয়। ধর্মীয় ও দেশীয় আইন কখনো এটা অনুমোদন করে না।
ধর্ম মানুষকে সভ্য করেছে। সামাজিক দায়বদ্ধতায় এনেছে। পরিবারিক বন্ধনের পদ্ধতি শিখিয়েছে। বছর গননার এ পদ্ধতিও ধর্মীয় চেতনা থেকে এসেছে। প্রত্যেক ধর্মেরই নিজস্ব সাল, দিন সময় গননার পদ্ধতি রয়েছে। ইহুদীরা তাদের ধর্মীয় সালকে হিব্র ভাষায় হালুহহালবারী বলে। চন্দ্র মাস ধরে তা নির্ধারিত হয়। চার্চ বছর বলতে অবশ্য ক্যাথলিক খ্রিষ্টানরা লিটরজিকেল এয়ারকে বুঝান। আমরা বাঙালিরা যে বৈশাখ উদযাপন করি তা আরবী হিজরী সনের আদলে তৈরি। আর পারস্যে নওরোজের উত্সবের কথা তো আমরা সকলেই জানি।
এদিকে বুদ্ধিষ্ট ধর্মীয় ক্যালেন্ডার মাহায়ারা ও থেরাভেদা দুইভাগে বিভক্ত। ইসলামী ক্যালেন্ডার বলতে আমরা হিজরী সালকে বুঝে থাকি। রাসূল (স) এর মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের সময় থেকে এ সাল গনণা করা হয়।
উমার (রা)-এরসময় থেকে এর যে ব্যাপ্তি তা বাংলা বিজয়ের পর থেকেই বাঙালি মুসলিম সমাজের দৈনন্দিন জীবনের ইতিহাস ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে এ হিজরী সাল আড়ম্ভরপূর্ণভাবে পালনের কোন নির্দেশনা নেই। জাতিধর্ম নির্বিশেষে সমগ্র বাঙালির জীবনে ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদী শাসনের পূর্বে খ্রিস্ট্রীয় সালের কোন প্রভাব ছিলনা।
ইংরেজরা নিজেদের স্বার্থে এ সালকে বলা যায় ভারতীয়দের উপর চাপিয়ে দেয়। এজন্য একে কোন কোন গবেষক সাম্রাজ্যবাদী সাল বলেও অভিহিত করেন। যা হোক, সময়ের পরিক্রমায় ও ভূ-রাজনৈতিক বিবেচনায় এ সালের প্রভাবকে এখন আর অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে সাল উদযাপনের নামে উত্সবের আবহ তৈরির কোন সুযোগ মুসলমানদের সংস্কৃতিতে আমদানী করার সুযোগ নেই। আর্থ-সামাজিক প্রয়োজনের বাইরে কোন মুসলিমের কাছে এসব বছর বা সালের গণনার গুরুত্ব যাতে অধিক না হয় এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।
লেখক : অধ্যাপক, দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ,
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া ও আন্তঃধর্ম সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ
ইত্তেফাক/জেডএইচ
