বৃহস্পতিবার, ১১ আগস্ট ২০২২, ২৭ শ্রাবণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও ঐতিহ্য

আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২১, ০৯:৫০

২০ অক্টোবর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় দিবস। করোনা সংকটের পর বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা ও গবেষণা পুরোদমে শুরু হয়েছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্লাস নেবার প্রস্তুতি চলছে। এ পরিস্থিতিতে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৫ বছর অতিক্রম করে ষোড়শ বর্ষে পদার্পণ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কেবল ২০১৩ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত এই নতুন প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত হয়েছে ১৮টি গবেষণা গ্রন্থ। ২০১৪ সাল থেকে এমফিল এবং পিএইচডি গবেষকের সংখ্যা প্রতি শিক্ষাবর্ষে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সামগ্রিকভাবে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি এক গৌরবময় ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী। সুদীর্ঘ প্রায় ১৫০ বছরের পথপরিক্রমায় এই প্রতিষ্ঠানটি এমন অনেক গৌরব ও গর্বের দাবিদার, যার তাত্পর্য ঐতিহাসিক। বাঙালি ও বাংলার ইতিহাসের সঙ্গে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস একই সুতোয় গাঁথা। বুড়িগঙ্গার তীরে গড়ে ওঠা শতাব্দী-প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়ে বর্তমানে আলোকদ্যুতি ছড়াচ্ছে।

সাত একর জমিতে অবস্থিত সরকারি জগন্নাথ কলেজকে ২০০৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করা হয় এবং ঐ একই বছরের ২০ অক্টোবর এক সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যাত্রা শুরু করে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয় ২০১১ সালে। কারণ প্রতিষ্ঠার পাঁচ বছর পর নিজেদের ব্যয় নিজেরা বহন করার ধারণাটি ছিল সম্পূর্ণত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মতো। এদিক থেকে ত্রুটিপূর্ণ ছিল এটির অ্যাক্ট। ২০১১ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপে এটি প্রকৃত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা অর্জন করে।

জুনে সশরীরে পরীক্ষা নেবে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

ইতিহাসের বিভিন্ন গ্রন্থসূত্র মতে, বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষণার আগে জগন্নাথের আদি ইতিহাস শুরু হয়েছিল একটি সাদামাটা ব্রাহ্ম স্কুলের মধ্যে। কলকাতায় রাজা রামমোহন রায়ের উদ্যোগে ১৮২৮ সালের ২০ আগস্ট ব্রাহ্মধর্ম প্রতিষ্ঠা পায়। এর প্রভাবে পূর্ব বাংলার কতিপয় উত্সাহী যুবক ১৮৪৬ সালের ৬ ডিসেম্বর ঢাকাতে ব্রাহ্মধর্মের প্রতিষ্ঠা করেন। সেই সময় ব্রাহ্ম সন্তানদের শিক্ষালাভ এবং ধর্মচর্চার উন্নতির জন্য একটি ব্রাহ্মস্কুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং তার ইচ্ছানুযায়ী আরমানিটোলাস্থ বাড়ির নিচের তলায় ১৮৬৩ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ব্রাহ্মস্কুল প্রতিষ্ঠিত হয় (বর্তমানে সেখানে আহমেদ বাওয়ানি স্কুল ও কলেজ রয়েছে)। শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে ব্রাহ্মসমাজের অগ্রণী ভূমিকা ছিল। ব্রাহ্মস্কুল বেশ কয়েক বছর সফলভাবে চলার পর একসময় আর্থিক কারণসহ নানা জটিলতায় বিদ্যালয় পরিচালনায় সমস্যা দেখা দেয়। ব্রাহ্মস্কুল কর্তৃপক্ষ সংকট উত্তরণের ব্যাপক চেষ্টার পরও কোনো সমাধান না পেয়ে তাদের বিদ্যালয়টির পরিচালনার ভার ১৮৬৮ সালে মানিকগঞ্জের বালিয়াটির জমিদার কিশোরীলাল রায় চৌধুরীকে অর্পণ করেন। কিশোরীলাল রায় চৌধুরী বিদ্যালয়টিকে আর্মানিটোলা থেকে বর্তমানে যেখানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় অবস্থিত সেখানে স্থানান্তর করেন। সেই সঙ্গে তিনি তার পিতা জগন্নাথ রায় চৌধুরীর নামে বিদ্যালয়টির নতুন নামকরণ করেন ‘জগন্নাথ স্কুল’। প্রসঙ্গত জগন্নাথ স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয় তখন তার দুদিকে দুটি স্কুল আগে থেকেই শিক্ষাদান করে আসছিল। একটি ‘কলেজিয়েট স্কুল’ এবং অন্যটি ‘পোগোজ স্কুল’। আজকের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বীজ এভাবেই উপ্ত হয়। জগন্নাথ কলেজের খ্যাতি ও প্রসারে অনুপ্রাণিত হয়ে কিশোরীলাল রায় চৌধুরী স্কুলকে কলেজে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তাকে এ ব্যাপারে সাহায্য করেছিলেন অনাথ মল্লিক ছাড়াও আইনজীবী ত্রৈলোক্যনাথ বসু ও বিচারপতি সারদা চরণ মৈত্র। বিদ্যালয়ের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়েই ১৮৮৪ সালে কিশোরীলাল রায় চৌধুরীর উদ্যোগেই একে উচ্চমাধ্যমিক কলেজে (তখন বলা হতো ‘সেকেন্ড গ্রেড’ কলেজ) উন্নীত করা হয়। এ সময় কলেজে আইনের ক্লাস নেওয়ারও ব্যবস্থা হয়। পাশাপাশি বিদ্যালয়ের কাজও চলতে থাকে। জগন্নাথ স্কুল এবং কলেজ একই প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের অধীনে পাঁচ বছর চলার পর ১৮৮৭ সালে সরকারি নির্দেশে স্কুলটির ব্যবস্থাপনা আলাদা করে ভিন্ন স্থানে প্রতিষ্ঠিত হয় কিশোরীলাল জুবিলি স্কুল (বর্তমানে যা ‘কে. এল. জুবিলি স্কুল’ নামে সুপরিচিত)। কলেজ অংশটি জগন্নাথ কলেজ নামেই পূর্বস্থানে থেকে যায়। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে গোড়ায় জগন্নাথ কলেজ ও ঢাকা কলেজ থেকে শিক্ষার্থী নিয়েই এর যাত্রা শুরু হয়। বস্তুত এই দুটি কলেজের ডিগ্রি ক্লাসের সমস্ত ছাত্র নিয়েই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে। এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংকটের কথা চিন্তা করে জগন্নাথ কলেজে স্নাতক পর্যায়ের পাঠদান বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং একে আবার উচ্চ মাধ্যমিক কলেজে রূপান্তরিত করা হয়। আর তা করতে গিয়ে ভারতীয় আইন পরিষদে ‘জগন্নাথ কলেজ অ্যাক্ট’ (১৯২০) নামে একটি আইন পাশ করা হয়। ভারতবর্ষে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামে আইন পাশের ঘটনা সেটাই প্রথম। দেশবিভাগের পর আবার জগন্নাথ কলেজে স্নাতক শ্রেণির পাঠদান শুরু হয়। ১৯৬৮ সালের ১ আগস্ট এক সরকারি আদেশে জগন্নাথ কলেজকে ‘প্রাদেশিকীকরণে’র নামে সরকারি কলেজে রূপান্তর করা হয়। সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমানের প্রচেষ্টায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেরানীগঞ্জে নতুন ক্যাম্পাসে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়, যা কার্যকর হতে যাচ্ছে।

চলতি অর্থ বছরের বাজেট পাশ করেছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় 

১৭ অক্টোবর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার ইতিহাসে ২০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়ার মধ্য দিয়ে এদেশে শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। এক্ষেত্রে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন উপাচার্যের অবদান রয়েছে। যোগদানের পর তিনি গবেষণাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করেছেন। অনুমোদন এবং অনুস্বাক্ষর করেছেন জগন্নাথ ও অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাকর্মের যৌথ প্রকল্পে। জয় হোক জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের।

লেখক: অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

মাউশির সিন্ডিকেটে কাবু শিক্ষকরা

সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে হবে গুচ্ছ কৃষি ভর্তি পরীক্ষা

ঢামেকের ইন্টার্ন চিকিৎসককে ঢাবি শিক্ষার্থীদের মারধরের অভিযোগ

সমালোচনার মুখে ভাতার অতিরিক্ত টাকা ফেরত দিলেন বেরোবি রেজিস্ট্রার

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

করোনায় শিক্ষার্থীদের মানে অবনতি হয়েছে

পাবিপ্রবির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস

দাখিল পরীক্ষার রুটিন প্রকাশ

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২০ সালের স্নাতক ৩য় বর্ষ পরীক্ষার ফল প্রকাশ