এটা ঠিক যে ইরাক, সিরিয়ায় আইএস দমনে কুর্দিরা অনেক বড় ভূমিকা রেখেছে। আর তাদের এই অবদানে যুক্ত ছিল মার্কিন সমর্থন। ইরাক, ইরান, সিরিয়া, তুরস্ক—এই চারটি দেশে বসবাসরত কুর্দিদের নিজস্ব একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি দীর্ঘদিনের। আর এই দাবির পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন আগাগোড়াই ছিল। সিরিয়া, ইরাকের কুর্দিদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয় আইএসের উত্থানের মাধ্যমে। এ সময় যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র-সহায়তা এবং সামরিক উপদেষ্টাদের দ্বারা প্রশিক্ষণের সুযোগ পায় কুর্দিরা। যেহেতু চারটি দেশের কুর্দিদের লক্ষ্য অভিন্ন, তাই যে-কোনো একটি দেশের কুর্দিদের শক্তিশালী হওয়া মানে বাকি তিনটি দেশের জন্য হুমকি। তাদের মধ্যে একটা ভীতি কাজ করে, যদি একইভাবে তাদের দেশের কুর্দিরাও শক্তিশালী হয়ে যায়। ইরাক ও সিরিয়ার ভঙ্গুর রাষ্ট্রব্যবস্থার কারণে, ইরাকের কুর্দিরা স্বায়ত্তশাসন শাসন ভোগ করছে এবং সিরিয়াতেও একটা এলাকা কুর্দিদের শাসনে রয়েছে। ঠিক একইভাবে তুরস্ক ও ইরানের কুর্দিরা অতটা শক্তিশালী নয়। তুরস্ক কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি বা পিকেকে-কে সন্ত্রাসী সংগঠন মনে করে এবং তাদের ওপর দমনপীড়ন নিয়মিতভাবেই পরিচালনা করে আসছে। তুরস্ক শুধু নিজ দেশের কুর্দিদের দমনপীড়ন করেই ক্ষান্ত নয়। সিরিয়া ও ইরাকে কুর্দিদের দমন করাকেও নিজেদের দায়িত্ব মনে করে।
ইরাকের উত্তরাঞ্চলে কুর্দি বিদ্রোহীদের দ্বারা ১৩ জন তুর্কি নাগরিকের হত্যার ঘটনায় কুর্দি ইস্যু আবারও সামনে চলে এলো। তুরস্ক সে দেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে তলব করে এই ঘটনার প্রতিবাদ করেছে। মার্কিন কুর্দি নীতির প্রতিবাদ করেছে এবং মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর তার নিন্দা প্রস্তাবে ‘যদি’ কথাটা যুক্ত করায় এটাকে শর্তযুক্ত বলে উপহাস হিসেবে উল্লেখ করেছে।
এমনিতেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক খুব ভালো যাচ্ছে না। ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা ওঠানোর কোনো আভাসই পাওয়া যাচ্ছে না। ২০১৬ সালে তুরস্কের ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের যুক্ত থাকার অভিযোগ প্রকাশ্যেই করেছেন এরদোয়ান। তখন ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন আজকের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। এমনকি নির্বাচনের আগে একাধিক বার জো বাইডেন বলেছিলেন তিনি তুরস্কে সরকার পরিবর্তন চান।
কিন্তু চার বছর আগে বাইডেন যে তুরস্ককে রেখে গিয়েছিলেন আর আজকের তুরস্কের মাঝে অনেক ব্যবধান। বাইডেন যে রাশিয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের সব চেয়ে বড় শত্রু বলে উল্লেখ করেছেন, সেই রাশিয়ার সেনাদের সঙ্গে সিরিয়াতে যৌথ টহল দিচ্ছে তুর্কি সেনারা। নার্গানো কারাবাখ সমস্যায় ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রকে উপেক্ষা করে রাশিয়া এবং তুরস্ক সমাধান করেই ক্ষান্ত হয়নি, সেখানে রাশিয়ার সৈনদের পাশাপাশি তুর্কি সৈন্যরাও শান্তি স্থাপনে কাজ করছে। লিবিয়ায় জিএনএ সরকারের সঙ্গে খলিফা হাফতারের মধ্যে যুদ্ধ বিরতি তুরস্ক এবং রাশিয়ার আন্তরিকতার কারণেই সম্ভব হয়েছে। গ্রিসের সঙ্গে দ্বন্দ্বে তুরস্কের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞা আরোপের চেষ্টা প্রতিহত করতে কয়েকটি দেশের সমর্থন আদায়ে সক্ষম হয়েছে আঙ্কারা। আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতারে তুর্কি সেনাদের উপস্থিতি অনেক বেড়েছে। পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়াকে সঙ্গে নিয়ে মুসলিম বিশ্বে প্রভাব বাড়াতে যাচ্ছে তুরস্ক। বিশ্ব মুসলিমদের ভয়েসে পরিণত হতে চলছে তুরস্ক। আর এ ক্ষেত্রে অনেকটাই সফল দেশটি। এই তো কিছুদিন আগেই যুক্তরাজ্যের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করল তুরস্ক। হামাস ও ফাতাহের মধ্যে বিরোধ মেটাতেও কাজ করল তুরস্ক। ইসরায়েলের সঙ্গে কয়েকটি আরব দেশের সম্পর্ক স্থাপনের নিন্দা জানালেও ইসরায়েলে দীর্ঘদিন পর রাষ্ট্রদূত পাঠিয়েছে আঙ্কারা।
দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা নিরসনে সৌদি আরব আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তুরস্ক একদিকে যেমন মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব দিতে চাচ্ছে, একই সঙ্গে আঞ্চলিক পরিমণ্ডলে সফলভাবে অতিক্রম করে বৈশ্বিকভাবে প্রভাব রাখতে চাচ্ছে। সর্বশেষ জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনেও প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান নিরাপত্তা পরিষদে মুসলিম বিশ্বের প্রতিনিধি রাখার আহ্বান জানান। ভৌগোলিক অবস্থান এবং ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে উপেক্ষা করে দীর্ঘদিনের মিত্র তুরস্ককে কি উপেক্ষা করতে পারবে?
রাশিয়ার সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে তুরস্কের সমঝোতা হলেও এখনো অনেক ইস্যুতে মতবিরোধ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি তুরস্ককে উপেক্ষা করে তাহলে হয়তো তুরস্ককে রাশিয়া ও চীনের দিকে ঠেলে দেবে। চার বছর পর যে তুরস্ককে জো বাইডেন পেলেন, তা আদৌ উপেক্ষা করার ক্ষমতা কি যুক্তরাষ্ট্রের আছে? দেখা যাক!
n লেখক :শিক্ষার্থী, আধুনিক মুসলিম রাষ্ট্রসমূহের ওপর স্নাতকোত্তর অধ্যয়নরত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

