গাজা শান্ত এখন, তবে এই যুদ্ধবিরতি কদ্দিন থাকবে? কে জানে, কদ্দিন থাকবে? ইসরাইল রাষ্ট্রের ধ্বংসাত্মক নির্দয় ক্ষমতার দম্ভ বিশ্ববাসী—লেবানন, গাজা, সিরিয়ার যুদ্ধগুলোতে দেখেছে। দেখেছে যে ২০০৯, ২০১২, ২০১৪ এবং সর্বশেষ ২০২১ সালের গাজা যুদ্ধে ইসরাইল বাছবিচারহীনভাবে বোমা বর্ষণ করে অসামরিক সংস্থাপন, অসামরিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার, বসতবাড়ি গুঁড়িয়ে দিয়েছে এবং সেই সঙ্গে ভেদবুদ্ধিহীনভাবে অসংখ্য অসামরিককে আহত ও নিহত করেছে।
ইসরাইল রাষ্ট্রের সেরিমোনিয়াল আইডিয়া ও আঁতুরাবস্থার সংক্ষিপ্ততম মুখবন্ধ এরকম :পশ্চিম ইউরোপের উপনিবেশবাদীরা তাদের দখলিকৃত প্রাক্তন ভূখণ্ডের সর্বত্র যেসব ইক্সট্রা-অর্ডিনারি বিষফোড়া সৃষ্টি করেছে এবং যা থেকে জন্ম নিয়েছে ও বিকশিত হয়েছে সহিংসতার হটবেড, ‘ইহুদি রাষ্ট্র’ সেগুলোর মধ্যে একটি। প্রথম মহাযুদ্ধের দ্বিতীয় বছরে, ১৯১৬ সালে অ্যাংলো-ফরাসিরা ‘সাইকস-পিকোও (Sykes–Picot) নামে গোপন চুক্তি করে; এই চুক্তির মূল বিষয়বস্তু :যুদ্ধ শেষে, ওসমানিয়া সাম্রাজ্যের মধ্যপ্রাচ্য ভূখণ্ডটিকে কাটাকাটি করে নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারার ব্যবস্থা করবে এবং সহযোগিতার ভিত্তিতে নিজেদের মধ্যে যার যার প্রভাব-বলয় রক্ষা করবে। প্রথম মহাযুদ্ধের তৃতীয় বছরে, ১৯১৭ সালে, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সরকার ‘বেলফোর ঘোষণা’ দেয় ও যুগ যুগ ধরে ফিলিস্তিনে ইহুদিদেরকে নিজস্ব ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের ‘অধিকার’ মঞ্জুর করে; সেখানে ইহুদির সংখ্যা ছিল যত্সামান্য। ১৯৪৫ সালে ইয়াল্টা কনফারেন্স শেষে ঘরে ফেরার পথে ‘ভ্যালেনটাইন ডে-তে’ প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট ও কিং আবদুল আজিজের মধ্যে ‘কুইন্সি’ নামক যুদ্ধ জাহাজে মিটিং হয়; সেই মিটিং-এ ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্র সৃষ্টি প্রসঙ্গে প্রেসিডেন্টকে সাবধান করে কিং আজিজ বলেছিলেন : ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডে ইসরাইলকে বসিয়ে দিয়ো না, নয়তো রক্তের স্রোত বইবে হে...; এমন কাজটি কোরো না...। বেদুইন রাজার কথা কে শোনে!
গাজার প্রথম তিন যুদ্ধের থেকে ২০২১ সালের মে মাসের যুদ্ধের বিশেষত্ব হলো যে হামাস—‘হোম-মেইড’ ঝাঁকে ঝাঁকে মিসাইলের পাল এবং গুচ্ছ গুচ্ছ স্মার্ট ড্রোন ব্যবহার করেছে।
বিবিধ কারণে হিজবুল্লাহ, ইয়েমেন, হামাস, ইরান-বিমান শক্তির বিকল্প হিসেবে হরেক শ্রেণির মিসাইল ও হরেক শ্রেণির স্মার্ট ড্রোন বেছে নিয়েছে।
ইসরাইলের গর্ব অজেয় মিসাইল ইন্টাসেড়্গ্বার ‘আইরন ডোম’—‘হোম-মেইড’ সস্তার মিসাইল ও ড্রোনের ঝাঁকগুলোর সব কয়টিকে বাধা দিয়ে পাকড়াও করতে ব্যর্থ হয়েছে। ক্ষিপ্ত ইসরাইলি বিমানবহর ডজনখানেক টার্গেটে বোমাবৃষ্টি করেছে; ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে স্থানীয় বাসিন্দাদের উত্তেজিত করতে নামিদামি বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকায় বোমাবৃষ্টি করেছে; কিন্তু উদ্দেশ্য সফল হয়নি। মধ্যপ্রাচ্যের শ্রেষ্ঠ বিমানবহরের হিংস্রতার বিরুদ্ধে ও চুপিসারে ফিলিস্তিনিদের ভূখণ্ড ক্রমশ গ্রাস করার বিরুদ্ধে প্রথমবারের মতো, ওয়াশিংটনের ‘রাজনৈতিক মার্কেটে’ সিরিয়াস বিতর্ক উঠেছে। অর্থাত্ গত ৭৩ বছর ধরে শান্তি স্থাপনে অসাধারণ অবদান রাখার জন্য যে ’নোবেল শান্তি পুরস্কারের’ লেনদেন হয়েছে, ক্যাম্প ডেভিডের গাছপালায় ছাওয়া পরিবেশে আলোচনা হয়েছে, দুই রাষ্ট্র সমাধান চুক্তি তথা ‘ওসলো চুক্তি’, সব রূপকথায় পরিণত হয়েছে। সহজ বাংলায়, ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাত আর কোনো দিনই পূর্বেকার অবস্থায় ফিরে আসবে না; পালটে গেছে।
বরং হামাসের মিসাইল যখন জেরুজালেম ও তেল আবিবে বিনা বাধায় আছড়ে পড়ে—অলৌকিক অবস্থার সৃষ্টি হয়। সেই ১৯৪৮/১৯৪৯ সালে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ব্যাপক ইসরাইলি নৃতাত্ত্বিক বিশোধনের পরে (আল-নাকবা)—আক্কা, লদ, রামলা, নেগেভ, গ্যালিলি ইত্যাদি অঞ্চলের বুকভরা হতাশা নিয়ে ঝিমিয়ে পড়া ফিলিস্তিনিদের প্রজ্বলিত করে দেয়; গাজা, পশ্চিম ধার/ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক, জেরুজালেম, ইসরাইলের ফিলিস্তিনি নাগরিকরা একতাবদ্ধ ফিলিস্তিনিতে পরিণত হয় আবার। মধ্যপ্রাচ্যের সর্বশ্রেষ্ঠ সর্বাধুনিক সামরিক বাহিনীর বেশ কয়েকটি ঘাঁটিতেও হামাসের মিসাইল আঘাত হেনেছে।
ফিলিস্তিনিদের ‘সোর্ড অব জেরুজালেম/জেরুজালেমের তলোয়ার’ যে ইসরাইলের ‘গার্ডিয়ান অব দি ওয়ালস/দেওয়ালগুলোর পাহারাদার’-কে অবদমিত করেছে তার দুটো লাগসই প্রমাণ হলো :হাইফার মেয়ে লায়লা খালেদের (১৯৬৯ সাল) টার্বো চার্জযুক্ত দিনগুলো বাদ দিলে, সমষ্টিগতভাবে ‘গাজা’ তাবত্ ফিলিস্তিনিদের মনে বিস্মৃত প্রায় ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের চেতনাকে ফিরিয়ে এনেছে; এবং শেখ জাররাহ, পূর্ব জেরুজালেম থেকে ফিলিস্তিনি পরিবারের উচ্ছেদ-প্রজেক্ট আন্তর্জাতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে এবং অন্যায়ভাবে নিপীড়িত ফিলিস্তিনিদের মানবেতর জীবনযাপনের প্রতি বিশ্বীয় সচেতনতা ও সলিডারিটি আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফরমে স্থান পেয়েছে। বলপূর্বক উচ্ছেদ, বলপূর্বক অভিপ্রয়ান, নৃত্ত্বিক বিশোধন, উপনিবেশবাদ ইত্যাদি বিষফোড়াগুলো সম্বন্ধে, যা আগে অভাবনীয় ছিল, যুক্তরাষ্ট্রে সেসব নিয়ে বলা হচ্ছে। মাত্র কয়েক দিন আগেও ইসরাইলকেন্দ্রিক এই ধরনের বিতর্ক, আলোচনা ছিল অলঙ্ঘনীয় ট্যাবু।
মিশরের ‘মধ্যস্থতায়’ গাজা যুদ্ধে সাময়িক বিরতি এসেছে মাত্র। ‘নাথিং টু লুজ’ প্রজন্মের হামাস-লিডারশিপ ‘গাজা ডিবেট’কে সম্মিলিত ফিলিস্তিনির আন্দোলনে পরিণত করেছে। কাজেই যুদ্ধের শেষ নয়, শুরু মাত্র। যুদ্ধের পরবর্তী ধাপে—ইসরাইলকে আল-আকসা, জেরুজালেম এবং আল-নাকবা নিয়ে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। অর্থাত্ ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘর্ষ আর পূর্বেকার মতো হবে না। হামাসের মিসাইল ব্যারেজ—ইসরাইলকে ও ওয়াশিংটনকে বিস্মিত করেছে; অবশ্য লেবানন যুদ্ধে হিজবুল্লাহর ক্রুজ মিসাইলের সেতুবন্ধ বা ব্যারেজের অভিজ্ঞতা ইসরাইলের হয়েছিল। হতভম্ব যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ কি করবে বুঝতে না পেরে উভয় পক্ষকে দ্রুত নরমালিটিতে ফিরে আসার পরামর্শ দিয়েছে; ফিলিস্তিনিদের কাছে পরামর্শটি বিদ্রুপের মতো নয় কি? গত ৭৩ বছর ধরে ওদের তো কোনো নরমাল লাইফ নেই! যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ অবশ্য পুনরাবৃত্তিও করে যে ইসরাইলের আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে; ইইউর কয়েকটি দেশ সরকারি ভবনগুলোতে ইসরাইলি পতাকাও উড়িয়ে দেয়। কিন্তু ইসরাইলি বিমানবহরের এফ-৩৫-এর বোমাবৃষ্টিতে যে ২৩০ জন ফিলিস্তিনি ও ৬৫ জন নাবালক নিহত হয়েছে, সেসব ছবি দেখে বহির্বিশ্ব বলছে যে কাজটি খারাপ হয়েছে, ‘অফেন্স’ করেছে ইসরাইল।
যুদ্ধবিরতি চলছে, হামাস কোথাও নেই, তবুও আছে, সর্বত্র আছে।
n লেখক : বিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক লেখক

