কুড়িগ্রাম সীমান্তে বাড়ছে জ্বর-সর্দির প্রকোপ

আপডেট : ১৭ জুন ২০২১, ১২:৫১

উত্তরের জেলা কুড়িগ্রামে অন্যান্য বছরের তুলনায় ভারত সীমান্তঘেঁষা এলাকাগুলোতে অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে জ্বর ও সর্দির প্রকোপ। ফলে বিভিন্ন এলাকায় প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধসহ অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যাপক চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। 

সীমান্তে কাঁটাতার না থাকায় অবাধে ভারতীয়দের বাংলাদেশে যাতায়াত করার অভিযোগ রয়েছে। এদিকে এ বিষয়ে উদ্বিগ্ন জেলা, উপজেলা ও স্বাস্থ্য বিভাগ। 

কুড়িগ্রামের ৯ উপজেলার মধ্যে ৭ উপজেলায় রয়েছে ভারতের সাথে ২৭৮.২৮ কিমি সীমান্ত। এরমধ্যে নদীসহ সমতল ভূমিতে প্রায় ৩২কিমি সীমান্তে কাঁটাতার নেই। কাঁটাতারবিহীন এসব এলাকায় বিজিবির টহল থাকলেও তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে ভারত-বাংলাদেশিদের অবাধে চলাফেরা অব্যাহত রয়েছে।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম রাজ্যের সীমানায় কুড়িগ্রাম-২২ বিজিবির অধীনে ১৯৮ কিমি সীমান্ত। জামালপুর-৩৫ বিজিবির আওতায় সীমানা প্রায় সাড়ে ৪৬ কিমি কাঁটাতার। আর ওপারে ভারতের আসাম ও মেঘালয় রাজ্য। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সীমানায় লালমনিরহাট-১৫ বিজিবির অধীনে ৩৬ কিমি সীমান্ত। জেলায় ১৬টি নদ-নদীর ৩১৬ কিমি নদী পথে প্রায় পাঁচ শতাধিক চরাঞ্চলে ৫-৭ লাখ মানুষের বসবাস। 

স্থানীয় একটি ওষুধের দোকান। ছবি: ইত্তেফাক

সরেজমিনে ফুলবাড়ী উপজেলার নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের সীমান্তঘেঁষা খলিশাকোঠাল গ্রামের কাঁটাতারবিহীন ভারতের কোচবিহার জেলার দিনহাটা থানার থরাই খানা অঞ্চলের বসকোঠাল গ্রামের মাঝে ভারতীয়-বাংলাদেশিদের অবাধে চলাফেরা অব্যাহত রয়েছে। 

এছাড়াও নাগেশ্বরী, ভূরুঙ্গামারী, রৌমারী, রাজিবপুর উপজেলার সীমান্ত এলাকাগুলোতে ব্যাপকহারে সিংহভাগ ঘরেই জ্বরের প্রকোপ তীব্র আকার ধারণ করেছে। শুধু সীমান্ত এলাকা নয় জ্বর, সর্দি ও কাশির প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে জেলার মূল ভূখণ্ডের বাসিন্দাদের মধ্যেও। জেলাসহ বিভিন্ন উপজেলায় করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধি ও অপরদিকে সব এলাকায় জ্বরের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ায় মানুষের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছে। 

খলিশাকোঠাল সীমান্তে গিয়ে ভারতীয় নাগরিক বসকোঠাল গ্রামের বাসিন্দা হাফিজ আলীর (৬২) সাথে দেখা হয়। তিনি বলেন, ‘করোনা বলতে নাই হামার এটি। ফুলবাড়ী, বালারহাট যাই কোন সমস্যা নাই।’

একই এলাকার ভারতীয় বাসিন্দা মজিবার রহমান (৬০) বলেন, ‘করোনার ভয় নাই। ইন্ডিয়াত করোনা আছে কাঁটাতারের ভিতরা। বাইরা নাই। ইন্ডিয়ার কোলকাতা, দিল্লি এগলা জায়গায় করোনা হামার এডে নাই। বাংলাদেশি এবং ভারতীয় মেশামেশি করি কোন সমস্যা নাই।’ 

সীমান্তঘেঁষা নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের পশ্চিমফুলমতি গ্রামের নুর হোসেন (৪৫) আট দিন থেকে জ্বরে আক্রান্ত হলেও কোন করোনার পরীক্ষা করান নাই। তিনি বলেন, ‘বাহে এগলা ঠাণ্ডা জ্বর কোন করোনা নুয়ায়। তাই ভয়ের কিছু নাই।’

সীমান্তে বিএসফের টহল। ছবি: ইত্তেফাক

একই ইউনিয়নের কলাবাগান গ্রামের জাহাঙ্গীর ও কুরুষাফেরুষা গ্রামের রতন চন্দ্র জানান, চারদিন থেকে জ্বরে আক্রান্ত। তারা বলেন, ‘জ্বরের কারণে খাবার রুচি নেই, বমি ভাব, শরীর দুর্বল লাগে।

করোনার পরীক্ষা করেছেন কি না এই বিষয়ে বলেন, ‘না। গরিব মানুষ, জ্বরের চিকিৎসা পল্লী ডাক্তারের কাছত নেই। টাকা পয়সা নাই, যে হাসপাতাল যাবো। খাবার পাই না করোনা পরীক্ষা করি কেমনে।’

সীমান্তঘেঁষা বালারহাট বাজারের পল্লী চিকিৎসক ইয়াকুব আলী জানান, প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে জ্বর, ডায়রিয়া দেখা দেওয়ায় ওষুধের চাহিদা বেড়েছে অনেক। এছাড়াও করোনার ভয়ে অনেকেই তাদের অসুস্থতার বিষয়টি গোপন রাখছে। ঘরে ঘরে জ্বরের আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি হলেও করোনার পরীক্ষা না হওয়ায় আমরা বুঝতে পারছিনা তারা সাধারণ জ্বরের রোগী না কি করোনায় আক্রান্ত। গত এক সপ্তাহে আড়াই থেকে ৩’শ রোগীর চিকিৎসা দিয়েছি। আমাদের মধ্যে আতঙ্ক বেশি কাজ করছে।

 

ছবি: ইত্তেফাক

একই বাজারের পল্লী চিকিৎসক গোলাম মোরর্শেদ জানান, বর্তমানে প্রতিটি ঘরে ঘরে জ্বর, সর্দিসহ শ্বাসকষ্টের রোগী আছে। গত চার দিনে শিশুসহ বিভিন্ন বয়সের প্রায় ২’শ জন জ্বরের রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। প্রতিদিনই ফার্মেসিতে এসব রোগীর আসছে। বিষয়টি স্বাস্থ্য বিভাগকে জানানো হয়েছে। এতে করে আমরাও করোনার আতঙ্কে আছি। সীমান্ত ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের ফার্মেসিগুলোতে ওষুধ সংকট রয়েছে বলে জানান তিনি।

এ প্রসঙ্গে সিভিল সার্জন ডা. হাবিবুর রহমান জানান, সীমান্ত এলাকাগুলোতে জ্বরের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ায় কিছুটা উদ্বিগ্ন হওয়ার কথা স্বীকার করেন তিনি। তবে তিনি সিজোনাল কারণে টাইফয়েডের প্রবণতাও বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানান। 

কোভিড-১৯ কে চিহ্নিত করতে রেপিটেনজিন কিটের মাধ্যমে দ্রুত পরীক্ষার জন্য প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত করেন তিনি।

ইত্তেফাক/এএএম