সড়ক নিরাপত্তা আইন ও নির্দেশনা বাস্তবায়ন

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২১, ১২:৫১

এ বছর পঞ্চমবারের মতো সরকারি উদ্যোগে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস পালন করা হচ্ছে। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘গতিসীমা মেনে চলি, সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করি’। উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ৫ জুন মন্ত্রিসভার বৈঠকে ২২ অক্টোবরকে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও অনুমোদন করা হয়। ফলে ২০১৭ সাল থেকে ২২ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস হিসেবে সরকারি উদ্যোগে জাতীয়ভাবে পালন করা হচ্ছে।

মহাসড়কে যত দুর্ঘটনা ঘটে, তার ৮০ শতাংশ ঘটে অতিরিক্ত গতির কারণে। মহাসড়কে একই মানের গাড়ি, কাজেই একটি গাড়ির আরেকটি ওভারটেক করার প্রয়োজন নেই বললেই চলে। অথচ আমরা দেখতে পাই, পেছনের গাড়ি সামনের গাড়িটিকে ওভারটেক না করা পর্যন্ত যেন স্বস্তি পায় না। আমাদের দেশের চালকদের এটা একটা ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। এ ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধ করা প্রয়োজন।

সড়ক দুর্ঘটনা কমানোর লক্ষ্যে সরকার সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ প্রণয়ন ও গেজেট আকারে প্রকাশ করছে। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে এই আইন ১ নভেম্বর ২০১৯ তারিখ থেকে কার্যকর হয়েছে। কিন্তু আইনটি পুরোপুরি এখনো কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। আইনটি সম্পর্কে গণসচেতনতা বাড়ানোর জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে আমরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ আশা করছি।

নতুন আইনের কতিপয় বিধিবিধান :১. নতুন আইনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হচ্ছে দুর্ঘটনায় প্রাণহানির দায়ে শাস্তির বিধান। এই অপরাধে দায়ী চালকের সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সাজা বা সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্ঘটনা ঘটিয়ে মানুষের মৃত্যু হয়েছে তদন্তে প্রমাণিত হলে ফৌজদারি আইনের ৩০২ ধারায় মামলা স্থানান্তর হবে। অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ডের সুযোগ থাকছে। ২. যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে নিবন্ধন সনদ না নিয়ে রাস্তায় যানবাহন নামালে এর মালিককে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা ছয় মাসের কারাদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড ভোগ করতে হবে। ৩. সরকারের কার্যকর করা এই নতুন আইনে গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করা যাবে না। মোবাইল ফোন ব্যবহার করলে এক মাসের কারাদণ্ড ও ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে। ৪. নতুন এ আইনে লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালালে ছয় মাসের জেল অথবা ২৫ হাজার টাকা জরিমানা। অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। তা ছাড়া ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে হলে অষ্টম শ্রেণি পাস করতে হবে। ৫. ভাড়ার তালিকা না থাকলে ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা এক মাসের কারাদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। একই সঙ্গে এটি চালকের ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে তার ১ পয়েন্ট কাটা যাবে। ৬. ঢাকা ও চট্টগ্রামে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ট্যাক্সিক্যাবে ভাড়ার মিটার বাধ্যতামূলক করেছে সরকার। ৭. যানবাহনচালককে যেমন সংকেত মেনে চলতে হবে, তেমনি পথচারীকে সড়ক-মহাসড়কে জেব্রা ক্রসিং, পদচারী সেতু, পাতালপথসহ নির্ধারিত স্থান দিয়ে পার হতে হবে। এর ব্যতিক্রম হলে চালক ও পথচারীকে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে পড়তে হবে। ৮. যত্রতত্র হাইড্রোলিক হর্ন বাজানোর অপরাধে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা জরিমানার বিধান ছিল। নতুন আইনে এ অপরাধে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা তিন মাসের কারাদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের মুখোমুখি হতে হবে। ৯. কালো ধোঁয়া নির্গমনকারী যানবাহন চালালে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা জরিমানা বা তিন মাসের কারাদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। সরকারনির্ধারিত স্থানের বাইরে গাড়ি পার্কিং করলে বা যাত্রী মালামাল ওঠানামার দায়ে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা জরিমানা করার সুযোগ আছে। এই আইনের কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট সব মহলের সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা প্রয়োজন।

উল্লেখ্য, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ২৫ জুন ২০১৮ তারিখে ছয়টি নির্দেশনা এবং পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে আরও ১৭টি নির্দেশনা প্রদান করা হয়। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, অদ্যাবধি এসব নির্দেশনার কার্যকর বাস্তবায়ন পরিলক্ষিত হয়নি। এই নির্দেশনাগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনা সম্ভব। প্রধানমন্ত্রীর ছয়টি নির্দেশনা হলো—গাড়ির চালক ও তার সহকারীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, লংড্রাইভের সময় বিকল্প চালক রাখা, যাতে পাঁচ ঘণ্টার বেশি কোনো চালককে একটানা দূরপাল্লায় গাড়ি চালাতে না হয়। নির্দিষ্ট দূরত্ব পর পর সড়কের পাশে সার্ভিস সেন্টার বা বিশ্রামাগার তৈরি করা। অনিয়মতান্ত্রিকভাবে রাস্তা পারাপার বন্ধ করা। সড়কে যাতে সবাই সিগন্যাল মেনে চলে, তা নিশ্চিত করা। পথচারী পারাপারে জেব্রা ক্রসিং ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং চালক ও যাত্রীদের সিটবেল্ট বাঁধার বিষয়টি নিশ্চিত করা। এছাড়া ১৬ আগস্ট ২০১৮ তারিখে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব নজিবুর রহমানের সভাপতিত্বে ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়নবিষয়ক এক সভায় সড়ক দুর্ঘটনা রোধে ১৭টি নির্দেশনা প্রদান করা হয়।

নির্দেশনাগুলো হলো—১. ঢাকা শহরে চলমান সব গণপরিবহন, শহরে চলাকালে সব সময় দরজা বন্ধ রাখা এবং বাস স্টপেজ ছাড়া যাত্রী ওঠা-নামা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা নিশ্চিত করতে বিআরটিএ ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়। ২. একই সময়ের মধ্যে গণপরিবহনে (বিশেষত বাসে) দৃশ্যমান দুটি স্থানে চালক ও হেলপারের ছবিসহ নাম, চালকের লাইসেন্স নম্বর, মোবাইল নম্বর প্রদর্শন নিশ্চিত করা। ৩. সব মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীকে (সর্বোচ্চ দুজন আরোহী) বাধ্যতামূলক হেলমেট পরিধান এবং সিগন্যালসহ সব ট্রাফিক আইন মানতে বাধ্য করা। ৪. সব সড়কে বিশেষত মহাসড়কে চলমান সব পরিবহনে (বিশেষত দূরপাল্লার বাসে) চালক ও যাত্রীর সিটবেল্ট ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া এবং পরিবহনসমূহকে সিটবেল্ট সংযোজনের নির্দেশনা দেওয়া এবং আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া। ৫. ঢাকা শহরের যেসব স্থানে ফুটওভার ব্রিজ বা আন্ডারপাস রয়েছে, সেসব স্থানের উভয় পাশে ১০০ মিটারের মধ্যে রাস্তা পারাপার সম্পূর্ণ বন্ধ করা। প্রয়োজনে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নাগরিকদের ধন্যবাদ কিংবা প্রশংসাসূচক সম্বোধনের ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। ৬. ফুটওভার ব্রিজ বা আন্ডারপাসসমূহে প্রয়োজনীয় পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আন্ডারপাসসমূহে প্রয়োজনীয় লাইট, সিসিটিভি স্থাপনাসমূহ ব্যবহার করা। ৭. ঢাকা শহরের সব সড়কে জেব্রা ক্রসিং ও রোড সাইন দৃশ্যমান করা, ফুটপাত হকারমুক্ত রাখা, অবৈধ পার্কিং ও স্থাপনা উচ্ছেদ করা, সব সড়কের নামফলক দৃশ্যমান স্থানে সংযোজনের নির্দেশ দেওয়া হয়। ৮. ট্রাফিক সপ্তাহে চলমান সব কার্যক্রম পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত যথাসম্ভব অব্যাহত রাখা। ৯. স্বয়ংক্রিয় বৈদ্যুতিক সিগন্যাল ব্যবস্থা চালু করার বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। ১০. একই সময়ে ঢাকা শহরে রিমোট কন্ট্রোলড অটোমেটিক বৈদ্যুতিক সিগন্যালিং পদ্ধতি চালু করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

১১. ঢাকা শহরের সব সড়কের রোড ডিভাইডারের উচ্চতা বৃদ্ধি করে বা স্থানের ব্যবস্থাপনা অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ। ১২. মহাখালী ফ্লাইওভার থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত (আপ ও ডাউনে) ন্যূনতম দুটি স্থানে স্থায়ী মোবাইলকোর্ট বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং প্রতিনিয়ত দৈবচয়নের ভিত্তিতে যানবাহনের ফিটনেস ও ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষা করা। শহরের অন্য সব স্থানেও প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী অস্থায়ীভাবে অনুরূপ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। ১৩. ঢাকা শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহের সঙ্গে সমন্বয় করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছুটি বা শুরু হওয়ার সময় অপেক্ষাকৃত জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থী, স্কাউট ও বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোরের (বিএনসিসি) সহযোগিতা নিয়ে শিক্ষার্থীদের রাস্তা পারাপারের উদ্যোগ নিতে হবে। ১৪. অবৈধ পরিবহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে এবং ফিটনেস দেওয়ার প্রক্রিয়ায় অবশ্যই পরিবহন দেখে ফলপ্রসূ ব্যবস্থা নিতে হবে। ১৫. রুট পারমিট/ফিটনেস-বিহীন যানবাহনসমূহকে দ্রুত ধ্বংস করার সম্ভাব্যতা যাচাই করতে হবে। ১৬. লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে হবে। এক্ষেত্রে ‘লারনার’ দেওয়ার প্রাক্কালে ড্রাইভিং টেস্ট নেওয়া যেতে পারে এবং উত্তীর্ণদের দ্রুততম সময়ে লাইসেন্স দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। ১৭. কর্মকর্তা-কর্মচারীর ঘাটতি থাকলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ঘাটতি পূরণের ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়।

উপরোক্ত নির্দেশনাগুলোসহ পরিবহন আইন, ২০১৮-এর কার্যকর বাস্তবায়ন হলে সড়ক দুর্ঘটনা নিশ্চিত কমে আসবে। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে চালক যাত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সবার সচেতনতা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য।

লেখক: শিক্ষক, সমাজসেবক ও সংগঠক, নির্বাহী সদস্য ও সাবেক যুগ্ম মহাসচিব, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা), কেন্দ্রীয় কমিটি

ইত্তেফাক/এমআর

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন