ইত্তেফাক: বাঙালির অস্তিত্বের ঠিকানা

আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর ২০২১, ১০:১৮

ইত্তেফাকের তখন ভরা যৌবন। তখন যে বয়স, সেই বয়সের মধ্যেই প্রকাশিত হওয়ার পরপরই পত্রিকাটি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়। আমার সঙ্গে যখন তার প্রথম দৃষ্টি বিনিময়, তখন আমার যৌবনের প্রারম্ভ। ১৯৬৪ সাল, সেই সময়েই কর্মসূত্রে ইত্তেফাকের সঙ্গে আমার পথচলা শুরু। ষাটের দশকের গোঁড়ার দিকেই দৈনিক ইত্তেফাকের যাত্রা শুরু হলেও সাপ্তাহিক ইত্তেফাকের জন্ম তারও আগে, ১৯৪৯ সালেই। যা হোক, তারপর দীর্ঘকাল আমি দৈনিক ইত্তেফাকে কাজ করেছি। স্বীকার করতেই হবে, ইত্তেফাকই ছিল আজকের আমি ‘আমি’ হয়ে ওঠার আঁতুড়ঘর। প্রকৃত অর্থে, সেখানেই আমি আমার সাংবাদিকতার আসল পাঠ নিয়েছি এবং সুযোগ হয়েছে সেই সময়ের বিখ্যাত সব সাংবাদিকের সঙ্গে পাশাপাশি কাজ করার এবং কাজ শেখার। মূলত তাদের হাত ধরেই আমার সাংবাদিক হয়ে ওঠার সমস্ত দ্বার উন্মোচিত হতে থাকে।

বার্তানির্বাহী সম্পাদক শহিদ সিরাজুদ্দিন হোসেন আমার কাছে এমন একজন মানুষ—আজকে আমার পেশাজীবনে যদি কোনো অর্জন থাকে, এর অধিকাংশতেই তার অবদান ও ভূমিকাকে আমি আজীবন স্বীকার করি। তিনি আপাদমস্তক ইত্তেফাকেরই মানুষ এবং বিশিষ্ট সাংবাদিক। পরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী, আলবদর ও রাজাকার বাহিনীর সদস্যরা তাকে তার রাজধানীর চামেলীবাগের বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায়। এরপর তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। শহিদ খন্দকার আবু তালেব—তিনিও কিছুকাল ইত্তেফাকে ছিলেন এবং তিনিও আপাদমস্তক একজন সাংবাদিক। আসফ-উদ-দৌলা রেজা ছিলেন একজন ব্যক্তিত্ব, যিনি সুদীর্ঘকাল ইত্তেফাকে তার ভূমিকা রেখেছেন। আহমেদুর রহমান, যিনি ইত্তেফাকের ‘মিঠেকড়া ভীমরুল’ খ্যাত প্রখ্যাত সাংবাদিক, কলামিস্ট—১৯৬৫ সালের ২০ মে কায়রোর অদূরে পিআইএর বিমান দুর্ঘটনায় তিনি নিহত হন। আর একজন বিশাল ব্যক্তিত্ব ছিলেন রোকনুজ্জামান খান; যিনি দাদাভাই নামেই পরিচিত ছিলেন। বহুল প্রচারিত দৈনিক ইত্তেফাকের শিশু-কিশোরদের উপযোগী কচি-কাঁচার আসর বিভাগের পরিচালক হিসেবে আমৃতু্য দায়িত্ব পালন করেন। এরকম কিছু মহিরুহ ব্যক্তিত্বকে আমি পেয়েছি সাংবাদিক হয়ে ওঠার প্রথম জীবনে; যাদের সবার সংস্পর্শ ও অবদানেই আমি তৈরি হয়েছি। তারা সবাই আমাকে অসম্ভব স্নেহ করতেন এবং আমার কাজে সহযোগিতা ও উত্সাহ-উদ্দীপনা জোগাতেন। তবে ইত্তেফাকের প্রাণভোমর ছিলেন একজনই; তিনি তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া। যদিও তাঁর সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত যোগাযোগ খুব গভীর ছিল; কিন্তু পেশাগত কাজের ক্ষেত্রে কিছু দূরত্ব বজায় রাখতে হতো। তবে তিনি ছিলেন আমাদের সবার সম্পর্কের কম্পাস; বস্ত্তত তাকে ঘিরেই ছিল সমস্ত কিছু।

আমার সাংবাদিকতার শুরু ১৯৬২ সালে। সময়টা দীর্ঘকাল। আজ মনে পড়ে, বাবা চলে যাওয়ার পরে অনিবার্যভাবেই পরিবারের বিরাট দায়িত্বটি এসে পড়ে আমার কাঁধে। সাংবাদিকতা তখন একপ্রকার বাধ্যতামূলকভাবেই আমার সামনে এলো। কিন্তু সেই বাধ্যতামূলক পরিস্হিতিই আমাকে এক বিশাল পৃথিবীর সন্ধান দিয়েছিল। আজকে সেই সব কথা স্মরণ করে ভালো লাগে এই ভেবে যে, তখনকার পরিস্হিতিই আমাকে সাংবাদিকতায় ঠেলে দিয়েছিল যেমন সত্য; ঠিক তেমনি সত্য সেদিনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্হিতির কারণেই একসময় আমার সামনে সুযোগ আসে এবং সম্পর্কের সূচনা হয় ইত্তেফাকের মতো প্রতিষ্ঠানের এবং সেই সব সাংবাদিকের সংস্পর্শে আসার, একসঙ্গে কাজ করার; নিজেকে তৈরি করার।

ইত্তেফাকের জন্মলগ্ন থেকেই বাঙালি জাতির স্বাধীনতার পথপরিক্রমায় সব ধরনের আন্দোলন-সংগ্রামের সঙ্গে এক আত্মিক সম্পর্ক আমরা লক্ষ করি। পাকিস্তানি শোষণ-বৈষম্যের দীর্ঘ ২৩ বছর এবং স্বাধীন বাঙালি জাতির কাছে গণমানুষের মুখপত্র হিসেবে প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে এই পত্রিকা এক বিশাল অবদান রেখে চলেছে। আমরা যদি ইতিহাসের দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাব, বঙ্গবন্ধু ও দৈনিক ইত্তেফাক ছিল একে অপরের পরিপূরক। বঙ্গবন্ধুর সমস্ত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং তার লড়াই-সংগ্রামের সঙ্গে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, অর্থাত্ ইত্তেফাকের নিরঙ্কুশ অগ্রযাত্রা বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের গতিকে ত্বরান্বিত করেছিল। সুতরাং, এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বাংলার গণমানুষের মুখপত্র দৈনিক ইত্তেফাক ইতিহাসের এক বিরাট সাক্ষী এবং সহযোদ্ধা।

সময়ের দাবি মেটানোই তো সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার মূল দায়িত্ব। মনে পড়ে ’৭১-পূর্ববর্তী সেই উন্মাতাল সময়ের কথা; ’৬২-র শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৬-র ছয় দফা, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ’৬৯-এর গণ-অভু্যত্থান, ’৭০-এর নির্বাচন, এই সময়কালে বাংলার মানুষের দুর্দশার কথা, পাকিস্তানি শোষণ-বৈষম্যের কথা আর তাদের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু ও তার দল আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মসূচির কথা তুলে ধরবে এমন প্রতিষ্ঠান কোথায় ছিল! সেই অগ্নিঝরা সময়গুলোতে ইত্তেফাকই ছিল একমাত্র সংবাদমাধ্যম; যে বুক চিতিয়ে সাংবাদিকতা করেছে, মুক্তিযুদ্ধকে এগিয়ে নিতে একচ্ছত্র সহযোগিতা করেছে। এসব কারণে পাকিস্তানি বাহিনীর তাণ্ডবলীলার শিকারও হতে হয়েছে বারবার।

২৫ মার্চ রাতেই ইত্তেফাক কার্যালয়ে পাকিস্তানি বাহিনী ট্যাংক নিয়ে হামলা চালায় এবং ট্যাংক থেকে ছোড়া গোলায় এক ভয়ংকর অগ্নিবলয়ের মধ্যে নিপতিত হয় ইত্তেফাক অফিস। ইত্তেফাকের সেদিনের সেই ঘটনা বারবার ফিরে আসে। কিন্তু যতবারই এ বিষয়ে লিখি, ততবারই এর বর্ণনা তো একইভাবে উঠে আসে এবং আসবেও। সেদিনের সেই আক্রমণে আমরা কোনো রকমে প্রাণে বেঁচে গেলেও আমাদের অফিসে দুজন মানুষ প্রাণ হারায়। চারদিকে আগুন, যেন আমরা এক অগ্নিবলয়ের মধ্যেই আছি। অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্রের কর্ণবিদারী আওয়াজ শুনছি। শুনছি ট্যাংকের ভয় ধরানো গতি, সামরিক আর্মি কনভয় চলাচলের শব্দ। বিভিন্ন দিক থেকে আর্তনাদ, কান্না, চিত্কার শুনতে পাচ্ছিলাম। দেখতে পাচ্ছিলাম ফসফরাস বোমায় চারদিক আলোকিত হওয়া এবং তার মধ্যেই একটানা মেশিনগানের গুলি। চিত্কার-কান্না ক্রমান্বয়ে নিস্তেজ হয়ে আসছিল। এর মধ্যে দুবার ইত্তেফাক অফিসের ভবনটি লক্ষ্য করে আর্মি কনভয়ের ভেতর থেকে মেশিনগানের গুলি আমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছিল যে, এই অবস্হান বেশিক্ষণ নিরাপদ থাকবে না। এরই মধ্যে একটি আর্মি কনভয় এসে ইত্তেফাক ভবনের দোতলা লক্ষ্য করে মেশিনগানের গুলি বর্ষণ করল এবং তাতে আমাদের ক্যান্টিনের এক কিশোর ঢলে পড়ল মাটিতে। নিউজপ্রিন্ট দিয়ে রক্ত বন্ধ করার ব্যর্থ চেষ্টা করলাম আমরা। তারপর আমি সেই গুলিবিদ্ধ দেহ কাঁধে বহন করে নিকটবর্তী একটি মসজিদের অজু করার স্হানে রেখে ফিরে এলাম। আমার ফিরে আসার কারণ, সংবাদপত্র জগতে আমার প্রিয় অভিভাবকদের ফেলে কোথাও যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। প্রকৃতপক্ষে আমরা সামরিক বাহিনীর দ্বারা একরকম অবরুদ্ধই হয়েছিলাম। ২৬ তারিখের প্রতু্যষেই আরেকবার একটি মিলিটারি কনভয় হামলা চালাল ইত্তেফাক অফিসে। এদিন প্রতু্যষে মিলিটারি কনভয়ের ছোড়া গুলি থেকে সৌভাগ্যবশত আমরা তিন জন বেঁচে গেলাম। তবে এক নিরীহ হকার, যে ভোরের পত্রিকাটি সংগ্রহ করতে ইত্তেফাকে এসেছিল, তাকেই প্রাণ দিতে হলো সেই হামলায়। এর পরেই শুরু হলো আমাদের আত্মরক্ষার পরিকল্পনা। কিন্তু ইত্তেফাক ভবন থেকে বেরোনোর কোনো উপায় ছিল না। চারদিকেই মৃতু্যদূত। ক্রমান্বয়ে চা খাওয়ার সুযোগটিও সংকুচিত হতে থাকল। আমাদের এই বন্দিদশা দেখে পাশের বাড়ি থেকে বিস্কুটের টিন আর তৃষ্ণা নিবারণের জন্য একটু জল সংগ্রহ করা গেল। আমরা সবাই যখন ক্ষুন্নিবৃত্তির জন্য বসেছি, সে সময়ই নিচে থেকে একজন প্রহরী জানাল যে, একটি মিলিটারি গাড়ি থেকে কিছু জোয়ান এসে আমাদের মেশিনের ওপরে কিছু পাউডার ছিটিয়ে গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই একটি ট্যাংক এসে ইত্তেফাক অফিসের সামনে দাঁড়াল, প্রচণ্ড শব্দে গোটা দালান নড়ে উঠল। আমরা দেখলাম, চারদিকে আগুন জ্বলছে দাউ দাউ করে। বুঝলাম, এই ট্যাংক থেকেই গোলা বর্ষণ করা হয়েছে ইত্তেফাক অফিস ভস্মীভূত করার জন্য। সেই অগ্নিবলয় থেকে আত্মরক্ষার কাহিনি আজ এতকাল পরে মনে পড়লেও শিহরিত হই। সেদিন ইত্তেফাকের সেই অগ্নিকুণ্ড আমাদের ভেতরে আর এক দাবানল সৃষ্টি করেছিল। ঐ ভস্ম থেকেই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম হানাদারদের রুখবই। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, সেদিনের হামলায় ওখানে আমরা যে কজন উপস্হিত ছিলাম, তাদের মধ্যে একমাত্র আমিই এখন বেঁচে আছি। বাকি সবাই এখন প্রয়াত। এ ঘটনার পরেও ইত্তেফাক মে মাসের দিকে আবার তাদের পত্রিকা প্রকাশ আরম্ভ করে এবং গণমানুষের আস্হার প্রতিদান দিতেই থাকে, আজও তাই-ই দিয়ে যাচ্ছে।

যাই হোক, তারও আগে তত্কালীন পাকিস্তানি সামরিক স্বৈরশাসকেরা পত্রিকাটির প্রকাশনা বারংবার বন্ধ করে দিয়েছে; তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে বারংবার কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে নিক্ষেপ করা হয়েছে; সাংবাদিকদের হেনস্তা করা হয়েছে—এমন অসংখ্য অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। তথাপি আদর্শ ও জনগণের স্বার্থের প্রতি অনড় থেকেছে এবং তদানীন্তন সামরিক জান্তা ও স্বৈরাচার শাসকের রক্তচক্ষুকে তোয়াক্কা না করে নির্ভীক সাংবাদিকতার যে দৃষ্টান্ত স্হাপন করে গেছে, তা নিঃসন্দেহে ইতিহাসের এক দুর্লভ নিদর্শন। এমনকি ’৬৯-এ মানিক মিয়ার আকস্মিক প্রয়াণেও ইত্তেফাক প্রকাশনা অব্যাহত থাকে এবং বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনে সরাসরি কাজ করতে থাকে এবং নানাভাবে জনমত গড়ে তোলার কাজে নিরবচ্ছিন্নভাবে নিয়জিত রাখে। ’৭০-এর নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর দল আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয় সত্ত্বেও ক্ষমতা হস্তান্তরে পাকিস্তানিদের নানা টালবাহানা, ষড়যন্ত্র, ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ও সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের সমস্ত কর্মসূচি কাভার করে সময়েরই দাবি মেটায় গণমানুষের আস্হার প্রতিদান দিয়ে। সুতরাং, সেই সময় থেকে শুরু করে আজ অবধি সমাজ ও মানুষের দাবি মিটিয়ে ইত্তেফাক তার সুদীর্ঘ গৌরবময় সময়ই অতিবাহিত করেছে এবং আজও সেই দায়িত্বই পালন করে চলেছে বলেই আমি মনে করি। সেই স্মৃতিই আজকে আমার জন্য গৌরব ও আনন্দের স্মৃতি। আমি আনন্দিত বোধ করি এই ভেবে যে, ইতিহাসের সেই ক্রান্িতকালে আমিও ছিলাম ইত্তেফাকের একজন সহযোদ্ধা হিসেবে।

লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক জাগরণ

ইত্তেফাক/কেকে