বাংলা ভাষা প্রসারে শিক্ষাক্ষেত্রে দূর করতে হবে হীনমন্যতা

আপডেট : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ২২:৩৭

বাংলা ভাষা চর্চার জন্য রাজনৈতিক নীতি যেমন ঠিক করতে হবে, তেমনি বাংলা শিক্ষার ক্ষেত্রে হীনমন্যতাবোধ দূর করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন বক্তারা। তারা বলেন, উন্নয়নের ইতিহাসের সঙ্গে ভাষার ইতিহাস জড়িত। জাপানের উন্নয়নের মূল কারণ মাতৃভাষাকে গুরুত্বারোপ। কিন্তু বাংলাদেশ এর ব্যতিক্রম। ভাষার আন্দোলন এখনো চলমান। আমাদের নিজস্ব ভাষা নীতি নেই। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলার চেয়ে ইংরেজিকে বেশি গুরুত্ব দেয়। আদালতে বাংলায় রায় লেখা হলেও আমাদের মৌলিক আইনগুলো এখনো ইংরেজি ভাষায় লেখা। গতকাল সোমবার বিকালে ভাষাশহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষ্যে ‘বাংলা ভাষার আন্তর্জাতিক মর্যাদা অর্জনে বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার অবদান এবং আমাদের করণীয়’ শীর্ষক ওয়েবিনারে বক্তারা এ সব কথা বলেন। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি এই অনলাইন আলোচনা সভার আয়োজন করে। 

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক মন্ত্রী মুক্তিযোদ্ধা মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত এই আলোচনা আমাদের কেবল পাকিস্তান রাষ্ট্র কাঠামোতে বাঙালিদের মাতৃভাষার দাবি প্রতিষ্ঠাকে স্মরণ করিয়ে দেয় না, বিশ্বের নানা স্থানে অনুষ্ঠিত ও চলমান মাতৃভাষার দাবিকেও স্মরণ করিয়ে দেয়। এমনকি আসামের শিলচরে বাংলা ভাষার জন্য রক্তদানও সারা বিশ্বের মাতৃভাষার দাবিকে মহিমান্বিত করে। মাতৃভাষার আন্দোলন এখনো পাকিস্তান, ভারত, লাটভিয়া, আমেরিকা, নেপাল ও দক্ষিণ আমেরিকায় চলমান। আমরা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য রক্ত দিয়ে একটি বাংলা ভাষাভিত্তিক জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছি।’

মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী দক্ষিণ এশীয় গণসম্মিলনের সভাপতি বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলেন, ‘বাংলার রায় লেখা হচ্ছে—যা আমাদের আনন্দিত করেছে। সমস্যা হচ্ছে মৌলিক আইনগুলো ইংরেজি ভাষায় লেখা। সেগুলো বাংলায় ভাষান্তর করা আবশ্যক হয়ে পড়েছে। বাংলায় রায় হলে বিচারপ্রার্থী নিজেরাই রায় বুঝতে পারবে। সব দেশেই আদালতের ভাষা তাদের নিজস্ব ভাষা।’

বরেণ্য কথা সাহিত্যিক সেলিনা হোসেন বলেন, ‘আমাদের সাহিত্য বহির্বিশ্বে তুলে ধরার উদ্যোগ খুবই কম। মানসম্মত অনুবাদের মাধ্যমে আমাদের সাহিত্য বহির্বিশ্বে তুলে ধরতে পারলে সাহিত্যের সমৃদ্ধি ঘটাবে।’ ১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্টের সভাপতি অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন বলেন, ‘উন্নয়নের ইতিহাসের সঙ্গে ভাষার ইতিহাস জড়িত। জাপানের উন্নয়নের মূল কারণ মাতৃভাষাকে গুরুত্বারোপ। বাংলাদেশ এর ব্যতিক্রম। আমাদের নিজস্ব ভাষা নীতি নেই। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলার চেয়ে ইংরেজিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’

মুক্তিযুদ্ধে শহিদ ভাষাসংগ্রামী ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের পৌত্রী সমাজকর্মী অ্যারমা দত্ত এমপি বলেন, বাংলা ভাষা চর্চার জন্য রাজনৈতিক নীতি ঠিক করতে হবে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার ব্যবহার ও মান বজায় রাখার জন্য সরকারের কাছে বড় বরাদ্দের প্রস্তাব করা দরকার। এ জন্য প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সকলের কাছে প্রস্তাব তুলে ধরতে হবে।’

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কথা সাহিত্যিক অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেন, ‘পৃথিবীর ভাষাসংখ্যা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। এ রকম বাংলাদেশেও ভাষার সংখ্যা কমছে। মাতৃভাষায় জ্ঞানচর্চার উদ্যোগ খুবই কম। সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক ভুল বাংলা লেখা হচ্ছে। আমরা যদি সঠিকভাবে এই বিষয়টা সমাধান না করি, তবে ভবিষ্যতে আমাদের যথেষ্ট দুর্গতি আছে। আমাদের দেশে বাংলার ওপর বিশাল তথ্যভান্ডার তৈরি করে তা বাংলা ভাষার প্রসারের জন্য সর্বক্ষেত্রে ব্যবহার করতে হবে।’

আয়োজক সংগঠনের সভাপতি লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবিরের সভাপতিত্বে ওয়েবিনারে আরো বক্তব্য রাখেন, ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউটের সম্মানিত সভাপতি নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সহসভাপতি শহিদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি ফোরাম ফর হিউম্যানিজম তুরস্ক-এর সাধারণ সম্পাদক, লেখক চিত্রনির্মাতা শাকিল রেজা ইফতি এবং একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী মুকুল প্রমুখ।