স্বাধীন দেশ সম্পর্কে আমাদের স্বপ্ন মুহূর্তের ঝলকের মতো আবির্ভূত হয়নি। মহাত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতার স্বপ্ন ছুঁতে হয়েছে। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৩০ লাখ শহিদের তাজা রক্ত এবং ২ লাখ মা-বোনের ইজ্জত বিসর্জন দিয়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আমরা পেয়েছি স্বাধীন সার্বভৌম একটি রাষ্ট্র, পেয়েছি লাল-সবুজের গৌরবান্বিত একটি পতাকা।
১৯৪৭-এর পর থেকে একের পর এক আন্দোলনের সিঁড়ি ডিঙিয়ে চূড়ান্ত ফসল হিসেবে এসেছে মুক্তিযুদ্ধ ও বিজয়। ’৫২-এর ভাষাআন্দোলন, ’৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ’৬২ সালের সামরিক আইন ও শিক্ষাকমিশন রিপোর্ট বিরোধী আন্দোলন, ’৬৬-এর ছয় দফার আন্দোলন, ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানেরই চূড়ান্ত পরিণতি ’৭১-এর মুক্তিসংগ্রাম। দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে বাঙালি জাতির সঙ্গে চলা অর্থনৈতিক, মানসিক ও রাজনৈতিক বিরোধের অবসান ঘটে। জাতীয় দিবস যেমন গৌরব বয়ে আনে, ঠিক তেমনই বর্তমান প্রজন্মকে শিক্ষা দেয় স্বাধীনতা শব্দটা অর্জন করতে কত ত্যাগ, কত প্রাণ, কত রক্ত ঝরাতে হয়। এটা সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে না পারলে, ধরে রাখতে না পারলে স্বাধীনতার আসল উদ্দেশ্য কখনোই বাস্তবায়িত হবে না। স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে যাবে। এজন্য বর্তমান প্রজন্মকে শহিদদের চেতনা বুকে ধারণ করতে হবে। তাদের স্মরণ করতে হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখছি, কিছু কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী বাংলাদেশ সরকার ঘোষিত জাতীয় দিবস ২১ ফেব্রুয়ারি শহিদ দিবস, ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস, ১৫ আগস্ট জাতীয় শোকদিবস, ১৪ ডিসেম্বর শহিদ বুদ্ধিজীবী দিবস এবং ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস উদযাপন করছে অদ্ভুত কিছু নিয়মনীতির মাধ্যমে। এই দিবসগুলোর দিনে তরুণ-তরুণীসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে বিভিন্ন জায়গায় লাউড স্পিকারে নানা রকম ডিজে গান বাজিয়ে অশ্লীল নৃত্য-উল্লাসে মগ্ন হতে দেখা যায়। চলে রাতভর ডিজে পার্টি। অথচ দেশের নাগরিক হিসেবে প্রত্যেকের দায়িত্ব হচ্ছে স্মৃতিস্তম্ভ, শহিদ মিনারে শ্রদ্ধা জানানো ও নতুন প্রজন্মের কাছে শহিদদের স্মৃতিচারণ করা ও শহিদদের বীরত্বগাথা ছড়িয়ে দেওয়া। কিন্তু তাদের ডিজে গান বাজিয়ে অশ্লীল নৃত্য-উল্লাসের এসব কার্যকলাপ আমাদের দেশের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় অনুভূতিকে আঘাত করার সামিল। এভাবে চলতে থাকলে একসময় আমাদের ঐতিহ্যে এ ধরনের অপসংস্কৃতি ঢুকে পড়বে, যার ফলে পরবর্তী সময় প্রজন্ম ভুল ঐতিহ্যের মধ্যে বড় হবে, যা খুবই দুঃখজনক। পৃথিবীতে আমরাই একমাত্র জাতি, যাদের মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিতে সালাম, রফিক, বরকত, জব্বার, শফিউরসহ অনেককে শহিদ হতে হয়েছে। আর আমরা কিনা রাষ্ট্রভাষা দিবসে আনন্দোল্লাসের নামে বিদেশি ভাষার অশ্লীল ডিজে গান বাজাই! আমাদের এই ধরনের মস্তিষ্ক বিকৃতির অপসংস্কৃতিতে সালাম, রফিক, বরকত, জব্বার, শফিউরদের আত্মা কষ্ট পায় না কী! পরলোক হতে তাদের আত্মা ধিক্কার দেয় আমাদের আর বলে ওঠে এই কী আমাদের আত্মত্যাগের মূল্য। তাছাড়া এ ধরনের ডিজে গান বাজিয়ে নাচানাচি করে আমাদের ৩০ লাখ শহিদ ও ২ লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত এই বিজয়কে কলঙ্কিত ছাড়া আর কিছু করতে পারে না।
আমাদের তরুণ সমাজসহ সবার মনে রাখা উচিত, আমরা জাতীয় দিবসে গান বাজাব, তা দেশাত্মবোধক গান ও শহিদদের স্মৃতিবিজড়িত গান বাজিয়ে দেশের ইতিহাস তুলে ধরব। সৃষ্টিকর্তার কাছে শহিদদের আত্মার শান্তির জন্যে প্রার্থনা করব। দেশের সন্তান হিসেবে শহিদদের শ্রদ্ধা জানাতে আমরা স্থানীয় শহিদদের স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানাব। এছাড়াও আমাদের প্রতিটি জাতীয় দিবস উদযাপনের নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম মোতাবেক আমরা তা পালন করব। সবাইকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হৃদয়ে লালন করতে হবে। জাতীয় দিবস উদযাপনের নামে অনাকাঙ্ক্ষিত অনুষ্ঠান বন্ধে প্রয়োজনে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তাহলেই শহিদদের আত্মা শান্তি পাবে। আমাদের দেশের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি রাষ্ট্রীয় অনুভূতি সমহিমায় গৌরবোজ্জ্বল থাকবে।
লেখক: শিক্ষার্থী, সরকারি তিতুমীর কলেজ, ঢাকা।
