সোমবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২২, ৩ মাঘ ১৪২৮
দৈনিক ইত্তেফাক

মশা নির্মূলে ব্যক্তিগত সচেতনবোধ

আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০২১, ১০:৫১

করোনার পাশাপাশি ডেঙ্গু নিয়ে জনমনে মহা আতঙ্ক সৃষ্টি হচ্ছে। ডেঙ্গুতে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। তাই অভিভাবকরা চরম উদ্বিগ্ন। এক হিসাবমতে, এ বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার। এর মধ্যে সবচেয়ে আক্রান্ত আগস্ট মাসেই। আগস্ট মাসে আক্রান্ত ৭ হাজার ৪৩২ জন। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৬৫ জন। ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছেন ঢাকা শহরের বাসিন্দারা। তবে সারা দেশেই ডেঙ্গুর সংক্রমণ হয়েছে। করোনার পাশাপাশি ডেঙ্গুর এই সংক্রমণ সারা দেশের মানুষের মধ্যে নতুন ভীতি দেখা দিয়েছে। ডেঙ্গুর নতুন ধরনে সবচেয়ে বেশি অসুস্থ হচ্ছে। এদিকে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) এক গবেষণায় জানা গেছে, বাংলাদেশের রোগীদের মাঝে তারা ডেঙ্গুর নতুন সেরোটাইম বা একটি ধরন শনাক্ত করেছেন। ডেনভি/৩ নামের এই ধরনে ঢাকার বাসিন্দারা বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। ডেনভি/৩ এ ধরনের আক্রান্তের কারণে রক্তের কনিকা প্লাটিলেট দ্রুত কমে যায়। এ ধরনের আক্রান্তরা দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাছাড়া ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীরা অনেক দেরিতে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার কারণে রোগের ভয়াবহতা বেড়ে যায়। এটা হচ্ছে অনেকটা অজ্ঞতার কারণে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সাইফুল্লাহ মুন্সি বলেছেন, দেশে ডেনভি/৩ ধরনের ডেঙ্গু প্রথম দেখতে পায় ২০১৭ সালের দিকে। তার আগে আরো দুটি ধরন ডেনভি/১ ডেনভি/২ ছিল। এর কারণে মানুষের রোগপ্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করেছে। কিন্তু এই নতুন ধরনটি আগের চেয়ে ভয়ংকর। আগে কেউ ডেঙ্গুর কোনো ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত হয়ে রোগপ্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হওয়ার পর আবার যদি ডেনভি/৩ ভাইরাসের ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত হয়ে যায়, তাহলে তার অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে।

বাংলাদেশের মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত বেশি হয়েছিল ২০১৯ সালে। সে বছর লক্ষাধিক মানুষ ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়েছিল। শুধু আগস্ট মাসেই সে বছর হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল ৫০ হাজারের বেশি মানুষ। বেসরকারি হিসাবমতে, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ২৭৬ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। যদিও সরকার তার মধ্যে ১৭৯ জনের মৃত্যু ডেঙ্গুজনিত কারণে নিশ্চিত করছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, দুটি মহামারি যদি একত্রে চলমান থাকে তাহলে মানুষের জীবনে একটি প্রবল হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। আবার করোনা ভাইরাসের সঙ্গে ডেঙ্গু রোগের উপসর্গ মিলে যাওয়ার কারণে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার পর অনেকে কোভিড/১৯-এ-ও আক্রান্ত হয়েছে ধরে নিচ্ছে। ফলে জটিলতা আরো বাড়ছে।

গত ২৯ জুলাই থেকে ৭ আগস্টের মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা এডিস মশা ও ডেঙ্গুসংক্রান্ত রাজধানীর দুটি সিটি করপোরেশনের ৯৮টি ওয়ার্ডের ১০০টি স্থানে জরিপ পরিচালনা করে। প্রকাশিত জরিপে দেখা যায় ডিএনসিসির ৩৭ নম্বর ওয়ার্ড (আফতাবনগর, মেরুল বাড্ডা) ও ডিএসসিসির ৩৫ নম্বর ওয়ার্ডের (বংশাল) এডিস মশার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এডিস মশা সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায় ডিএসসিসির বাসাবো ও গোড়ান এলাকায়। এছাড়া ডিএসসিসির এলিফ্যান্ট রোড, সায়েন্স ল্যাবরেটারি, আর কে মিশন রোড, টিকাটুলি, বনশ্রী, মিন্টু রোড ও বেইলী রোড। ডিএনসিসির সবচেয়ে বেশি এডিস মশাপ্রবণ এলাকা হলো মগবাজার ও নিউ ইস্কাটন, বসুন্ধরা ও নিকুঞ্জ এলাকায়ও আছে। তাছাড়া কল্যাণপুর, দারুসসালাম মিরপুর-১০, কাজীপাড়া, মহাখালী ও নিকেতন এলাকায় ও এডিস মশার অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।

এডিস মশা সৃষ্টির অন্যতম কারণ হলো এ বছর এপ্রিল মে মাসে বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে বেশি আর্দ্রতায় এডিস মশা উত্পত্তিতে সহায়তা করে। তাছাড়া ঢাকা ও অন্যান্য শহর এলাকায় রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি থেমে থাকে না। ওয়াসার খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হলে তার শেষ হয় না, গর্তে পানি জমে থাকে সেখানে এডিস মশা বিস্তার লাভ করে। মেট্রোরেলের কাজ চলছে, যেখানে-সেখানে যন্ত্রপাতি পড়ে থাকে, সেখানেও পানি জমে এডিস মশার লাভা সৃষ্টি হয়। ফুটওভার ফ্লাইওভার ব্রিজ তৈরির ঝক্কি ঝামেলা তিতাস গ্যাসের লাইন সংস্করণ এডিস মশা উত্পত্তিতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। ডেভেলপার কাজ সারা বছর ধরে চলে এরা তো কোনো নিয়মনীতিই মানে না। না মানার কারণে সেখানে ও এডিস মশা বিস্তার লাভ করে। দুই সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা কম দায়ী নয়। সকাল ৭-৮টা বেজে যায় রাস্তাঘাট পরিষ্কার করছে না। এরা তো শহরই পরিচ্ছন্ন রাখতে পারছে না মশা দমন কীভাবে করবে? ভয়ংকর দুর্গন্ধ ছড়িয়ে দিনের বেলায় বর্জ্যের গাড়ি নিয়ে ছোটাছুটি। এদের দেখার যেন কেউ নেই অথচ নাগরিকদের কাছ থেকে ট্যাক্স ঠিকই নেওয়া হচ্ছে। দুই নগরপিতা নগরবাসীর ছাদের দিকে দৃষ্টি না দিয়ে নাগরিক সেবার দিকে লক্ষ রাখুন। উত্তরের মেয়র বলেছেন, প্রতি শনিবার ১০ মিনিটের জন্য বাসাবাড়ির আশপাশ নিজ উদ্যেগে পরিষ্কার করার অনুরোধ জানিয়েছেন। কিন্তু নগরবাসী তা আমলে নেয়নি।

এডিস মশা নির্মূলের ব্যক্তিগত সচেতনবোধ ছাড়া উপায় নেই। ২০১৯ সালে মশার ওষুধ নিয়ে দুর্নীতি হয়েছিল যার ফলে মশা নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। এখনো মশা নির্মূলে দুই সিটি করপোরেশনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। ওষুধ ছিটানোর নমুনা হাস্যকর, ফগার মেশিন নিয়ে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে ওষুধ স্প্রে করে বাড়ির আঙিনায় করা হচ্ছে না। এতে করে মশা নিধন হয়? কোনো কোনো জায়গায় মাসে একবারও স্প্রে করতে দেখা যায় না। এটাই মশা নিধনের বাস্তবতা। নিবিড়ভাবে মনিটরিং করা হলে অমনটি হওয়ার কথা নয়। অবশ্য ব্যক্তিগত খামখেয়ালিপনাও আছে। অনেক বাড়িতে মশারি টানিয়ে ঘুমানো হয় না। মশারি টানানোর অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। বাড়ির ছাদে বা আশপাশে নিজ উদ্যেগে পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। এতে মশার উপদ্রব অনেকটাই কমবে। সিটি করপোরেশন তাদের দায়িত্ব কর্তব্য সঠিকভাবে পালন করলে মশার নির্মূল করা অবশ্যই সম্ভব। মশা নির্মূল হলেই ডেঙ্গু নির্মূল হবে।

লেখক: ব্যাংকার, কলামিস্ট

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করা যাইবে না

বাংলাদেশের জাতীয় মুক্তির পথ

‘ক্ষীণছন্দ মন্দগতি তব রাত্রিদিন’ 

মাদকের ছোবল থেকে কে বাঁচাবে তরুণদের?

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

দক্ষিণ এশিয়ার যুবশক্তির সদ্ব্যবহার 

ভালো থাকা না থাকা

তরুণ ছাত্রছাত্রীরাই হবে সফল উদ্যোক্তা

অর্থনৈতিক সংকট লইয়া নীতিনির্ধারকদের ভাবিতে হইবে