জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উন্নয়ন দর্শন ছিল অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক মুক্তি-মধ্যস্থতাকারী উন্নয়ন দর্শন, যা বিনির্মাণে নিয়ামকের ভূমিকায় থাকবে সর্বস্তরের জনগণ। বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক মুক্তির স্বপ্নপূরণ এবং ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত একটি সমৃদ্ধ জাতি গঠনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০৮ সালে জাতিকে উপহার দেন ভিশন-২০২১ বা রূপকল্প-২০২১। রূপকল্প-২০২১-এর প্রধান লক্ষ্য হলো নির্ধারিত সময়ে বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করা, যেখানে চরম দারিদ্র্য সম্পূর্ণভাবে বিমোচিত হবে এবং জনগণের জীবনমান উন্নয়নসহ প্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল বাংলাদেশ হবে। রূপকল্প-২০২১ বাস্তবায়নের জন্য প্রথমবারের মতো প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০১০—২০২১ প্রণয়ন করে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন অগ্রাধিকার চিহ্নিত করা হয়। রূপকল্প-২০২১-এর সফল বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গ্রহণ করেন রূপকল্প-২০৪১, যার মূল লক্ষ্য হচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা বাস্তবায়ন করা।
বর্তমান বাংলাদেশকে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে গ্রহণ করা হয়েছে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা, যা রূপকল্প-২০৪১ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। রূপকল্প ২০৪১ হচ্ছে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রদত্ত এবং জাতীয় অর্থনৈতিক কাউন্সিল কর্তৃক প্রণীত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থানকে আরো দৃঢ় করে গড়ে তোলার জাতীয় কৌশলগত পরিকল্পনা। রূপকল্প-২০৪১ চারটি প্রাতিষ্ঠানিক স্তম্ভ যথা—সুশাসন, গণতন্ত্র, বিকেন্দ্রীকরণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই পরিকল্পনার সুফলভোগী হবে জনগণ এবং তারাই হবে প্রবৃদ্ধি ও রূপান্তর প্রক্রিয়ার প্রধান চালিকাশক্তি। সরকারের চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উন্নত, সমৃদ্ধশালী এবং দারিদ্র্যশূন্য দেশে রূপান্তরিত করা। আর এ লক্ষ্য অর্জনের প্রেক্ষিত পরিকল্পনায় চারটি বিষয়ের ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এগুলো হচ্ছে- ১. জিডিপিসহ মাথাপিছু জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা; ২. উচ্চতর আয়ের সুফল সবর্জনীন করা; ৩. টেকসই ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন নিশ্চিত করা এবং ৪. সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখা।
রূপকল্প-২০৪১-এর প্রধান অভীষ্ট হলো ২০৩১ সালের মধ্যে চরম দারিদ্র্যের অবসান, উচ্চ-মধ্য আয়ের দেশের মর্যাদায় উত্তরণ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে দারিদ্র্যের দ্রুত অবলুপ্তিসহ উচ্চ আয়ের দেশের মর্যাদায় আসীন হওয়া। বিশ্বের বিভিন্ন উচ্চ-মধ্যম ও উচ্চ আয়ের দেশ যে উন্নয়ন পথ পাড়ি দিয়েছে, তাদের ইতিবাচক অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে সেই পথে এগিয়ে যেতে চায় বাংলাদেশ। ড. শামসুল আলমের মতে, বাংলাদেশের প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১—২০৪১ হলো বিশ্বব্যাংকের মানদণ্ড অনুযায়ী বাংলাদেশকে ২০৩১ সালের মধ্যে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত করার জন্য সরকারের স্থির লক্ষ্য অভীষ্ট। এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে আগামী দুই দশকে মোট দেশজ উত্পাদন (জিডিপি)-এর গড় প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৯ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ হারে। প্রবৃদ্ধির এই পথ ধরে ২০৩১ সালের বাংলাদেশ হবে একটি উচ্চ-মধ্য আয়ের দেশ, যেখানে মাথাপিছু জাতীয় আয় হবে ৩ হাজার ২৭১ ডলার। ২০৪১ সালে বাংলাদেশে সম্ভাব্য জনসংখ্যা হবে ২১ কোটি ৩ লাখ, যাদের মাথাপিছু আয় হবে ন্যূনতম ১২ হাজার ৫০০ ডলার।
‘একটি উচ্চ আয়ের দেশের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি ও সুশাসন নিশ্চিতকরণ’ শীর্ষক দ্বিতীয় অধ্যায়ে আছে দেশের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি ও সুশাসন নিশ্চিতকরণের অঙ্গীকার। রূপকল্প-২০৪১ দাঁড়িয়ে আছে এই চারটি মৌলিক ভিত্তির ওপর যথা :সুশাসন, গণতন্ত্রায়ণ, বিকেন্দ্রীকরণ ও সক্ষমতা বিনির্মাণ। এ জন্য রূপকল্প-২০৪১-এর সফল বাস্তবায়নে শক্তিশালী আর্থিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে। আইনের শাসন ও বৈষম্যহীন উন্নয়ন বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়ের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। ‘একটি উচ্চ আয়ের অর্থনীতির দিকে ত্বরান্বিত অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির জন্য সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামো’ শীর্ষক তৃতীয় অধ্যায়ে আগামী দুই দশক ধরে ‘সামষ্টিক অর্থনীতিসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন নিয়ামক’ যেমন—প্রকৃত খাত (জিডিপি, মুদ্রাস্ফীতি, বিনিয়োগ, জনসংখ্যা ইত্যাদি), আর্থিক খাত (রাজস্ব আদায়, উন্নয়ন ব্যয়), ঋণসংশ্লিষ্ট (অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণ প্রবাহ), বহিঃস্থ অর্থনীতি (রেমিটেন্স প্রবাহ, আমদানি/রপ্তানি, বিনিময় হার, কারেন্ট একাউন্ট ব্যালেন্স), মুদ্রাসংশ্লিষ্ট (ব্রড মানি, নিট সম্পদ)—এসবের বছরভিত্তিক সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে।
আগামী ২০৪১ সাল নাগাদ ‘একটি দারিদ্র্যশূন্য দেশ’ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে ভিশন-২০৪১-এর চতুর্থ অধ্যায়ে। ‘কাউকে পেছনে ফেলে নয়’, এসডিজির এই মূলনীতি গ্রহণ করা হয়েছে অনুপ্রেরণা হিসেবে। সমাজের আয়বৈষম্য (গিনি সহগ) কমিয়ে আনার লক্ষ্যে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য ঋণবাজারের উন্নয়ন, সম্পদের সুষম বণ্টন, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী বৃদ্ধিকরণই হবে আগামী দিনের সরকারযন্ত্রের উল্লেখযোগ্য করণীয়। ‘মানসম্মত শিক্ষার মাধ্যমে মানব উন্নয়ন এবং জনমিতিক লভ্যাংশ আহরণ’ শীর্ষক পঞ্চম অধ্যায়ে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনৈতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। সর্বজনীন স্বাস্থ্য পরিচর্যা, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার—এসবের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বৃদ্ধিকরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয়ের পরিমাণ ২০২১ সালে জিডিপির ৪ দশমিক শূন্য ও ২ দশমিক শূন্য শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
‘একটি উচ্চ আয়ের দেশে গ্রামীণ উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য টেকসই কৃষি’ শীর্ষক ষষ্ঠ অধ্যায়ে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং রপ্তানিমুখী কৃষিব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। টেকসই কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তার লক্ষ্য কৃষি প্রক্রিয়াকরণের পর্যাপ্ত বিনিয়োগ, বাজার অবকাঠামো উন্নতকরণ, শস্য-জোনিং, নিখুঁত কৃষিচর্চা, পরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার ইত্যাদির প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া আমার গ্রাম আমার শহর : বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে নাগরিক সুবিধাবলি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
‘একটি ভবিষ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থায় শিল্পায়ন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও কর্মসংস্থান’ শীর্ষক সপ্তম অধ্যায়ে অঙ্গীকার করা হয়েছে অবকাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণ, শ্রমশক্তির দক্ষতামান উন্নয়ন, উত্পাদনের সকল পর্যায়ে উদ্ভাবন বিস্তারে গবেষণা, ব্যবসায় পরিবেশের উন্নতীকরণ, পিপিপির মাধ্যমে অর্থের জোগান, জলবায়ুসহিষ্ণুতা নিশ্চিতকরণের। কেননা, উন্নত দেশগুলোর জিডিপিতে সেবা খাতের অবদান ৭০-৮০ শতাংশ, সেখানে ২০১৯ সমাপ্ত অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপিতে সেবা খাতের অবদান ছিল মাত্র ৫১ দশমিক ৮২ শতাংশ। উন্নতির পথে আমাদের অর্থনীতির রূপান্তর হবে কৃষি থেকে শিল্প খাতে, যার জন্য দরকার হবে আন্তঃসম্পর্কিত বাণিজ্য ও শিল্পনীতির সমন্বিত প্রয়োগ। আবার ‘একটি উচ্চ আয়ের দেশের জন্য টেকসই বিদ্যুত্ ও জ্বালানি’ শীর্ষক অষ্টম অধ্যায়ে বর্ণীত কৌশল মোতাবেক সে বছর ৫৬ হাজার ৭৩৪ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদনে সক্ষম হবে বাংলাদেশ এবং ২০৪১ সালে বাংলাদেশে বিদ্যুতের চাহিদা হবে ৫১ হাজার মেগাওয়াট। ২০৪১ সালে বিদ্যুত্ খাতে যুক্ত হবে পারমাণবিক প্রযুক্তি এবং জ্বালানির বিন্যাস হবে ৩৫ শতাংশ গ্যাস, ৩৫ শতাংশ কয়লা, ১২ শতাংশ পারমাণবিক, ১ শতাংশ তরল তেল এবং ১ শতাংশ জলীয়। বাকি ১৬ শতাংশ করতে হবে আমদানি।
‘আইসিটি ও বৈজ্ঞানিক গবেষণা লালনের মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্য একটি উদ্ভাবনমুখী অর্থনীতি সৃজন’-এর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে নবম অধ্যায়ে। বর্তমানের ‘নাগরিকের আইসিটি অভিগম্যতা’র স্কোর ৩৫ দশমিক ৭ থেকে বাড়িয়ে ২০৪১ সাল নাগাদ ৮৫-তে উন্নীত করার মাধ্যমে বিশ্বে ২০তম স্থান অর্জনের। ‘অব্যাহত দ্রুত প্রবৃদ্ধির জন্য পরিবহন ও যোগাযোগ অবকাঠামো বিনির্মাণ’ শীর্ষক দশম অধ্যায়ে প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতিকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আগামী দিনে রপ্তানি ভান্ডারে বৈচিত্র্য আনার জন্য দরকার হবে ভারী যন্ত্রপাতি ও প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানির। দরকার হবে উত্পাদিত পণ্যের দ্রুত ও সময়মতো অন্তপ্রবাহ এবং বহিঃবাংলাদেশ যোগাযোগ। ‘একটি উচ্চ-আয় অর্থনীতিতে নগর পরিবর্তনশীলতার ব্যবস্থা’ শীর্ষক একাদশ অধ্যায়ে সরকার ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ নীতির অধীনে গ্রামাঞ্চলে শহরের সব সুবিধা প্রসারিত নগরায়ণ ও উন্নয়ন বিষয়ে নজর দিয়েছে। আগামী ২০৪১ সালে বাংলাদেশেও মোট জনসংখ্যার ৮০ শতাংশ শহরে বাস করবে। সে জন্য গৃহীত প্রস্তুতি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। ঢাকাকেন্দ্রিক নগরায়ণের পরিবর্তে অনেকগুলো নগরকেন্দ্রের সুষম উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। ‘একটি গতিশীল প্রাণবন্ত বদ্বীপে টেকসই পরিবেশ উন্নয়ন নিশ্চিতকরণ ও জলবায়ুসহিষ্ণু জাতি বিনির্মাণ এবং সুনীল অর্থনীতির সম্ভাবনা উন্মোচন’ শীর্ষক দ্বাদশ অধ্যায়ে জলবায়ু অভিযোজন প্রচেষ্টা বিধৃত হয়েছে। প্রণীত ‘বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০’-এর আওতায় সুনীল অর্থনৈতিক সম্পদ (মত্স্য, সি-উইড, খনিজ সম্পদ) আহরণ করতে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে বর্তমান পরিকল্পনায়।
রূপকল্প-২০৪১ বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জস্বরূপ। করোনা-পরবর্তী সময়ে এ ব্যাপারে আমাদের আরো মনোযোগ দিতে হবে। সংশ্লিষ্ট সবাইকে কাজ করতে হবে একযোগে।
n লেখক : উপসচিব ও কনসালটেন্ট,
এটুআই প্রোগ্রাম, ঢাকা

