কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালংয়ে বন্দুকধারীদের গুলিতে রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ নিহতের ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসছেন পরিবারের সদস্য ও তার অনুসারীরা। মুহিবুল্লাহর ভাই হাবিব উল্লাহ ও মুহিবুল্লাহর তৈরি ‘আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস’ (এআরএসপিএইচ)পন্থীরা বলছেন, বিতর্কিত সংগঠন ‘আরসা’-এর নেতারাই এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত।
হাবিবুল্লাহ বলেন, ‘কুতুপালংয়ের লম্বাশিয়া ক্যাম্পের একটি মসজিদে বুধবার এশার নামাজ শেষ করে দু’ভাই একসঙ্গে বের হই। এরপর এআরএসপিএইচ-এর অফিসে সাধারণ রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলছিলেন মুহিবুল্লাহ। এ সময় ২০-২৫ জনের বন্দুকধারী দল সেখানে এসে তাকে গুলি করে। ওই অফিসে থাকা অন্যদের মারধর করে ছেড়ে দিলেও মুহিবুল্লাহকে গুলি হত্যা করে তারা।
মুহিবুল্লাহর ভাই আরও বলেন, ‘‘আমার ভাই রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবসনের পক্ষে সক্রিয় ছিলেন। তিনি রোহিঙ্গাদের সবসময় বলতেন আমাদের (রোহিঙ্গা) আমাদের দেশে (মিয়ানমারে) ফিরে যেতেই হবে। প্রত্যাবসনে তার দৃঢ়তার জন্য সাধারণ রোহিঙ্গারাও তাকে ভালোবাসতেন, বিশ্বাস করতেন। রোহিঙ্গাদের যেকোনো সমস্যা সমাধানের জন্য আমার ভাই এগিয়ে আসতেন। তাদের অধিকার আদায়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেছিলেন। বিতর্কিত ‘আরসা’ ও ‘আল-ইয়াকিন’র নেতারা সহ্য করতে পারতেন না। তারা বলতেন, এখানে রোহিঙ্গাদের বিষয়ে আমরাই সিদ্ধান্ত নেবো। সবকিছু করবো। তুকে কেন নেতা মানা হবে? এমন ঈর্ষা থেকেই মুহিবুল্লাহ হত্যায় নেতৃত্ব দিয়েছেন ক্যাম্পের ‘আরসা’ নেতারা। এরর মধ্যে কয়েকজন রয়েছেন কথিত 'আল ইয়াকিনের' সদস্য।’’
এদিকে, মুহিবুল্লাহ খুনের পর রোহিঙ্গাদের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছে। নিজেদের নিরাপত্তার কথা ভেবে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে মিডিয়ায় কথা বলতে রাজি হচ্ছেন না কোনো রোহিঙ্গা নেতা। তবে, নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন রোহিঙ্গা নেতা বলেন, মুহিবুল্লাহ রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের পক্ষে সক্রিয় ছিলেন। এই কারণে মিয়ানমার সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী মুহিবুল্লাহকে হত্যা করা হয়েছে।
সচেতন রোহিঙ্গাদের অভিযোগ, প্রত্যাবসনের বদলে বাংলাদেশে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের সন্ত্রাসী প্রমাণে মরিয়া হয়ে উঠেছে মিয়ানমার সরকার। এজন্য তারা বিপথগামী রোহিঙ্গাদের দিয়ে ক্যাম্পে দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে রোহিঙ্গা গণহত্যায় মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার করা মামলাটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করাই মিয়ানমারের মূল লক্ষ্য বলেও অভিযোগ করেন তারা।

মুহিবুল্লাহর জানাজায় উপস্থিত মুসল্লিরা
রোহিঙ্গা নেতা হামিদ উল্লাহ বলেন, ‘‘আমরা দেশে ফিরে যেতে চাই। তবে মিয়ানমার সরকার একদিকে আমাদের ফিরিয়ে নেওয়ার কথা বলছে, অন্যদিকে যেন ফিরিয়ে নিতে না হয়, সেজন্য প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছে।’ তার অভিযোগ, ‘ক্যাম্পে এখন যেসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চলছে, তার সবই হচ্ছে মিয়ানমারের ইশারায়। তারা বিপথগামী কিছু রোহিঙ্গাকে ব্যবহার করে ‘আল-ইয়াকিন’ ও ‘আরসা’র অনুসারীদের দিয়ে ক্যাম্পে নানা ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ড এরই অংশ।’’
রোহিঙ্গা নেতা দিল মোহাম্মদ বলেন, ‘আমাদের সম্পদকে হারিয়ে ফেলেছি। রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের জন্য অনেক বড় ক্ষতি হয়েছে। এ ঘটনার পর থেকে ক্যাম্পে আতঙ্ক কাজ করছে।’
রোহিঙ্গাদের আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা ১৪ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক এসপি নাইমুল হক বলেন, ‘ঘটনার পর থেকে ক্যাম্পে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পরিস্থিতি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।’
উখিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আহাম্মদ সঞ্জুর মোরশেদ বলেন, ‘ময়নাতদন্ত শেষে নিহত মুহিবুল্লাহ’র মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এখনো মামলা হয়নি। কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। বৃহস্পতিবার বিকাল ৫টায় জানাজা শেষে লম্বাশিয়া কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়েছে।’
কক্সবাজারে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবসন কমিশনার শাহ রেজওয়ান হায়াত বলেন, ‘মুহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে যেসব অভিযোগ বা কথাবার্তা আমরা শুনতে পাচ্ছি, সেসব বিষয় মাথায় রেখে তদন্তের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করা হবে। বিষয়টিকে কেন্দ্র করে যেন বিশৃঙ্খলা না হয়, এ জন্য সর্বস্তরে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বৃহস্পতিবার ক্যাম্পগুলোতে এনজিওদের নিয়মিত কার্যক্রম বন্ধ ছিল। জরুরি কাজে যারা ক্যাম্পে গেছেন, তারাও অন্যদিনের চেয়ে আগে ক্যাম্প ত্যাগ করেছেন।’
চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘মুহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের ধরতে অভিযান চলছে। আর কী কারণে তাকে হত্যা করা হয়েছে, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুলিশের পাশাপাশি অন্যান্য বাহিনীও এ বিষয়ে তৎপরতা চালাচ্ছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’
উল্লেখ্য, বুধবার (২৯ সেপ্টেম্বর) রাত পৌনে নয়টার দিকে লম্বাশিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প ইস্ট-ওয়েস্ট ১ নম্বর ব্লকে বন্দুকধারীতে গুলিতে নিহত মুহিবুল্লাহ।
ইত্তেফাক/এনই
