আমাদের দেশটি বয়সে, অভিজ্ঞতায়, শিল্পে সমৃদ্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দারুণভাবে মিশে আছে মঞ্চকর্মীদের আত্ম-নিবেদনের গল্প। ঢাকা থিয়েটার’-এর ৪ যুগপূর্তি এক দারুণ ইতিহাস। এককভাবে প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে একটি নাট্যদলের সুবর্ণজয়ন্তী বিরল অভিবাদনের প্রাপ্যতা রাখে। আজ সুবর্ণজয়ন্তীতে একজন মঞ্চকর্মী হিসেবে অভিনন্দন জানালেন থিয়েটারের পুরনো সদস্য—
চার যুগ পার হলো ঢাকা থিয়েটারের। অথচ এখনো মনে হয়, সেদিনের কথা। আড্ডা দিই তখন ডিআইটির সিঁড়িতে। স্বাধীনতার পর ঢাকায় শুরু হয়েছে নানা গল্পের নাট্যরূপ ও তার মঞ্চায়ন। নতুন একটি দেশ, তারুণ্যের কী এক কাঁচা অনুভব। তুখোড় সাংস্কৃতিক আন্দোলন। যে আন্দোলনের ভেতর দিয়ে একটি দেশ পায় একটি শৈল্পিক রূপ। ঢাকা থিয়েটার সেই বুনিয়াদ তৈরির কাজটিই করেছিল।
কলকাতায় যখন উত্পর দত্তের হাঁকডাক, টিনের তলোয়ারের ঝনঝন শব্দ তখন কাছাকাছি সময় সুজা ভাইকে (সুজা খন্দকার) দেখলাম একদিন ডিআইটির বারান্দায় হাঁটছে।
সুজা ভাই, ভুঁড়ি কেন? তুমি জানো না? নাটক হচ্ছে, মুনতাসরি ফ্যান্টাসি। আর আমি মুনতাসিরের ভূমিকায় অভিনয় করছি। আমাদের মঞ্চ ছিল ডিআইটির উল্টো দিকেই। দলে এখন থেকে ভালো করে মেকআপ নিয়ে যাচ্ছিল সুজা ভাই।
ঢাকা থিয়েটার সম্পর্কে তখন আমি কিছুটা জানি। নাসিরউদ্দিন ইউসুফ তখন এক দারুণ চরিত্র আমাদের কাছে। ক্র্যাক প্লাটুনের কমান্ডার। প্রথম যারা ঢাকা টেলিভিশনে এসেছিলেন তিনি তাদের একজন। বাচ্চু ভাই ডিআইটির বারান্দায় থিয়েটার কর্মী হিসেবে আমাদের যুদ্ধ করতে বললেন এবং আমরা বুঝতে শিখলাম এখানে শুধু অভিনয় করা নয়, মঞ্চের নেপথ্যেও অনেক কাজ থাকে। সেগুলো কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। টিম ওয়ার্ক ব্যাপারটা বাচ্চু ভাইয়ের কাছ থেকে তখন থেকে বোঝার চেষ্টা করলাম। মঞ্চের ওপর যে মানুষটিকে লোকজন দেখছে। যে প্রপস তুলে দিচ্ছে সে-ও কম গুরুত্বপূর্ণ নয় নাটকের জন্য।
তখন নাটকের টিকেট বিক্রি হতো ব্যক্তিগত পরিচয়ের মাধ্যমে। দুই টাকা টিকেটের দাম ছিলো। মুনতাসীর ফ্যান্টাসির সঙ্গে আগের আরেকটি নাটক ছিল। দর্শকরা দেখলেন নতুন এক নাট্যকারকে। সেলিম আল দ্বীন। তারপরের ইতিহাস সবারই জানা। ঢাকা থিয়েটারের জয়জাত্রার ইতিহাস। গ্রাম থিয়েটারের সাফল্যের কথা। নতুন নতুন শক্তিমান অভিনয় শিল্পীর আত্মপ্রকাশ।
আজ চার যুগপূর্তিতে একটা কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, যে সময়গুলোতে বাংলাদেশে দল-বিভক্তি চলছে, নাটকের দল ভেঙেছে, বিভিন্ন সংগঠনের অস্তিত্ব বিনাশ হয়েছে, সেখানে ঢাকা থিয়েটার একমাত্র নাট্য সংগঠন,যার কোনা বিভক্তি হয়নি। অথচ ঢাকা থিয়েটারের যারা সদস্য তারা অনেকেই একটি করে আলাদা দল তৈরি করতে পারতেন। আজকে সারা পৃথিবীতে ঢাকা থিয়েটারের বহু সদস্য ছড়িয়ে আছে, তাদের কাছে ঢাকা থিয়েটার তখন স্মৃতি। কিন্তু তরুণ প্রজন্মের কাছে ঢাকা থিয়েটার এখনো একটি অনুসরণীয় নাম। আর এই নেতৃত্ব দেওয়ার সবটুকু কৃতিত্ব নাসিরউদ্দিন ইউসুফের। তাকেসহ ঢাকা থিয়েটারের সংশ্লিষ্ট সবাইকে ঢাকা থিয়েটারের একজন কর্মী হিসেবে অভিনন্দন।
লেখক : ঢাকা থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, কথা-সাহিত্যিক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব

