করোনা ভাইরাসের মহামারিতে বিশ্বে যে কয়টি শিল্প খুব দ্রুত এগিয়েছে তার মধ্যে ই-স্পোর্টস অন্যতম। অনলাইন গেম খেলে অনেকেই প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা রোজগার করছে। বাংলাদেশেও অনেকে ই-স্পোর্টসকে পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। তবে ই-স্পোর্টস সম্পর্কে অনেকের ধারণা নেই। সম্ভাবনাময় এই শিল্প সম্পর্কে তরুণ-তরুণীদের ধারণা দিতে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করছে ইত্তেফাক অনলাইন। আজ থাকছে প্রথম পর্ব-
অনলাইন গেম খেললে সময়ের অপচয়, পড়ালেখার ক্ষতি ও মানসিক সমস্যা হয়-এসব বিষয় নিয়ে আমাদের দেশে আলোচনা হলেও এটি একটি সম্ভাবনাময় খাত তা নিয়ে কোনো আলোচনা হয় না। আমাদের দেশে এই শিল্প হতে পারে অর্থ আয়ের এক স্বর্ণ খনি। পার্শ্ববর্তী দেশ নেপাল ও পাকিস্তানে ই-স্পোর্টসকে আনুষ্ঠানিক খেলার মর্যাদা দিলেও এখনো অন্ধকারে বাংলাদেশ। তবে কিছু তরুণের হাত ধরে সম্ভাবনাময় এই খাত দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে। অনেকেই পেশা হিসেবে ই-স্পোর্টসকে বেছে নিচ্ছেন।
শুরুতেই জেনে নেওয়া যাক ই-স্পোর্টস কি?
অনলাইনভিত্তিক কম্পিউটার কিংবা মোবাইল গেমিং টুর্নামেন্টগুলোকে বলা হয় ইলেকট্রনিক স্পোর্টস বা ই-স্পোর্টস। পশ্চিমা দেশগুলোতে বড় বড় মিলনায়তন ও স্টেডিয়ামে জাকজমকভাবে এসব টুর্নামেন্টের আয়োজন করা হয়। টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়া গেমারদের বলা হয় পেশাদার ই-স্পোর্টস খেলোয়াড়। তারা দলগত কিংবা এককভাবে টুর্নামেন্টে অংশ নিতে পারেন।
মজার বিষয় হচ্ছে এসব টুর্নামেন্টে যে প্রাইজমানি থাকে তা অনেক মাঠের খেলা থেকেও বেশি। সেই সঙ্গে জনপ্রিয়তা তো আছেই। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়- ২০২১ সালের শেষ নাগাদ বিশ্বব্যাপী ই-স্পোর্টস শিল্পের রাজস্ব গিয়ে দাঁড়াবে ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। বাংলাদেশি টাকায় যা সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা। এই রাজস্ব আগের বছরের তুলনায় ১৪ শতাংশ বেশি। জনপ্রিয়তা ও মানুষের অংশগ্রহণ ক্রমশ বাড়তে থাকায় ২০২৪ সালে এই শিল্পের রাজস্ব গিয়ে দাঁড়াবে ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে। যা বাংলাদেশি টাকায় সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। এসব অর্থের বেশিরভাগ চলে যাচ্ছে ই-স্পোর্টস খেলোয়াড় ও দলগুলোর মধ্যে। পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোতে একজন পেশাদার ই-স্পোর্টস খেলোয়াড়রা ক্রমশ ফুটবল বা বাস্কেটবল খেলোয়াড়দের মতোই জনপ্রিয় হয়ে উঠছেন। তাদের আয়ও এমন উচ্চতায় পৌঁছেছে যা ঈর্ষণীয়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়- দক্ষিণপূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য-দক্ষিণ এশিয়াতে ই-স্পোর্টসের জনপ্রিয়তা হু হু করে বাড়ছে। যার প্রভাব পড়েছে এই শিল্পের আন্তর্জাতিক বাজারে। এসব অঞ্চলে গেম নির্মাতা ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বড় বড় বিনিয়োগ শুরু করেছে। যার সুবাতাস বাংলাদেশেও আসতে শুরু করেছে।
বাংলাদেশে ই-স্পোর্টসের এই শিল্প বড় আকারে আলোচনার এসেছে পাবজি ও ফ্রি-ফায়ারের মতো জনপ্রিয় মোবাইল গেমগুলোর মাধ্যমে। দুটো গেমের বিশ্বকাপখ্যাত প্রতিযোগিতার ফাইনালে পৌঁছেছে বাংলাদেশি তরুণরা। পাবজি বিশ্বকাপ খেলতে বাংলাদেশি দল এ-ওয়ান ই-স্পোর্টস দুবাই গিয়েছিলো। অন্যদিকে ফ্রি-ফায়ারের বিশ্বকাপে টিম রায়োট করোনা ভাইরাসের কারণে সিঙ্গাপুর যেতে পারেনি। উভয় টুর্নামেন্টের প্রাইজমানি ছিল ১৬ থেকে ১৭ কোটি টাকা।
টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই এই শিল্পের এগিয়ে যাওয়া। বাংলাদেশ বৃহৎ জনসংখ্যার দেশ। তরুণদের গেমিংয়ের প্রতি যথেষ্ট আগ্রহ থাকার কারণে পাবজি ও ফ্রি ফায়ার উভয় প্রতিষ্ঠানই দেশে বিনিয়োগ করতে শুরু করেছে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশিদের জন্য স্থানীয়ভাবে পাবজি মোবাইল গেম কর্তৃপক্ষ পাবজি মোবাইল ক্যাম্পাস চ্যাম্পিয়নশিপ-পিএমসিসি নামে দুইটি টুর্নামেন্টের আয়োজন করেছে। সেখানে দ্বিতীয় সিজনে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মোট ১৯ হাজার ৫২০টি দল নিবন্ধন করেছে।
এ বিষয়ে পাবজি মোবাইল ক্যাম্পাস অ্যাম্বাসেডর ফজলে রাব্বি ইত্তেফাক অনলাইনকে জানান, এই টুর্নামেন্টের প্রাইজমানি ২৪ লাখ টাকা। এছাড়া আগামী অক্টোবরে একই শিরোনামে তৃতীয় টুর্নামেন্ট আসছে। ফ্রি ফায়ার থেকেও ২৫ লাখ টাকা প্রাইজমানির টুর্নামেন্ট আয়োজন করা হয়েছে শুধু বাংলাদেশের জন্য। ভবিষ্যতে এ রকম টুর্নামেন্ট আরও হবে। ফ্রি-ফায়ার বাংলাদেশি খেলোয়াড়দের জন্য বিশেষ সার্ভারের ব্যবস্থাও করে দিয়েছে।

মোবাইল গেমিংয়ের সঙ্গে জড়িত সংশ্লিষ্টরা ইত্তেফাক অনলাইনকে জানান, বাংলাদেশে ই-স্পোর্টসকে ক্যারিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছে বেশকিছু তরুণ। এরা আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট খেলে লাখ লাখ টাকা আয় করতে সক্ষম হচ্ছেন। তাদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান স্পন্সর হিসেবে যুক্ত হচ্ছে। বিষয়টি ক্রিকেট, ফুটবলের স্পন্সরশিপের মতোই। আবার দেশের অনেক পেশাদার মোবাইল গেমার অন্য দেশের দলগুলোর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। টুর্নামেন্ট, স্পন্সরশিপের পাশাপাশি ইউটিউবে লাইভ স্ট্রিম করেও আয় করছেন অনেকে। বাংলাদেশে এই শিল্প সবেমাত্র উঠতে শুরু করেছে। এতদিন পর্যন্ত যা হয়েছে তা আমাদের স্ব-উদ্যোগেই করতে হয়েছে। সরকারের সহায়তা পেলে এ শিল্পের দ্রুত বিকাশ হবে। তাছাড়া বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ আরও বৃদ্ধি পাবে।
মোবাইলের পাশাপাশি কম্পিউটার গেমিংয়েও এগোচ্ছে বাংলাদেশে। সে বিষয়ে ইত্তেফাক অনলাইনের পরবর্তী পর্বগুলোতে তুলে ধরা হবে। তবে বাংলাদেশে এই শিল্প নিয়ে যারা কাজ করছে ইতিমধ্যে তাদের অনেকের মাসিক আয় লাখের উপর চলে গেছে। তাদের দেখে অনেকের আগ্রহ সৃষ্টি হচ্ছে। এতে উঁকি দিচ্ছে নতুন এক দিগন্তের।
দেশে বেকারত্বের সমস্যা আগে থেকেই প্রকট। যারা বেসরকারি চাকরি করছে তারা যে খুব স্বাচ্ছন্দ্যে আছে তাও কিন্তু না। যখন-তখন চাকরি হারানোর ভয়ে থাকেন তারা। আর অনিয়মিত বেতন নিয়ে অশান্তির যেন শেষ নেই। সরকারি চাকরি করতে চাইলে রীতিমতো যুদ্ধ ঘোষণা করতে হয়। নিয়োগ পরীক্ষাগুলোতে একটি শূন্য পদের বিপরীতে হাজার হাজার মানুষ পরীক্ষা দিচ্ছে। প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে কয়েক বছর সময় নিয়ে।
গ্রাজুয়েশন শেষ হতেই বাংলাদেশে এসব কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে তরুণ-তরুণীদের। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে হয় আপনাকে উদ্যোক্তা হতে হবে, না হয় ভিন্ন কোনো খাতে ক্যারিয়ার গড়তে হবে। সভ্যতার অগ্রগতি ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ফলে পশ্চিমা বিশ্বে এমন অনেক খাত আছে যা সম্পর্কে এই দেশের মানুষ কিছুই জানে না। এমন একটি সম্ভাবনাময় ও উল্লেখযোগ্য খাত হচ্ছে ই-স্পোর্টস। যা এদেশের বেকারত্ব কমানো ও বহুমুখী ক্যারিয়ারের নতুন পথ খুলে দিতে পারে।
এক সময় ক্রিকেট খেলা শিখতে চাওয়া সন্তানটিকে নিয়েও মা-বাবার আপত্তির শেষ ছিল না। কালের পরিবর্তনে পেশাদার ক্রিকেটারদের জীবন মান দেখে এখন অনেকেই নিজ সন্তানকে ক্রিকেটার বানানোর স্বপ্ন বুনেন। স্কুলের পাশাপাশি সন্তানকে নিয়ে ক্রিকেট একাডেমিগুলোতে ছুটে বেড়ান। এই পরিস্থিতি একদিনে সৃষ্টি হয়নি। দিনে দিনে চিন্তা ভাবনায় পরিবর্তন এসেছে। অন্যান্য খেলাগুলোও একই অবস্থার মধ্যে দিয়ে বর্তমান অবস্থায় পৌঁছেছে। বাংলাদেশে ই-স্পোর্টস এর ব্যতিক্রম কিছু না। দেশে সবে মাত্র উঠতে শুরু করেছে এই খাত। কিন্তু মানুষের অদূরদর্শিতার কারণে এগোতে চাইলেও বার বার থমকে যাচ্ছে ব্যাপক সম্ভাবনাময় ই-স্পোর্টস। তাই গেম খেলার নেতিবাচক দিকগুলো আলোচনা করার পাশাপাশি আমাদের ইতিবাচক দিকগুলো সম্পর্কেও জানা জরুরি। আমাদের দেশেরই কিছু তরুণ সে পথ দেখিয়েছেন। যাদের নিয়ে আগামী দিনগুলোতে ইত্তেফাক অনলাইনে প্রকাশিত হবে বেশকিছু প্রতিবেদন।
ইত্তেফাক/ইউবি
