মহান ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে স্বাধীনতা এসেছে। মিলেছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতিও। কিন্তু আজ থেকে ৬৬ বছর আগে যে অঙ্গীকার নিয়ে আমাদের বীরসন্তানরা জীবন উত্সর্গ করেছিলেন—সেই অঙ্গীকারের কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে? এ বিষয়ে টেলিফোনে ও ই-মেইলে দেওয়া পাঠকের মতামত আজ প্রকাশ করা হলো
ভাষা আন্দোলনকে ভিত্তি করেই বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। ভাষা আন্দোলনের মূল লক্ষে সর্বস্তরে বাংলাভাষা চালু হওয়ার একটি অঙ্গীকার থাকলেও বাংলাদেশে স্বাধীনতার দীর্ঘকাল পরেও সে লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। বাংলা ভাষায় চিকিত্সাবিজ্ঞান ও বিজ্ঞান শিক্ষার প্রধান অন্তরায় হলো ওই সকল বিষয়ে বাংলায় এখনো পর্যাপ্ত অনুবাদ সম্ভব হয়নি। ভাষা আন্দোলনকে বাংলাদেশের প্রধান ভিত্তিমূল হিসাবে গণ্য করলে অবশ্যই সর্বস্তরের বাংলাভাষা ব্যবহারে সরকারকে সক্রিয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
মাখরাজ খান
সাটুরিয়া, মানিকগঞ্জ
শুধু ভাষার মাসেই বুদ্ধিজীবীদের ভাষা নিয়ে কথা বলতে শোনা যায়। ভাষার মাস ফুরিয়ে গেলে আর খোঁজ থাকে না। আবার যারা ভাষা নিয়ে বেশি চিন্তিত তাদের সন্তানদেরই তারা বিদেশে পাঠিয়ে দেয়, কেউ বা ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ায়। বাংলা ভাষার প্রতি ভালোবাসা থাকলে এমনটি হওয়ার কথা নয়। বর্তমানে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে যেসব ভাষা ব্যবহার করে নাটক করা হচ্ছে, এটাও ভাষাকে অবমাননা করা হয় বলে আমি মনে করি।
কামাল হোসাইন
জগন্ননাথদী মধুখালী, ফরিদপুর
বাংলা ভাষার জন্য আত্মত্যাগ ব্যর্থ যায়নি বলেই একুশে ফেব্রুয়ারিকে সারাবিশ্বের মানুষ আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে উচ্চারণ করে। কিন্তু উচ্চ শিক্ষার বইগুলো বাংলা ভাষায় অনূদিত না হওয়ায় আমাদের সন্তানেরা উচ্চ শিক্ষা গ্রহণে দেশে-বিদেশে হোঁচট খাচ্ছে।
মুহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ
গ্রাম: সর্দার পাড়া, মুন্সীগঞ্জ
এখন উচ্চ আদালতে ইংরেজিতে আরজি পেশ করা হয়। অনেক দোকান-পাটে এখনও ইংরেজির সাইনবোর্ড দেখা যায়। এ থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।
আবু তালেব মিয়া
ভাঙা, ফরিদপুর।
স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ একুশের অঙ্গীকারের ফসল। তাই একুশের অবিনাশী শক্তি আজও আমাদের উজ্জীবিত করে। এই অঙ্গীকার অম্লান রেখে জাতির সব ধরনের কল্যাণ ও অগ্রগতির পথে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।
অমিত বণিক
উত্তরা,ঢাকা
বাংলা আমাদের গৌরবের ভাষা, অস্তিত্বের বড় নিদর্শন। বিশ্বে এমন খুব কম জাতি আছে, যে জাতির মানুষ ভাষা রক্ষার জন্য জীবন উত্সর্গ করেছেন। কিন্তু যে ভাষার জন্য আত্মত্যাগ করেছেন বহু মানুষ, আজ সেই ভাষা ব্যবহার এবং প্রয়োগ মানুষ ঠিকভাবে করছে না। জাপানের মানুষ অন্য দেশের ভাষা শিখে না তারা তাদের ছেলেমেয়েদের নিজের দেশের ভাষা শেখায়। জাপান যদি কোনো আন্দোলন ছাড়াই নিজের ভাষাকে সম্মান দিতে পারে তাহলে আমরা কেন নয়?
সাবরিনা সুলতানা মিশু
ন্যাশনাল কলেজ অব হোম ইকোনমিক্স, ঢাকা
একুশ মানে মাথা নত না করা। বাংলাকে শুধু রাষ্ট্রভাষা নয়, শিক্ষা-সংস্কৃতির মাধ্যম করাও ছিল ভাষা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। দেশে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, কারণ বাংলা মাধ্যমে যে শিক্ষা দেওয়া যায় তাতে কার্যক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা হয় না। এর ফলে ভাষা আন্দোলনে বীর সন্তানেরা যে অঙ্গীকার নিয়ে তাদের জীবন উত্সর্গ করেছিল তার সঙ্গে আমরা প্রতারণার দায়ে অভিযুক্ত হতেই পারি।
সাদিয়া সুলতানা মাহি
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল
একুশের চেতনা অম্লান রেখে জাতির সব ধরনের কল্যাণ ও অগ্রগতির পথে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। জীবনের সর্বস্তরে বাংলা ভাষার বিস্তার ঘটাতে হবে।
মেনহাজুল ইসলাম তারেক
মুন্সিপাড়া, পার্বতীপুর, দিনাজপুর
আমাদের সমাজজীবনে একুশের অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল চেতনার আশাপ্রদ বিস্তার ঘটানো এখনো সম্ভব হয়নি বলে আমি মনে করি। বরং মৌলবাদ, জঙ্গিবাদের ক্রমবিস্তার সমাজকে অন্ধ গোঁড়ামির দিকেই ঠেলে দিচ্ছে দিন দিন। এ থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।
মোছা. বিলকিছ আক্তার
সরকারি ম্যাটস, টাঙ্গাইল
এখনও বিভিন্ন অফিস আদালতে ইংরেজি ভাষা ব্যবহারসহ উচ্চ আদালতে ইংরেজি ভাষায় রায় লেখা হয়। যারা বাংলা ভাষার জন্য জীবন দিয়েছেন, আমরা কি তাদের সঙ্গে অন্যায় করছি না? তাই সর্বক্ষেত্রে বাংলা ভাষা নিশ্চিত করা আবশ্যক।
মো. সেলিম মিয়া
সুন্দরগঞ্জ পৌরশহর, গাইবান্ধা
মাতৃভাষার সাথে বাংলার অধিকার রয়েছে। একুশের সাথে মিশে আছে বাংলাদেশ ও বাংলাভাষার সংগ্রাম ও ইতিহাস। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার ও শফিউরের রক্তেই মিলেছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা। তাই ভাষার সঠিক প্রয়োগ ও ব্যবহার করে শহীদ বীর সন্তানদের মর্যাদা দেওয়া হোক।
হোসনে আরা করিম নীলা
নারীর কথা, হাজারীবাগ, ঢাকা
সিয়েরালিয়ন বাংলা ভাষাকে তাদের সরকারি ভাষা হিসেবে ঘোষণা করেছে। আমাদের জন্য অবশ্যই গর্বের। কিন্তু বেদনার বিষয় হলো, দীর্ঘ ৬৬ বছর আগে যে অঙ্গীকারে দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানেরা প্রাণ উত্সর্গ করেছিলেন তার বাস্তবায়ন হচ্ছে না কেন? বায়ান্নর সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য আবারও কি আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে?
মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক নাছিম
রায়গঞ্জ, সিরাজগঞ্জ
তরুণ প্রজন্মের অনেকেই ঝুঁকছে নতুন নতুন ভাষা শিখতে। নতুন ভাষা শেখাটা দোষের নয়। তবে আমাদের মায়ের ভাষার প্রতিও শ্রদ্ধা রাখতে হবে।
ফেরদৌসী আরা গীতালী
‘রিক’, ধানমন্ডি, ঢাকা
বছর ঘুরে ফেব্রুয়ারি মাস এলেই ভাষা শহীদদের প্রতি লৌকিক শ্রদ্ধা নিবেদনে হিড়িক পড়ে। ৬৬ বছর পরেও প্রকৃতপক্ষে সাক্ষরতার হার ৬৬ শতাংশ ছাড়ায়নি। চালু হয়নি সর্বস্তরের বাংলাভাষা। বাঙলিশের অত্যাচারে শুদ্ধ বাংলাচর্চা ব্যাহত হচ্ছে। অথচ কবি আবদুল হাকিম মধ্যযুগেই বলেছেন ‘যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী / সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি’।
আজহারুল ইসলাম
বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি, নরসিংদী
৬৬ বছর আগে যে অঙ্গীকার নিয়ে বীর শহীদ সন্তানরা জীবন উত্সর্গ করেছিলেন তা সত্যিকার বাস্তবায়িত হয়নি। ২১ ফেব্রুয়ারির মর্মান্তুদ ঘটনার ওপর ভিত্তি করে অনেক কবি-সাহিত্যিক-গীতিকার অনেক কবিতা, গান, উপন্যাস, গল্প লিখেছেন। তাদের স্বপ্ন ছিল শোষণহীন সমাজ, ক্ষুধামুক্ত দেশ গঠন করা।
ডা. মো. জামিল রহমান
গোপালপুর, টাঙ্গাইল
১৯৫২ সালে মাতৃভাষার জন্য আন্দোলন করা কি ভুল ছিল? সেই সময় যদি ভাষার জন্য আন্দোলন বা সংগ্রাম না করা হতো, তাহলে পূর্ব পাকিস্তানে রাষ্ট্রভাষা হতো উর্দু। পূর্ব পাকিস্তানে রাষ্ট্রভাষা উর্দু হলে বাঙালিরা মাতৃভাষায় শিক্ষাগ্রহণ করতে পারত না, আরো বেশি মূর্খ হয়ে থাকত।
মাহফুজুর রহমান খান
চিনিতোলা মেলান্দহ, জামালপুর
ঐতিহাসিক দিক থেকে মূল্যায়ন করলে দেখা যায় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সূত্র ধরেই ১৯৬৬ সালে ৬ দফা এসেছে, ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থান ঘটেছে, ১৯৭০ সালের জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বাঙালিরা দেশ শাসনের সুযোগ পেয়েছে, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার লাল সূর্য ছিনিয়ে এনেছে। বর্তমানে গ্লোবালাইজেশনের কথা বলে আমাদের নতুন প্রজন্মকে ভাষা, শিক্ষা, সংস্কৃতির ভিন্ন ধারণা দিয়ে ভুল পথে পরিচালিত করার পাঁয়তারা চলছে। এই দিক দিয়ে বহু কাঠি সরস হয়ে এগিয়ে আছে ব্যক্তিমালিকানাধীন রেডিও স্টেশনগুলো, কিছু কিছু ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া এবং বেশ কিছু ব্যক্তিমালিকানাধীন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়।
ভূঁইয়া কিসলু বেগমগঞ্জী
চৌমুহনী, হাজীপুর, বেগমগঞ্জ, নোয়াখালী
সারা বিশ্বে যেখানে একুশে ফ্রেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মার্তৃভাষা দিবস হিসাবে পালিত হচ্ছে, সেখানে ৬৬ বছর পরও আমাদের বীরসন্তানদের উত্সর্গকৃত জীবনের প্রতি আমাদের সম্মানবোধ ও তাদের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের ঘাটতি প্রতিনিয়ত চোখে পড়ে। এই একটি মাসে শুধু বইমেলা এবং একুশ তারিখে শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে আমাদের দায়িত্ব শেষ করি।
মোহাম্মদ শহীদউল্যা
হক ভিলা, মেরাদিয়া, ঢাকা
আমরা কতটা ভাগ্যবান যে সালাম বরকত, রফিকের মতো বীরসন্তানদের জন্মভূমি এই বাংলাদেশ! কিন্তু যখন ‘বাংলিশ’ ভাষায় কথা বলে নিজেদের খুব বড় মনে করি, আর ভাবি যে, এটাই এখনকার ‘স্টাইল’— তখন আমরা অপমান করি আমাদের বীর শহীদদের। একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, খুব ভালো কথা। কিন্তু আমরা যেন সেই মাতৃভাষাকে ভাসিয়ে না দেই বিদেশি ভাষার সংমিশ্রণে।
সুদীপ্ত বালা (অনন)
বি.এসসি (ইইই), ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
মাতৃভাষা বাংলাকে প্রতিষ্ঠিত করা যায়নি। আমরা যেমনটি চেয়েছিলাম।
সালেহা আফরিন বেবী
শিবগঞ্জ, সিলেট
আমাদের দেশে প্রত্যেকটি আন্দোলন হয়েছে সফলতার সঙ্গে। ’৫২ এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ’৯০ এর গণআন্দোলন। কিন্তু বায়ান্নতে ভাষার জন্য যারা দিয়ে গেছে প্রাণ তাদের অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন এখনো হয়নি বলে আমরা মনে করি।
মো. ইসকান্দার আলী সাগর
কনকর্ড টাওয়ার, শান্তিনগর, ঢাকা
‘শহীদ ছেলের রক্তে রাঙা / লালচে বর্ণমালা / ওটাই মোদের বাংলা ভাষা / রক্ত দিয়ে ঢালা।’ কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হচ্ছে যে, বাংলা ভাষা এখনো সর্বস্তরে প্রবেশাধিকার পায়নি।
শিশির
পিলখানা, ঢাকা
আমাদের পূর্বপুরুষেরা রক্ত দিয়ে মাতৃভাষাকে যে মর্যাদা প্রদান করে গেছেন, আমরা যদি সেই মূল্যবোধের মর্যাদা দিতে ব্যর্থ হই তাহলে এর চেয়ে বেদনার কি আর হতে পারে?
মোঃ খায়রুল ইসলাম (ফুল)
আরাপপুর, ঝিনাইদহ
সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, নামফলক, বিজ্ঞাপন, গণমাধ্যমে ও মিশ্রভাষার ব্যবহার বন্ধ পদক্ষেপ গ্রহণে হাইকোর্টের আদেশের পর কয়েক বছর পেরিয়ে গেলেও ওই আদেশের যথাযথ বাস্তবায়ন লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। সুতরাং উল্লিখিত বিষয়সহ সর্বস্তরের বাংলা ভাষা ব্যবহার প্রচলন করতে হবে তাহলেই বীর শহীদদের সত্যিকার মর্যাদা দেওয়া হবে বলে আমরা মনে করি।
আল মায়ামী
ফুলবাড়িয়া, সাভার

