মঙ্গলবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২২, ৪ মাঘ ১৪২৮
দৈনিক ইত্তেফাক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী মুখ

নাবিলার 'প্রথমা' হয়ে ওঠার গল্প

৬ ডিসেম্বর সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের স্নাতকোত্তরের চূড়ান্ত  ফলাফল প্রকাশ হয়েছে। নাবিলা সিজিপিএ ৪.০ এর স্কেলে ৩.৯১ পেয়ে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছেন। এর আগে স্নাতকের ফলাফলেও প্রথম শ্রেণিতে দ্বিতীয় হন তিনি। অল্প নম্বরের ব্যবধানে সেবার প্রথম হতে পারেন নি। এ কারণে কিছুটা আক্ষেপ থাকলেও স্নাতকোত্তরের ফলাফলের মাধ্যমে তা অনেকটাই ঘুচাতে পেরেছেন।

আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০২১, ০১:৫১

হুমায়রা আঞ্জুমী নাবিলা তখন সবেমাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন। এরমধ্যেই হঠাৎ পরিবারে ঝড় বয়ে যায়। দীর্ঘদিন ধরে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত মাকে হারিয়ে ভেঙ্গে পড়েন নাবিলা ও তার পরিবারের সকলে। সুনামগঞ্জ ছেড়ে কেবলই  ঢাকায় থিতু হওয়া নাবিলার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় ছিল এটি। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার পেছনে সবচেয়ে বড় প্রেরণা ছিলেন তার মা-ই।

এদিকে বাড়িতে বাবা, সঙ্গে ছোট দুই ভাই। তাদের দেখভালের ভারও নিতে হয় নাবিলাকে। সংসারের নানা দায়িত্ব কাঁধে এসে পড়ে। দুই ভাইয়ের পড়াশোনা, প্রতিমুহূর্তে তাদের খোঁজ রাখা; ছুটিতে এসে বাড়ি সামলানো, সব কাজই নির্ভরতার সাথে করেছেন তিনি। সবকিছু সামলেও তিনি হয়েছেন একজন 'প্রথমা'। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের মেধাবী এই শিক্ষার্থী এবার স্নাতকোত্তরের ফলাফলে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছেন।

এই সাফল্যের পেছনের গল্প জানতে চাইলে বারবারই ঘুরেফিরে মায়ের কথা বলছিলেন তিনি। নাবিলা বলেন, 'জীবনের শুরু থেকে সবসময়ই আমার অনুপ্রেরণা ছিলেন আমার মা। ভালো-খারাপ সব সিদ্ধান্তেই তিনি আমার পাশে থাকতেন। পড়াশোনার প্রতি আমাকে মনোযোগী ও সময়ানুবর্তি করে গড়ে তুলেছেন। তাঁর উৎসাহে স্কুলজীবনে বিভিন্ন বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে প্রতিবারই সাফল্য পেয়েছি।' 

'অষ্টম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে সরকারি বৃত্তি পাওয়া আমার জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এরপর থেকে আর কখনো পেছনে ফিরে তাকাইনি। তখন থেকেই পড়াশোনায় ভালো করার মানসিক শক্তি আর নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার লড়াইয়ের আত্মবিশ্বাস খুঁজে পেয়েছিলাম'—এমনটাই বলছিলেন নাবিলা। 

৬ ডিসেম্বর সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের স্নাতকোত্তরের চূড়ান্ত  ফলাফল প্রকাশ হয়েছে। নাবিলা সিজিপিএ ৪.০ এর স্কেলে ৩.৯১ পেয়ে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছেন। এর আগে স্নাতকের ফলাফলেও প্রথম শ্রেণিতে দ্বিতীয় হন তিনি। অল্প নম্বরের ব্যবধানে সেবার প্রথম হতে পারেন নি। এ কারণে কিছুটা আক্ষেপ থাকলেও স্নাতকোত্তরের ফলাফলের মাধ্যমে তা অনেকটাই ঘুচাতে পেরেছেন।

২০১৫-১৬ সেশনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের 'খ' ইউনিটে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগে ভর্তি হন হুমায়রা আঞ্জুমী নাবিলা। এর আগে তিনি সুনামগঞ্জ সরকারি এসসি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক ও সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের মানবিক বিভাগ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। উচ্চমাধ্যমিকের ফলাফলে সিলেট বোর্ডের মেধাতালিকা ভিত্তিক বৃত্তিতে দশম স্থান লাভ করেন তিনি।

নাবিলা বলেন, 'উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে পড়াশোনা করতে আমার বেশ ভালো লাগে। সে কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে পছন্দের বিষয়ে পড়ার সুযোগ পেয়ে সেখানে শতভাগ মনোযোগ দেয়ার চেষ্টা করেছি। সবসময় চেয়েছি যেন ভালো ফলাফল নিয়েই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হই।'

বর্তমানে ‘রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টেগ্রেশন ফর ডেভলপমেন্ট’ নামের একটি সংস্থায় গবেষণা সহকারী হিসেবে কর্মরত আছেন এই মেধাবী তরুণী। পরবর্তীতে 'পাবলিক পলিসি' নিয়ে বিভিন্ন সেক্টরে কাজ করার ইচ্ছা রাখেন। স্নাতকোত্তরে মেজর স্ট্রিম হিসেবে পাবলিক পলিসি নিয়ে কাজ করেছেন। এছাড়া ইউরোপের ভালো কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখেন।

আপাতত ইচ্ছা কী—জানতে চাইলে নাবিলা বলেন, 'বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবার ইচ্ছা রয়েছে। কাজের মধ্যেই থাকতে চাই। শিক্ষকতার পাশাপাশি গবেষণায় কাজ করব।' কথা প্রসঙ্গে জানালেন ভিন্ন এক ভাবনার কথাও, 'কোনো ক্যান্সার-গবেষণা সংস্থায় নির্বাহী পর্যায়ে ভূমিকা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব স্বপ্ন পূরণের জন্য সবমিলিয়ে নিজেকে দক্ষ করার প্রস্তুতি নিচ্ছি।'  বোঝা গেলো এই ভাবনার পেছনের কারণ তার মায়ের অসুখ। বাংলাদেশে ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য অবকাঠামো এখনো অপ্রতুল। যথাসময়ে চিকিৎসা নেয়ার ক্ষেত্রেও সচেতনতার অভাব রয়েছে মানুষের মাঝে। এই বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করতে চান তিনি।

বাবা ও দুই ভাইয়ের সঙ্গে নাবিলা

হুমায়রা আঞ্জুমী নাবিলা সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগ নেতা সিরাজুর রহমান সিরাজ ও নাসিমা খাতুন টিউলিপের  একমাত্র মেয়ে। সুনামগঞ্জ শহরের হাসননগরের পূরবী আবাসিক এলাকার বাসিন্দা এই পরিবারটি। মা নাসিমা খানম টিউলিপ সরকারি চাকরি করতেন। ২৯ বছরের চাকরিজীবনে সবসময়ই সদালাপী ও আন্তরিক ব্যবহারের জন্য সহকর্মীদের মাঝে পরিচিত ছিলেন তিনি। কখনো অন্যায়ের কাছে মাথা পেতে নেননি। মেয়েকেও সেই শিক্ষাই দিয়েছেন। সুনামগঞ্জের গণ্ডি পেরিয়ে নাবিলার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চাওয়া ছিল অনেকটাই চ্যালেঞ্জিং এক সিদ্ধান্ত, যার পেছনে সবসময় উৎসাহ যুগিয়েছেন নাবিলার মা। নিজের দুই ছেলের সঙ্গে মেয়েকে কখনো আলাদা করে দেখেন নি তিনি।

স্নাতকোত্তরে সর্বোচ্চ ফলাফলের জন্য হুমায়রা আঞ্জুমী নাবিলা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষক ও সহপাঠী সহ পরিবারের সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, 'আল্লাহ্‌র কাছে অশেষ শুকরিয়া। মায়ের মৃত্যুর পর বাবা আমাকে সবসময় আগলে রেখেছেন। দূরে থেকেও মাথার উপর ছায়া হয়ে থেকেছেন তিনি। আর ছোটবেলা থেকেই আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের কাছ থেকে সবসময় গঠনমূলক দিক-নির্দেশনা পেয়ে ভালো করার উৎসাহ পেয়েছি। শ্রদ্ধেয় আব্দু মিয়া স্যার, উজ্জ্বল স্যার, সঞ্জয় স্যার ও মান্না স্যারদের কথা বলতে চাই। তাঁরাই আমার মাঝে দেশসেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্পৃহা জাগিয়েছেন।' 

আলাপচারিতার শেষ পর্যায়ে নাবিলা বললেন, 'আজ মা বেঁচে থাকলে খুব খুশি হতেন। তিনি নিজ হাতে আমার জীবন-দর্শন গড়ে দিয়ে গেছেন, তাই আমার সাফল্যতেই আমার মায়ের স্বপ্ন পূরণ হবে বলে আমার বিশ্বাস। আজকের এই ফল আমি আমার মাকে উৎসর্গ করছি।'

ইত্তেফাক/এসটিএম