টোপ দিতো ঋণের, কেড়ে নিতো সর্বস্ব

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২১, ১৭:৩২

অ্যাপসভিত্তিক ডিজিটাল মাইক্রোফিইন্যান্সের নামে ‘অবৈধ সুদ ব্যবসায়ী একটি চক্রের ৫ সন্ধান পেয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)-এর গোয়েন্দা সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ। চক্রটি অ্যাপসের মাধ্যমে জামাতবিহীন ঋণ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে গ্রাহকের মোবাইল থাকা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হাতিয়ে নিতো। বৃহস্পতিবার (৭ অক্টোবর) দুপুরে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানিয়েছেন ডিবি প্রধান, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার।

ডিবি প্রধান জানান, গত ৫ ও ৬ অক্টোবর অব্যাহত অভিযানে রাজধানীর  ধানমন্ডি, বনানী ও মিরপুর এলাকা থেকে ইমানুয়্যাল অ্যাডওয়ার্ড গোমেজ, আরিফুজ্জামান,  শাহিনূর আলম ওরফে রাজীব,  শুভ গোমেজ ও মো. আকরামসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা ওয়েব বেজড ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিম। এ সময় তাদের কাছ থেকে ১টি অ্যাশ কালারের এলিয়ন গাড়ি, ৯টি মোবাইলফোন,  ৯টি সিম কার্ড,  ৪টি ল্যাপটপ ও ৪টি বিভিন্ন ব্যাংকের চেক বই জব্দ করা হয়েছে।

অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার বলেন, চক্রটি সরকারি অনুমোদন ছাড়া  থান্ডার লাইট টেকনোলজি লিমিটেড, নিউ ভিশন ফিনটেক লিমিটেড ও বেসিক ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির নামে আর্থিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতো। তারা আইনগত অনুমোদন  না নিয়েই গ্রাহকের তথ্য সংগ্রহ করছিল। গ্রাহকরা চক্রটির  অ্যাপস ইনস্টল করে নিতো। এরপর তারা গ্রাহকের অজান্তে ক্যালেন্ডারের ইভেন্ট পড়া, মোবাইল ক্যামেরা ব্যবহার করে ছবি ও ভিডিও ধারণ করতো। পাশাপাশি মোবাইলের কন্টাক্টস পড়াসহ মোবাইলের এক্সাক্ট লাইভ লোকেশন নির্ণয়, ফোনের স্ট্যাটাস ও তথ্য সংগ্রহ,  ফোনে সংরক্ষিত মেসেজ পড়া, পরিবর্তন করার অনুমতি নিয়ে নিতো তারা। এতে গ্রাহকের পারসোনাল ডাটা সিকিউরিটির চরম হুমকিতে পড়ে।

ডিবি প্রধান আরও বলেন, চক্রটি অনলাইন অ্যাপস যেমন; Tkala–Personal Loans Online (Tkala. Thala-0430 ), Cashman (Cashman-0514, Cashman-0326), RapidCash- Quick Online eLoans App, AmarCash-Personal Loans Online, Cashkash-Fast Loans Online, ও CashCash-এর মাধ্যমে জামানতবিহীন লোন দেওয়ার নামে মাত্রাতিরিক্ত সুদের কারবার পরিচালনা করতো। এবস অ্যাপস সার্ভার চীনে অবস্থিত।  এগুলো মূলত চীন থেকে পরিচালিত হয়। চীনে কয়েকজন  নাগরিক বাংলাদেশি নাগরিকের সহায়তায় এই অ্যাপসগুলোর মাধ্যমে জামানতবিহীন স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়ার নামে চটকদার বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে গ্রাহক আকৃষ্ট করে। তাদের বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হয়ে গ্রাহকরা ঋণ নেওয়ার পর স্বল্প সুদের পরিবর্তে উচ্চহারে সুদ দিতে বাধ্য হতেন। প্রতারণার শিকার এক ভুক্তভোগীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ধানমন্ডি থানায়  ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে একটি মামলা রুজু হয়। এ মামলা তদন্ত শুরু করে গোয়েন্দা সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ।

No description available.

গ্রেফতারের পর প্রতারকচক্রের সদস্যরা

পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও জানান, প্রতারকরা অ্যাপসগুলো ফেসবুক, ইউটিউবসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দিয়ে স্বল্প সুদে জামানতবিহীন ঋণের বিজ্ঞাপন দিতো। তারা মূলত অর্থ সংকটে থাকা স্বল্প আয়ের লোক ও বেকার ছাত্র-ছাত্রীদের টার্গেট করতো। টার্গেট করা গ্রাহকরা বিজ্ঞাপনে প্রদর্শিত লিংকে ক্লিক করে কিংবা গুগল স্টোর থেকে অ্যাপসগুলো ডাউনলোড করে, অ্যাপসের অনুমতি চাওয়া বিষয়ে পারমিশন দিতেন। এরফলে অ্যাপসটি গ্রাহকের মোবাইলে ইন্সটল হয়ে যেতো। তখন গ্রাহকের জাতীয় পরিচয়পত্র, ফোন নম্বর, পরিবারের অন্যান্য সদস্যের ফোন নম্বর ও তাদের ব্যক্তিগত তথ্যসহ অন্যান্য তথ্য দিয়ে অ্যাকাউন্ট খোলা হতো। চাহিদা অনুযায়ী আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মাত্রাতিরিক্ত প্রসেসিং ফি নিয়ে উচ্চহারে সুদ নির্ধারণ করে স্বল্প সময়ের জন্য ৩ থেকে ৭ দিনের জন্য ঋণ দিতো তারা। 

ডিবি প্রধান আরও জানান, গ্রাহক ৩০০০ টাকার জন্য আবেদন করলে অনুমোদনের পর প্রসেসিং ফি বাবদ ৮১০ টাকা রেখে গ্রাহককে মাত্র ২১৯০ টাকা দেওয়া হয়। ৭ দিন শেষে গ্রাহককে পরিশোধ করতে হয় মোট ৩,০১৮ টাকা। মেয়াদ শেষে অনাদায়ে প্রতিদিন হিসাবে গ্রাহককে উচ্চহারে সুদ দিতে হয়।  এ ছাড়া অ্যাপ্লিকেশন ফি বাবদ ১২০ টাকা, ডাটা অ্যানালাইসিস ফি ১৮০ টাকা, মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট ১৫ টাকা এবং সুদ বাবদ ৫ টাকা কেটে রাখার যুক্তি দেখায়। তবে, পরিমাণ যত বেশি হবে, টাকা কেটে রাখার প্রবণতাও বেশি। এ ঋণের টাকা গ্রাহককে বিকাশ অথবা নগদ অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হয়। অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তির সরাসরি সম্পৃক্ততা নেই। প্রতারকদের এ লোভনীয় অফারের ফাঁদে পড়ে অনেকে সর্বস্ব হারান।

সাধারণ গ্রাহকের উদ্দেশে ডিবি প্রধান বলেন, যেকোনো অ্যাপস ইন্সটল করার পর অথবা কোন লিংকে প্রবেশ করার পর ব্যক্তিগত কোনো তথ্য দেওয়ার আগে নিরাপত্তার বিষয়টি ভালোভাবে নিশ্চিত হতে হবে। ব্যক্তিগত তথ্য যেখানে-সেখানে শেয়ার না করার অনুরোধও জানান পুলিশের এ গোয়েন্দা কর্মকর্তা। 

এর আগে গোয়েন্দা সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ শরীফুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার ফজলুর রহমানের সার্বিক তদারকিতে ওয়েব বেজড ক্রাইম ইনভেস্টিগেশ টিমের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার আশরাফ উল্লাহর নেতৃত্বে একটি দল  প্রতারক চক্রটিকে গ্রেফতার করে।  

ইত্তেফাক /কেএইচ/এনই