দৈনিক ইত্তেফাকের সঙ্গে আমার সম্পর্ক শুধু সাংবাদিকতার নয়, আত্মীয়তারও। এই পত্রিকার জন্মলগ্ন থেকে আমি এর সঙ্গে জড়িত। সাংবাদিকতাও শিখেছি এই পত্রিকার সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার পায়ের কাছে বসে। তিনি আমার সাংবাদিকতার গুরু, পথপ্রদর্শক। তার স্মৃতির প্রতি আমার প্রণতি জানাই।
প্রত্যেক মানুষের জীবনে যেমন বিভিন্ন পর্যায়ে থাকে, ইত্তেফাকের জীবনেও বিভিন্ন পর্যায় রয়েছে। ইত্তেফাক শুধু একটি পত্রিকা নয়, এটি স্বাধীনতা সংগ্রামের পতাকা। প্রথমে ইত্তেফাক ছিল ব্যক্তি মালিকানায় প্রতিষ্ঠিত একটি দলীয় পত্রিকা। তফাজ্জল হোসেন অর্থাত্ আমাদের মানিক ভাইয়ের মৃতু্যর পরে পত্রিকাটি নানা পর্যায় অতিক্রম করেছে। এখন মানিক ভাইয়ের কনিষ্ঠ ছেলে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর তত্ত্বাবধানে এবং তাসমিমা হোসেনের সম্পাদনায় পত্রিকাটি নিরপেক্ষ এবং একটি প্রতিষ্ঠিত কমার্শিয়াল কাগজ হয়েছে। ইত্তেফাক ঊনসত্তর বছরে পা দিল। আমার বয়স নব্বইয়ের কাছাকাছি। ইত্তেফাকের সঙ্গে সেই কৈশোর থেকে আমি জড়িত। উপ-সম্পাদকীয় লিখতে গিয়ে মানিক ভাইয়ের বহু গালি শুনেছি। কিন্তু গালি থেকে যে শিক্ষা লাভ করেছি তার তুলনা নেই। সব চাইতে বিস্ময়ের কথা, মানিক ভাই যে মতবাদে বিশ্বাস করতেন আমরা উপ-সম্পাদকীয়তে তার বিরোধিতা করলেও তিনি তা ছাপতেন। মত বৈষম্যকে পাত্তা না দিয়ে মতের সমন্বয়কে তিনি ভালোবাসতেন। আজ তাই আমি তার শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সাংবাদিকতার এই মূল্যবোধ এখনো ধরে রাখতে পেরেছি। মানিক ভাই আমাকে স্বাধীনভাবে লিখতে দিয়েছিলেন। আজ আনোয়ার হোসেন মঞ্জুও দিচ্ছেন। এজন্য আমি গোটা ইত্তেফাক পরিবারের কাছে কৃতজ্ঞ।
প্রথম যুগের ইত্তেফাক ছিল দলীয় পত্রিকা, আওয়ামী লীগের সমর্থক। এখন পত্রিকাটি নিরপেক্ষ। কিন্তু বাংলাদেশের কোনো সমস্যা দেখা দিলে জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে সে সমস্যার বিশ্লেষণ করে পত্রিকাটি সমাধানের পথ দেখায়। এজন্য ঊনসত্তর বছর বয়সে ইত্তেফাক টিকে আছে। আমি তার ৬৮তম বয়োপূর্তি উপলক্ষ্যে ইত্তেফাককে আমার অভিনন্দন জানাচ্ছি।
ইত্তেফাকের প্রথম পর্যায় ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের। তারপর পত্রিকাটি নিয়োজিত হয় স্বাধীনতা সংগ্রামে। আমি বলব, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৬ দফা সর্ব মতের মানুষের সমর্থন পেত না যদি মানিক মিয়া তার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ৬ দফাকে সমর্থন না করতেন। তাঁর লেখাতেই ৬ দফা সারা বাংলাদেশের মানুষের অন্তর জয় করে। সেজন্য তাকে জেলে যেতে হয়। জেল থেকে অসুস্হতা নিয়ে বেরিয়ে এসে আবার ইত্তেফাক বের করেন। কিন্তু নিজের প্রাণ রক্ষা করতে পারেননি। রাওয়াল পিন্ডিতে গিয়ে আকস্মিকভাবে তিনি মারা যান। তারপরও ইত্তেফাক মানিক মিয়ার আদর্শ থেকে টলেনি। তবে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর তত্ত্বাবধানে পত্রিকাটি দলীয় গুহা থেকে বেড়িয়ে আসে। হয় নিরপেক্ষ, হয় কমার্শিয়াল। কিন্তু অন্যান্য কমার্শিয়াল পত্রিকার পথ ইত্তেফাক ধরেনি, বাংলার স্বাধীনতা আন্দোলনে, সংগ্রামে ইত্তেফাকের দানের কোনো তুলনা নেই। আমি তাই ইত্তেফাককে শুধু আওয়ামী লীগের সমর্থক পত্রিকা বলি না, বলি স্বাধীনতা সংগ্রামের বিজয় পতাকা।
দেশের এক বড় দুর্দিনে ইত্তেফাকের জন্ম। একটা প্রচার আছে, মওলানা ভাসানীর পত্রিকা মানিক মিয়া দখল করেছিলেন, প্রচারটি সত্য নয়। মওলানা ভাসানী যে ইত্তেফাক বের করেছিলেন সেটি ছিল সাপ্তাহিক। সম্পাদক ছিলেন ফজলুর রহমান খান। অফিস ছিল কারকুনবাড়ি লেনে। সেই পত্রিকার মালামালসহ স্বত্ব¾ মওলানা ভাসানীকে মানিক মিয়া ফিরিয়ে দেন। তিনি নিজ উদ্যোগে দৈনিক ইত্তেফাক প্রকাশ করেন। তাকে সাহাঘ্য করেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতো নেতা।
জন্ম থেকে ইত্তেফাক স্বাধীনতা আন্দোলনের পতাকা বহন করছে। তাই দেশে আজ হাজারো পত্রিকা থাকতে পারে কিন্তু ইত্তেফাকের অবদান তারা অতিক্রম করতে পারবে না।
স্বাধীনতা সংগ্রামে ইত্তেফাক বহু নির্যাতন সহ্য করেছে। আইয়ূব সরকার পত্রিকাটির প্রেস বাজেয়াপ্ত করেছিল। প্রায় দুই বছর কাগজটি প্রকাশিত হতে পারেনি। মানিক মিয়াকে তার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল। ১৯৬৯ সালের গণ-আন্দোলন ইত্তেফাকের দরজা খুলে দেয়। কিন্তু মানিক মিয়া আর বাঁচেননি। এই কাগজ কিছু দিন সম্পাদনা ও পরিচালনা করেছেন মানিক মিয়ার বড় ছেলে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন। তারপর আনোয়ার হোসেন মঞ্জু পত্রিকাটির সর্বময় দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একাত্তর সালে পত্রিকাটির ভবন, প্রেস পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে পত্রিকাটির পুনরুজ্জীবন ঘটান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। বলতে গেলে, মরণজয়ী ইত্তেফাক মঞ্জুরই সৃষ্টি।
আমরা যদি পৃথিবীর সংবাদপত্রের ইতিহাসের দিকে তাকাই তাহলে দেখবো— সাংবাদিকতার দুটি ধারা। একটি গণমানুষের সংগ্রাম থেকে বের হয়ে এসেছে। যেমন- সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রাভদা পত্রিকা; ইংল্যান্ডের মর্নিং স্টার। বাংলাদেশেও তেমনি এই দুই ধারার অনুবর্তনে সংবাদপত্র জগত্ গড়ে উঠেছে। একদিকে আত্মস্বার্থ নির্ভর কমার্শিয়ালিজম, অন্যদিকে জাতীয় স্বার্থ নির্ভর সাংবাদিকতা। এই বিবেচনায় ইত্তেফাক জাতীয় স্বার্থ ও স্বাধীনতা নির্ভর পত্রিকা। এই পত্রিকার সঙ্গে দীর্ঘকাল যুক্ত থাকতে পেরে নিজেকে গর্বিত মনে করি। এই পত্রিকার সঙ্গে আমার আত্মীয়তা কতটা ঘনিষ্ঠ তার একটি উদাহরণ দেব। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ইত্তেফাকে শ্রদ্ধেয় সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমেদ একটি প্রবন্ধ লেখেন। তাতে তিনি লেখেন, বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়েছে লাহোর প্রস্তাব অনুযায়ী। অর্থাত্ ভারতের দুই প্রান্েত দুটি মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের কথা ছিল, জিন্নাহ তা হতে দেননি। তারই ফল পূর্ব অংশের মুসলিম ভূখণ্ডটি বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীন হওয়া। এই মুসলিম জাতীয়তার মতবাদই পরবর্তীকালে জিয়াউর রহমান গ্রহণ করেন এবং বাংলাদেশকে দ্বিতীয় পাকিস্তান করার চেষ্টা করেন। আমি এই প্রবন্ধের প্রতিবাদ করি এবং সাহস করে প্রবীণ সাংবাদিককে জানাই বাংলাদেশ লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে জন্ম নেয়নি। তাহলে তা মুসলিম রাষ্ট্র হতো। কিন্তু গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ গোড়া থেকেই ঘোষণা করেছে, তারা সব জাতির স্বাধীন ভূমি। ভারতের বহু জাতিত্ব থেকে এই বাঙালি জাতির উদ্ভব। বাংলাদেশ তাই ধর্ম নিরপেক্ষ এবং অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র। ইত্তেফাকে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু আমার এই প্রবন্ধটি ছাপান। একই কাগজে আবুল মনসুর আহমেদের প্রবন্ধ এবং তার প্রতিবাদ ছাপা হওয়ায় সংবাদপত্র মহলে চমক সৃষ্টি হয়েছিল। ইত্তেফাকে লেখার সেই স্বাধীনতা এখনো সবার জন্য অব্যাহত আছে।
এটা বিস্ময়কর যে, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু একটি রাজনৈতিক দলের সভাপতি হয়েও সেই দলের ঢংকা তার পত্রিকায় বাজান না। পত্রিকাটি নিরপেক্ষ, তবে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও জাতীয়তাবাদে কোনো প্রকার আঘাত এলে ইত্তেফাক তা রুখে দাঁড়ায়। ইত্তেফাক আজ একটি পত্রিকা নয়, একটি ইতিহাস। স্বাধীন বাংলার ইতিহাস আর ইত্তেফাকের ইতিহাস অবিচ্ছেদ্য। এর স্খলন, পতন অনেক আছে কিন্তু পত্রিকাটি তার সব অতিক্রম করে বেঁচে আছে। এবং শুধু বেঁচে থাকা নয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে একটি অতুলনীয় স্হান দখল করে আছে। ইত্তেফাক আরো বাঁচবে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার তিনটি রক্ষকবচ আছে। এই তিনটি রক্ষাকবচ হলো রবীন্দ্রনাথ, বঙ্গবন্ধু এবং মানিক মিয়া। এই তিন জন মহামানবই আজ পৃথিবীতে নেই। কিন্তু পৃথিবীর একটি স্বাধীন দেশ এখনো তাদের নামে জেগে ওঠে, তাদের তিনটি জন্ম দিবসে। আমি সেই তীর্থ স্হানে আমার শ্রদ্ধার স্বাক্ষর শুধু রাখলাম। ইত্তেফাক চিরজীবী হোক। ইত্তেফাকে যারা কাজ করছেন নানা বিভাগে তাদের সকলের প্রতি শুভেচ্ছা জানাই। ইত্তেফাক দীর্ঘজীবী হোক।
ইত্তেফাকে যাদের সঙ্গে আমি কাজ করেছি যেমন, আহমেদুর রহমান (তৃতীয় মতের লেখক), শহিদ সিরাজুদ্দীন হোসেনসহ সকল জীবিত ও মৃত সহকর্মীকে স্মরণ করি এবং শ্রদ্ধা জানাই।
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী জন্মগ্রহণ করে ১৯৩৪ সারের ১২ ডিসেম্বর বরিশালে। তিনি ১৯৫০ সালে মেট্রিক পাস করে ঢাকা কলেজে ভর্তি হন। ১৯৫৩ সালে ইন্টামিডিয়েট পাস করে ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ অনার্স পাস করেন। ১৯৫০ সালেই তার কর্মজীবন শুরু হয়। এ সময় তিনি দৈনিক ইনসাফ পত্রিকায় কর্মজীবন শুরু করেন। দৈনিক সংবাদ, মাসিক সংবাদ হয়ে ১৯৫৬ সালে তিনি দৈনিক ইত্তেফাকে সহকারি সম্পাদক হিসাবে নিযুক্ত হন। তারপর থেকেই তার ইত্তেফাকের সঙ্গে সম্পৃক্ততা।
