৪ আগস্ট দুপুর ১২টার দিকে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে একটি স্পিনিং মিলে একই তারিখের দিবাগত রাত সাড়ে ১২টায় রাজধানীর কাকরাইলের একটি গ্যারেজে এবং পরদিন সকাল সাড়ে ৮টার দিকে সাভারে একটি ইলেকট্রনিকস কোম্পানির ওয়ারহাউজে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনার ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ এখনো পত্রিকায় আসেনি। এইতো গত ৮ জুলাই বিকেলে রূপগঞ্জ এলাকায় হাশেম গ্রুপের জুস তৈরির এক কারখানায় ভয়াবহ আগুনে ৫২ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়। নিহতদের স্বজনদের দেওয়া তথ্যমতে, ঐ কারখানায় কাজ করা শ্রমিকদের একটি বড় অংশের বয়স ১৮ বছরের নিচে। ছয়তলাবিশিষ্ট ঐ কারখানার কলাপসিবল গেট তালাবদ্ধ থাকায় শ্রমিকেরা জান বাঁচাতে দৌড়াদৌড়ি করেছে, কিন্তু কেউ বের হতে পারেনি।

এই অগ্নিকাণ্ডে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণ হিসেবে সামনে আসছে- আগুন লাগার সময় কারখানায় জরুরি নির্গমন ও ছাদে ওঠার পথ বন্ধ করে রাখা। ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক অপারেশনস বলেন, ভবনটির আয়তন ৩৫ হাজার বর্গফুট, এই ভবনে অন্তত চার থেকে পাঁচটি সিঁড়ি থাকা দরকার ছিল, অথচ আছে মাত্র দুটি। আগুন লাগার পরপরই একটি সিঁড়ি ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে যায়, দ্বিতীয় সিঁড়ির কাছে তাপ ও ধোঁয়ার কারণে কেউ যেতে পারেনি।
২০১৯-এর ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টার এবং মার্চে বনানীর এফআর টাওয়ারের অগ্নিকাণ্ড দুঃস্বপ্ন হয়ে এখনো অনেককে তাড়িয়ে বেড়ায়। এফআর টাওয়ারে যে রোমহর্ষক দৃশ্যের অবতারণা ঘটেছিল, তেমনটি এর আগে খুব একটা দেখা যায়নি। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ১৫ বছরে অগ্নি দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ২ হাজার ৩১৭ এবং আহত হয়েছে ১২ হাজার ৩৭৪ জন। সময়ের পরিক্রমায় অগ্নিকাণ্ড তার ধরন ও এলাকা পরিবর্তন করেছে। আমাদের দেশে আগে গ্রামাঞ্চলে আগুন লাগত বেশি। কোনো এলাকায় আগুন লাগলে মহল্লার পর মহল্লা পুড়ে ছারখার হয়ে যেত। মফস্বলের সেই আগুন এখন শহর-বন্দর, শিল্প-বাণিজ্যিক এলাকার ওপর ভর করেছে।

কেন অগ্নিকাণ্ডের এসব ঘটনা ঘটে চলেছে? ঢাকাসহ অন্যান্য শহরে আগুন লাগার কারণ ও প্রতিকার বহুল আলোচিত। শহরাঞ্চলে বিভিন্ন স্থাপনা ও অবকাঠামো নির্মাণের সঙ্গে সংশ্লিটদের আরো সতর্ক দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে আগুনের দুর্ঘটনা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে। স্থাপনা নির্মাণের শর্ত ও নিয়মকানুন যথাযথভাবে প্রতিপালন না করায় শুধু ধারাবাহিক অগ্নিকাণ্ডই নয়, আরো অনেক ধরনের বিপদের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
বহুতল ভবনের নকশা অনুমোদনে রাজউক কর্তৃক ফায়ার সার্ভিসের ক্লিয়ারেন্সের প্রয়োজন হয়। ফায়ার সার্ভিসের আইন অনুযায়ী সাততলার ওপর যে কোনো ভবনই বহুতল। আর রাজউকের আইন অনুযায়ী ১০ তলা বা তদূর্ধ্ব ভবন বহুতল। ফলে রাজউক ১০ তলার নিচের ভবনের নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র চায় না। এ ধরনের পরিস্থিতিতে এ ভবনগুলো ‘অনুমোদিত অগ্নি নিরাপত্তা’ব্যবস্থা ছাড়াই গড়ে উঠছে।

আমাদের শহরগুলাতে আবাসিক, বাণিজ্যিক, দাপ্তরিক, শিক্ষা ও অন্যান্য বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠান মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। একটির গা ঘেঁষে আরেকটি স্থাপনা গড়ে উঠেছে। অনেক বিল্ডিংয়ের সিঁড়ি এবং কোনো কোনো কক্ষে সূর্যের আলোর দেখা পাওয়া যায় না। বড় বড় উঁচু অনেক বিল্ডিংয়ে একটি মাত্র সিঁড়ি রাখা হয়েছে। একটি সিঁড়ি দিয়ে কখনোই রিস্ক কভার করা যায় না। যদি সিঁড়ির দিকেই কোনো বিপদ ঘটে, তাহলে মানুষের বের হওয়ার বিকল্প পথই থাকে না। তাই পাশাপাশি অবস্থিত বহুতল ভবনের ছাদগুলো ব্রিজ দিয়ে সংযুক্ত করা হলে আটকে পড়া ব্যক্তিরা পার্শ্ববর্তী বিল্ডিং দিয়ে বের হয়ে আসতে পারবে।
কিছুদিন আগে ফায়ার সার্ভিসের জনৈক কর্মকর্তা বলেছিলেন, বাংলাদেশের বহুতল আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন, ফ্যাক্টরি—সব ক্ষেত্রেই আগুন মোকাবিলায় পূর্বপ্রস্তুতি ও ত্বরিত পদক্ষেপের ঘাটতি দেখা যায়। ব্যক্তিগত পর্যায়ে সচেতনতা ও প্রশিক্ষণের পাশাপাশি প্রতিটি সংস্থার নিজস্ব টিম থাকা দরকার, যাতে আগুন লাগলে অন্তত কিছুক্ষণ ফাইট করতে পারে। অনেক বিল্ডিংয়ে ফায়ার ইক্যুইপমেন্ট লাগানো হয়েছে, কিন্তু ঠিকভাবে মেইনটেনেন্স হচ্ছে না, আবার সবাই এর ব্যবহারবিধিও ঠিকভাবে জানে না। কোথাও কোথাও মেয়াদোত্তীর্ণ ফায়ার এক্সিটিংগুইশার রিফিল করাই হয় না, অনর্থক দেওয়ালে শোভা পায়। ইলেকট্রিক্যাল জিনিসপত্রের ব্যবহার যেভাবে বেড়েছে, সেভাবে সেফটি মেজারস নেওয়া হচ্ছে না। বিগত কয়েক বছরে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে অগ্নি দুর্ঘটনা ঘটছে সবচেয়ে বেশি, যা মোট অগ্নি দুর্ঘটনার প্রায় ৩৭ শতাংশ। তাছাড়া অফিস-আদালত, মার্কেট, পার্ক, রাস্তার মোড় ও বিভিন্ন পাবলিক প্লেসে পরিষ্কারের নামে ময়লা-আবর্জনা জড়ো করে পুড়িয়ে দেওয়া অনেকটা নৈমিত্তিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে।
মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগ তো একান্তভাবেই আমাদের কর্মের ফল। অতীতের দুর্যোগগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা না নেওয়া এবং নিজেদের সংশোধন না করায় অগ্নিকাণ্ড ও অন্যান্য দুর্যোগ নিয়মিত সংঘটিত হয়েই চলেছে। উন্নয়নশীল দেশের কাতারে শামিল হওয়ার শুভক্ষণে আমাদের আইন অমান্যতা, অসাবধানতা, অসচেতনতা, বেখেয়ালিপনার কারণে জানমাল ও রাষ্ট্রের সম্পদ আগুনে পুড়ে শেষ হয়ে যাবে, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
লেখক: সরকারি চাকরিজীবী
ইত্তেফাক/কেকে

