সত্যের চাইতেও মানুষের মন বেশি কঠিন

আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০২১, ০৬:৫০

টি-২০ বিশ্বকাপে পাকিস্তানের নিকট ১০ উইকেটের বিশাল ব্যবধানে পরাজয়ের পর ভারতীয় সমর্থকদের তুমুল রোষানলে পড়িয়াছেন দেশটির পেসার মোহাম্মদ শামি। অনেকে মনে করেন, দেশটির সমর্থকদের ক্ষোভ একটু বেশি মাত্রায় হইয়াছে মোহাম্মদ শামি মুসলিম হইবার কারণে।

শামির ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে প্রকাশ-অযোগ্য ভাষায় গালিগালাজ করিয়াছেন অনেকে। এমনকি মোহাম্মদ শামিকে পাকিস্তানি বলিয়াও অভিহিত করিয়াছেন দেশটির কিছু কট্টর সমর্থক। অনেকে তাহাকে পাকিস্তানের দালাল কিংবা গুপ্তচর হিসাবে অভিহিত করিয়াছেন।

 কেহ কেহ এমন অভিমতও ব্যক্ত করিয়াছেন যে, মোহাম্মদ শামি পাকিস্তানের সহিত ঐ ম্যাচ পরাজয়ের জন্য ফিক্সিং করিয়াছেন। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মোহাম্মদ শামি ৩.৫ ওভার বল করিয়া ৪৩ রান দিয়াছেন। নিজের শেষ ওভারে ৫ বলেই দিয়াছেন ১৭ রান। মূলত শামির ওভার হইতেই ম্যাচ জয় নিশ্চিত করিয়াছে পাকিস্তান। আর ইহাতেই তাহার ওপর যত রাগ দেশটির কিছু সমর্থকের।

এইদিকে গত ২৪ অক্টোবর শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে বাংলাদেশ ১৭১ রানের ভালো পুঁজি সংগ্রহের পরও লিটন দাসের সহজ দুইটি ক্যাচ মিস হইবার কারণে বাংলাদেশ পরাজিত হয়। এই পরাজয়ে আমাদের দেশের সমর্থকদের হূদয় ভাঙিয়াছে। কারণ, দলীয় ৭৯ রানেই ৪ উইকেট হারাইয়া ফেলিয়াছিল লঙ্কানরা। ১৩তম ওভারে আফিফ হোসেনের বলে ভানুকা রাজাপক্ষের ক্যাচ মিস করেন লিটন। ঐ সময় ১৪ রানে ব্যাট করিতেছিলেন লঙ্কান বামহাতি ব্যাটার। শেষ পর্যন্ত তিনি ৩৩ বলে ৫১ রান করেন, যাহা বাংলাদেশের পরাজয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হইয়া উঠে। একই সঙ্গে লিটন আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্যাচ মিস করেন। ১৫তম ওভারে মোস্তাফিজুর রহমানের বলে চারিথ আসালাঙ্কা ক্যাচ তুলিয়া দিলেও লিটন তাহা মুঠোবন্দি করিতে ব্যর্থ হন। ঐ সময় লঙ্কান খেলোয়াড় ৬৩ রানে ব্যাট করিতেছিলেন। পিচে সেট হওয়া এই খেলোয়াড়কে বিদায় করিতে পারিলে খেলার মোড় ঘুরিবার বিশাল সম্ভাবনা ছিল। মুশফিকুর রহিম সংবাদ সম্মেলনেও এই ক্যাচের মিসের বিষয়ে বিশেষভাবে জোর দিয়াছেন। তিনি একরকম বিস্ময় প্রকাশ করিয়াছেন লিটনের মতো ভালো ফিল্ডারের হাত হইতে ক্যাচ মিস হইবার ঘটনাটিতে। তিনি ঐ দুইটি ক্যাচকে টার্নিং পয়েন্ট বলিলেও হারের দায় কাহারো উপর দেন নাই।

কিন্তু পাবলিক পারসেপশন ভিন্ন কথা বলিতেছে। মোহাম্মদ শামির মতো লিটন দাসও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানানভাবে সমালোচনার শিকার হইয়াছেন। যদিও কোচ এবং অন্য অনেকেই লিটনের পাশে ছিলেন। এই দিকে মোহাম্মদ শামির পাশেও দাঁড়াইয়াছেন ভারতের সাবেক ক্রিকেটাররা। সাবেক ওপেনার বীরেন্দ্র শেবাগ এক টুইট বার্তায় ইংরেজিতে যাহা লিখিয়াছেন বাংলা তর্জমায় তাহা এইরকম :‘মোহাম্মদ শামির উপর অনলাইন আক্রমণ খুবই দুঃখজনক। আমরা তাহার পাশে আছি। সে একজন চ্যাম্পিয়ন...সামনের ম্যাচে তুমি তোমার জাদু দেখাইয়া দাও।’ ভি ভি এস লক্ষ্মণ তাহার এক টুইট বার্তায় বলিয়াছেন, ‘মোহাম্মদ শামি আট বত্সর ধরিয়া ভারতের হইয়া দুর্দান্ত পারফরমার, অনেক জয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করিয়াছেন তিনি। তাহাকে একটি পারফরম্যান্স দ্বারা বিবেচনা করা যায় না...।’

আমরা এই সকল ঘটনার মধ্যে উপমহাদেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের ভাবনার গতিমুখ উপলব্ধি করিতে পারি। সেই যে বহুব্রীহি নাটকে হুমায়ূন আহমেদ লিখিয়াছেন—‘পাবলিকের মুখ তো আপনি বন্ধ করতে পারবেন না।’ এই ব্যাপারটি সর্বক্ষেত্রেই সত্য। অনেকে বলিয়া থাকেন—এত কিছু করিলাম, তাহার পরও মানুষের মন ভরে না? এই ক্ষেত্রে মনস্তাত্ত্বিকরা বলিয়া থাকেন, মানুষের চিন্তার ধারা যত না সত্যকে অনুসরণ করে, তাহার চাইতে বেশি অনুসরণ করে তাহার অভিজ্ঞতার ছায়াকে এবং তাহার সন্দেহবাতিক পূর্বধারণাকে। আপনি যতই নির্ভরযোগ্য তথ্য কিংবা পরীক্ষালব্ধ ফলাফল লইয়া আসুন না কেন, একবার কোনো ব্যাপারে মনস্থির করিয়া ফেলিলে তাহাকে পুরোপুরি ভুল স্বীকার করানো সহজ কাজ নহে। মনে রাখিতে হইবে, সত্য যত কঠিনই হউক না কেন, মানুষের মন আরো বেশি কঠিন। সুতরাং পাবলিক পারসেপশনের ব্যাপারে সতর্ক থাকাটা অত্যন্ত জরুরি।

ইত্তেফাক/কেএইচ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন