জাদু দেখতে গিয়ে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন মানুষ

আপডেট : ৩১ ডিসেম্বর ২০২১, ১৮:৪০

ওষুধ বিক্রির নামে জাদু দেখিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও নানা কৌশলে সাধারণ মানুষের টাকাপয়সা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি প্রতারক চক্র। রাজধানীর লালবাগের বেড়িবাঁধ সংলগ্ন সিকশন ট্যাম্পু স্ট্যান্ড এলাকায় পসরা সাজিয়ে সর্বরোগের ওষুধ বিক্রি করার নামে বিভিন্ন কৌশলে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ আছে এই প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে। কৌতুহলেরবশে তাদের জাদু দেখতে গিয়ে বিপদে পড়ছেন বহু মানুষ।

সাধারণত নিম্ন আয়ের মানুষ ক্যানভাসারের বয়ান শুনে পটে গিয়ে এসব ওষুধ কেনেন। বেশিরভাগ ওষুধই যৌনশক্তি বর্ধক। তবে চিকিৎসকরা বলছেন, ফুটপাটের ওইসব ক্যানভাসারা আসলে সরল বিশ্বাসী মানুষদের সঙ্গে প্রতারণা করেন। 

এদিকে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এসব বিষয়ে পুলিশে অভিযোগ কিংবা কাউকে বললে বড় ক্ষতি হওয়ার ভয়ও দেখানো হয়। জানা গেছে, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও আইন-শৃঙ্খলাবাহীনিকে  ম্যানেজ করেই প্রতিনিয়ত চলছে তাদের এমন প্রতারণার কার্যক্রম। 

নাম প্রকশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী বলেন, লোকজনের ভিড় দেখে কৌতুহলেরবশে সেই জটলার মধ্যে যান তিনি। সেখানে গিয়ে দেখেন জাদু দেখানোর মাধ্যমে যৌন উত্তেজক ওষুধ বিক্রি করছেন এক ব্যাক্তি। জাদু দেখানোর একপর্যায়ে প্রতারকরা তার পাশে থাকা কয়েকজনকে হিপনোটাইজ করে ফেলে। এরপর শুরু হয় বিভিন্ন মাধ্যমে ভয়ভীতি দেখানো। কেও অজ্ঞান হয়ে যাওয়া কিংবা কারও গোপনাঙ্গ নাই হয়ে যাওয়ার মাধ্যমেই মূলত তারা ভয়ভীতি প্রদর্শন করে। এতে জটলায় থাকা আমিসহ অন্য সবার ভেতরে একটা আতঙ্ক সৃষ্টি হয়।’ এর পর সবাইকে শপথ করানো হয় যেন কেও টাকা না দিয়ে চলে না যাই। টাকা না দিয়ে গেলে তাদের সঙ্গেও এমন ঘটবে বলে ভয় দেখান হয়। এরপর আমাকে ভয় দেখিয়ে আমার হাতে কিছু অজানা ওষুধ ও কিছু গাছের ছাল বাকল ধরিয়ে দেওয়া হয়। বিনিময়ে আমার কাছ থেকে ১ হাজার টাকা নিয়ে যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রথমে তাদের প্রতারণার বিষয়টা বুঝতে পারিনি। তবে সেখানে থাকা অন্যদের মত আমার মনেও একটা অজানা আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। এতে সে সময় তারা আমাকে যা বলেছে তাই আমি করেছি। পরে আমি বুঝতে পারি আমাকে হিপনোটাইজ করা হয়েছিল। পাশাপাশি আমাকে নানা বিপদের কথা বলে আমার কাছ থেকে তারা টাকা হাতিয়ে নেয়।’ 

তিনি আইনের আশ্রয় কেন নেননি এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দেখুন আমরা সমাজে বাস করি। আমাদের লোকলজ্জার ভয় আছে। আমি সেখানে কেনো গিয়েছি সেই কারণটাই আমি এখনো বুঝে উঠতে পারিনি। লোকলজ্জার ভয়ে এবং বিষয়টা জানাজানি হলে মানুষ কি ভাববে সেই চিন্তা করেই মূলত আমি আইনের আশ্রয় নেইনি। 

প্রতারণার শিকার অন্য আরেক ভুক্তভোগী বলেন, ‘প্রথমে বুঝা যায় না এরা প্রতারক। নানা কৌশলে তারা মন-মস্তিষ্কে ভয় ধরিয়ে দেয়। ছলে-বলে পকেটে থাকা টাকা নিয়ে নেয়।’

এমন অভিযোগের ভিত্তিতে বুধবার (২৯ ডিসেম্বর) সরেজমিনে দেখা যায়, লালবাগের বেড়িবাঁধ সংলগ্ন সিকশন ট্যাম্পু স্ট্যান্ডের বিপরীত প্বার্শে জাদু দেখানো বিভিন্ন সরঞ্জাম নিয়ে পসরা সাজিয়ে বসেছে কয়েকজন। তদের ঘিড়ে রেখেছে বেশ কয়েকজন মানুষ। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ চক্রে ১৫ থেকে ২০ সদস্য রয়েছে। চক্রের মূল হোতা হাসান।  তার নিয়ন্ত্রণে কাজ করে অন্য সদস্যরা। তারা কয়েকটি ভাগে ভাগ হয়ে এ প্রতারণা কার্যক্রম করে। একদল জাদু দেখিয়ে জটলা তৈরি করে। আরেক দল জটলায় সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে থাকে। প্রথমে চক্রের দু-একজন জাদু দেখিয়ে একটি জটলা তৈরি করে। ভিড় বাড়লে অন্য এক সদস্য এসে ভীতিমূলক জাদু দেখায়। তারপরই নানাভাবে আতঙ্ক সৃষ্টি করে, কিছু অশ্লীল ছবি দেখিয়ে গোপন সমস্যা দূর করার ওষুধের নামে টাকা হাতিয়ে নেয় চক্রটি।

এ সময়য় কথা হয় চক্রের মূল হোতা হাসানের সংগে। তিনি জানান, তার এই ব্যবসা পূর্বপুরুষ ধরে করে আসছে। তার দাদাও এই ব্যবসা করতো। তার বাবাও এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিল। বংশ পরম্পড়ায় সেও এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়েছে। তার মতে, এটি কোনো প্রতারণা নয়। এটি শুধুই ব্যবসার একটি কৌশল। 

তিনি বলেন, আমি তেমন শিক্ষিত না, জন্মের পর যেদিন থেকে বুঝতে শিখেছি তখন থেকেই বাবার সঙ্গে এই ব্যবসার বিভিন্ন কৌশল শিখেছি। এখন এই কাজ করেই সংসার চালাই। এর বাইরে অন্য কোনো কাজ আমার জানা নেই। তিনি জানান, প্রশাসন কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহীনির লোকজন তেমন সমস্যা করে না। কারণ তাদের নামে কেও অভিযোগ দেয় না। তাছাড়া স্থানীয় নেতা পর্যায়ের যারা আছেন তাদের সময়মত খুশি রাখা হয়। তাই ঝামেলা হয় না।

এসব ওষুধ কোথা থেকে সংগ্রহ করেন এবং এসব ওষুধের কার্যকারিতা কেমন এমন প্রশ্নের জবাবে হাসান বলেন, বগুড়ার দিদার আয়ুর্বেদিক ও রাজধানী ঢাকার নয়া প্লটন এলাকার গ্রীন লাইফ আয়ুর্বেদিক থেকে এসব ওষুধ সংগ্রহ করেন তিনি। তবে এসব ওষুধ বিক্রি করার জন্য তার নেই কোনো বৈধ লাইসেন্স কিংবা কোনো বৈধ অনুমতিপত্র। অষুধের কার্যকারিতা সম্পর্কে তিনি বলেন, আমার তেমন কিছু জানা নাই। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ফল পাওয়া যায়। 

তিনি আরও জানান, এই এলাকায় প্রতি সপ্তাহের মঙ্গল ও বৃহস্পতিবার মেলা বসে। সেখানে বড় আকারে জম্পার ব্যবস্থা করা হয়। সেখানে অনেক মানুষের সমাগম ঘটে তাই ব্যবসাও ভালো হয়। 

নাম প্রকাশ না করে চক্রের এক সদস্য বলেন, ‘আমরা দৈনিক বেতনে হাসান ভাইয়ের অধীনে কাজ করি। আয়ের ওপর ভিত্তি করে প্রতিদিন এক থেকে দুই হাজার টাকা পাই। তিনিই পুরোটা নিয়ন্ত্রণ করেন।’ 

জানতে চাইলে এক পথচারী জানান, তিনি প্রায়ই এ ধরনের কবিরাজ দেখেন এই এলাকায়। তার মতে, এরা ভণ্ড-প্রতারক ছাড়া কিছুই না।