কুষ্ঠমুক্ত বাংলাদেশ

আপডেট : ৩০ জানুয়ারি ২০২২, ০২:৫৭

প্রতি বছর জানুয়ারি মাসের শেষ রোববার বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস হিসাবে পালন করা হয়। সে হিসাবে এই বছর ৩০ জানুয়ারি বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশে এই দিবসটি পালিত হবে। এই দিবসের উদ্দেশ্য হলো কুষ্ঠ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা  এবং এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সাহাঘ্য করা।  জনবিচ্ছিন্ন কুষ্ঠ আক্রান্ত ব্যক্তিদের সমাজে পুনঃগ্রহণ, সর্বপ্রকার কুষ্ঠজনিত কুসংস্কার দূরীকরণ, এই সব লক্ষ্যকে সামনে নিয়ে জনসাধারণ এবং কুষ্ঠ আক্রান্ত ব্যক্তিদের সঠিক তথ্য ও শিক্ষা প্রদান করাই হচ্ছে এই দিবসের লক্ষ্য।

এ বছর এই দিবসের প্রতিপাদ্য নিধা‌র্রণ করা হয়েছে ‘মর্যাদার জন্য একতা’। যারা কুষ্ঠ আক্রান্ত হয়েছেন তাদের মর্যাদাকে সম্মান জানানোর জন্য একতার প্রতি এই বছরের প্রতিপাদ্যে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। সুইজারল্যান্ড-ভিত্তিক কুষ্ঠ-বিরোধী সংগঠনসমূহের আন্তর্জাতিক ফেডারেশন ‘আইলেপ’, যা ১৩টি আন্তর্জাতিক এনজিওর সমন্বয়ে গঠিত, এই দিবসটি পালনে উদ্যোগ নেয়। আইলেপের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা  রাউল ফোলেরো বিশ্বব্যাপী কুষ্ঠরোগবিষয়ক ব্যাপক সচেতনতা বৃদ্ধিকল্পে ও কুষ্ঠরোগের প্রতি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য ১৯৫৪ সালে দিবসটি উদ্যাপনের জন্য উদ্যোগ নিয়েছিলেন।

কুষ্ঠ মানব ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাচীন রোগ। মানবসভ্যতার বিকাশ ও সামাজিক উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে উন্নত দেশগুলোতে এই রোগের প্রাদুর্ভাব একবারেই কমে এসেছে। কিন্তু আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কুষ্ঠরোগের প্রাদুর্ভাব এখনো রয়ে গেছে।  বর্তমানে বাংলাদেশসহ ব্রাজিল, ভারত, নেপাল, মোজাম্বিক, এঙ্গোলা, কঙ্গো এবং তানজানিয়ায় কুষ্ঠরোগাক্রান্ত ব্যক্তিরা শনাক্ত হচ্ছে। বাংলাদেশে কুষ্ঠরোগের চিকিত্সা বিনা মূল্যে করা হলেও এবং নিয়মিত চিকিত্সায় সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য রোগ হওয়া সত্ত্বেও এখনো রোগটি জনস্বাস্হ্য সমস্যারূপে রয়ে গেছে।

দ্য লেপ্রসি মিশন ইন্টারন্যাশনাল-বাংলাদেশ (টিএলএমআই-বি)-এর মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রতি বছর প্রায় ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার নতুন কুষ্ঠরোগাক্রান্ত ব্যক্তি বাংলাদেশে শনাক্ত হচ্ছে। এদের  মধ্যে প্রায় ৮-১০ শতাংশ সময়মতো চিকিত্সার অভাবে পরবতী‌র্ সময়ে পঙ্গু হয়ে যায়। প্রকটতার দিক বিবেচনা করলে বাংলাদেশের কুষ্ঠ সমস্যা বিশ্বের মধ্যে চতুর্থ। প্রতি বছর প্রায় ৩ হাজার কুষ্ঠ আক্রান্ত ব্যক্তিদের জটিলতার কারণে হাসপাতালে বিশেষায়িত চিকিত্সার প্রয়োজন হয়। সময়মতো সঠিক চিকিত্সা না পেলে আক্রান্ত ব্যক্তিরা পঙ্গুত্ব বরণ করে। এর ফলে এক দুর্বিষহ জীবনের সূত্রপাত হয়।

কুষ্ঠ সাধারণত আক্রান্ত রোগীর প্রান্িতক স্নায়ুর কার্যকারিতা নষ্ট করে। ফলে আঙুল বাঁকা হওয়া, মুখের প্যারালাইসিস, বেদনাহীন ঘা ইত্যাদি বিকলাঙ্গতা দেখা দেয় এবং রোগীর শারীরিক সমস্যার চেয়েও মানসিক ও সামাজিক সমস্যা ও বৈষম্য প্রকটরূপে দেখা দেয়।  চামড়ার অবশ দাগ দিয়ে এই রোগ শুরু হয়, অনেক সময় দানা গুটিও দেখা দেয়।  চিকিত্সকদের মতে, কুষ্ঠরোগ একটি মৃদু সংক্রামক রোগ। দুর্বল প্রতিরোধ ক্ষমতার অধিকারী মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয়। দরিদ্রতা, অপুষ্টি, অস্বাস্হ্যকর পরিবেশে বসবাস, প্রচুর আলো বাতাসের অভাব ইত্যাদি এই রোগ সংক্রমণের অন্যতম কারণ বলে মনে করা হয়।

১৮৭৩ সালে নরওয়ের চিকিত্সা বিজ্ঞানী ডা. আরমার হ্যানসেন কুষ্ঠরোগের জীবাণু ‘মাইকোব্যাকটেরিয়াম লেপ্রী’ আবিষ্কার করেন।  এই আবিষ্কারের ফলে প্রমাণিত হয় যে, কুষ্ঠ একটি ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ, জন্মগত, বংশগত বা অভিশাপের ফল নয়। হাজার হাজার বছর ধরে কুষ্ঠরোগ ও কুষ্ঠরোগাক্রান্ত ব্যক্তিগণকে অভিশপ্ত এবং অস্পৃশ্য বলে গণ্য করা হতো এবং অনেককেই দ্বীপান্তরিত, বনবাস, গৃহচু্যত করা হতো। সামাজিক ও পারিবারিক সম্পর্কগুলো শিথিল হয়ে যেত। হাজার হাজার কুষ্ঠরোগাক্রান্ত মানুষ মানবেতর জীবন যাপনে বাধ্য হতো। হাজার বছরের অন্ধবিশ্বাস আর কুসংস্কার মানুষের মনে এমন ভাবে গেঁথে আছে যে, অনেক রোগী সামাজিকতার ভয়ে যথাসময়ে চিকিত্সা নিতে দেরি করে এবং ভয়াবহতা ডেকে আনে।  বিকলাঙ্গতাই হচ্ছে কুষ্ঠজনিত সব সামাজিক ও শারীরিক সমস্যার প্রধান কারণ। তাই প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চিকিত্সায় আসা অতীব জরুরি প্রতিটি আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য। কুষ্ঠরোগ প্রাথমিকভাবে পর্যায়ে চিহ্নিত হলে ও চিকিত্সার আওতায় এলে কুষ্ঠজনিত প্রতিবন্দ্বিতা প্রতিরোধ করা সম্ভব। ব্যাপক সচেতনতা কার্যক্রম এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বাংলাদেশে কুষ্ঠ নিমূ‌র্লের ক্ষেত্রে বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে। কম গুরুত্ব দেওয়ার কারণে এই খাতে বাজেট প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম, বাজেট স্বল্পতার কারণে কুষ্ঠবিরোধী কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে রোগী খঁুজে বের করার জন্য প্রশিক্ষিত লোকবলের অভাব, এই রোগকে ঘিরে কুসংস্কার দূরীকরণের জন্য প্রয়োজনীয় সচেতনতামূলক কার্যক্রমের অভাব আছে। চিকিত্সকদের কুষ্ঠ বিষযে ধারণা কম থাকায় রোগী চিহ্নিত করা ও চিকিত্সা কাজ ব্যাহত হয়, দেশের সর্বত্র চিকিত্সা সুবিধা সমানভাবে প্রাপ্তিসাধ্য নয় এবং দেশে কুষ্ঠের কারণে বিকলাঙ্গদের পর্যাপ্ত চিকিত্সা সুবিধার অভাব।

আক্রান্ত ব্যক্তিরা সাধারণত সমাজে কুসংস্কার ও বৈষম্যের শিকার হয়ে থাকেন। এর ফলে তাদের রোগ নির্ণয়, চিকিত্সা, আরোগ্যলাভ এবং সামাজিক কার্যাবলী ব্যাহত হয়। বাজট স্বল্পতার জন্য স্বাস্হ্যকমী‌র্ ও চিকিত্সকদের দক্ষতার উন্নয়ন ঘটানো যাচ্ছে না।

আমাদের দেশে কুষ্ঠের বিশেষায়িত সেবা খুবই অপ্রতুল। কুষ্ঠরোগীদের সেবা দেওয়ার জন্য বাংলাদেশে তিনটি সরকারি কুষ্ঠ হাসপাতাল রয়েছে। কিন্তু এই হাসপাতালগুলোর পূর্ণাঙ্গ সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে।  অন্তত পক্ষে দেশের সবগুলো সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালগুলোকে কুষ্ঠ সেবা প্রদানের জন্য উপযোগী করা দরকার। এতে করে স্হানীয় লোকজন এই সেবা সহজেই নিতে পারবে।

কুষ্ঠবিষয়ক প্রায় ৮০ ভাগ স্বাস্হ্যসেবা এনজিও কর্তৃক পরিচালিত হাসপাতালগুলো দিয়ে থাকে। কিন্তু আর্থিক সমস্যার কারণে তাদের এই সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এই পরিস্হিতিতে সরকার এগিয়ে না এলে সমস্যা বাড়বে, প্রতিবন্দ্বিতা আরো বেড়ে যাবে।  কুষ্ঠসংক্রান্ত সমস্যা সমাধানের জন্য জাতীয় বাজেটে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ থাকা দরকার। বাজেটে জেলাভিত্তিক বরাদ্দ থাকা প্রয়োজন, যাতে করে সংশ্লিষ্ট জেলার সিভিল সার্জনরা নিজেদের প্রয়োজন মাফিক বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় করতে পারেন।

দেশে কুষ্ঠজনিত সব প্রতিবন্ধী লোকজনের সঠিকভাবে সামাজিক পুনর্বাসনের প্রয়োজন যেন তারা সমাজে মর্যাদার সঙ্গে বাস করতে পারে। উপযুক্ত চিকিত্সার মাধ্যমে তাদের প্রতিবন্দ্বিতা কমিয়ে কর্মক্ষম করে তোলা সম্ভব। সমস্ত ধরনের বৈষম্য ও কুসংস্কারের অবসান ঘটিয়ে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ব্যবস্হা করা দরকার। তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও ক্ষমতায়ন করা দরকার, যাতে তারা সক্রিয়ভাবে কুষ্ঠ সেবার বিষয়ে অংশ নিতে পারে। আক্রান্তদের ও তাদের পরিবারের জন্য জীবিকা অর্জনে সাহাঘ্য করা দরকার। কুষ্ঠ বিষয়ে গণমাধ্যমের ইতিবাচক বার্তা প্রচার এই রোগ নিমূ‌র্ল কার্যক্রমকে গতিশীল করতে পারে। কুষ্ঠ রোগ জীবাণু দ্বারা হয়, অভিশাপ নয়।

নিয়মিত চিকিত্সা নিয়ে এই রোগে আক্রান্তরা স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে। সমাজের প্রতিটি মানুষের জন্য সমান স্বাস্হ্যসেবা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা যাতে নিশ্চিত হয় সেজন্য প্রয়োজনীয় বার্তা প্রচার করা উচিত। কোথায় চিকিত্সা সেবা পাওয়া যায়, সে বিয়য়ে গণমাধ্যমে প্রচারিত বার্তা এই রোগ নিমূ‌র্লের  ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কুষ্ঠ বিষয়টা যেন গুরুত্ব পায়, সে বিষয়েও গণমাধ্যমের জোরালো ভূমিকা থাকা উচিত। আমাদের একযোগে অসহায়, দরিদ্র, নিপীড়িত কুষ্ঠরোগাক্রান্ত মানুষগুলোর জন্য কাজ করতে হবে। কারণ এতগুলো মানুষকে বঞ্চিত রেখে সার্বিকভাবে বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। কুষ্ঠরোগাক্রান্ত প্রতিবন্ধী মানুষগুলোর পুনর্বাসন এবং সঠিক যত্নের জন্য তাদের পাশে দাঁড়ানো একান্ত প্রয়োজন, যেন আক্রান্ত ব্যক্তিরা পরিপূর্ণ মর্যাদা ও অধিকারের সঙ্গে সমাজে মাথা উঁচু করে চলতে পারেন।  

কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত ব্যক্তি ও প্রতিবন্ধীরা দেশের বোঝা নয়, তাদেরও রয়েছে সব নাগরিক সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার অধিকার। আমাদের জাতীয় সংবিধানে প্রতিটি নাগরিকের সমান সুবিধা নিশ্চিত করে। তাই কোনো নাগরিকের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়। অধিকারকর্মীরা মনে করেন, প্রধানমন্ত্রীর কুষ্ঠমুক্ত দেশ গঠনের সাম্প্রতিক ঘোষণা বাস্তবায়নের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। আসুন, আক্রান্ত ব্যক্তিগণের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাই একত্রে কাজ করি এবং ভবিষ্যত্ বাংলাদেশকে একটি কুষ্ঠমুক্ত দেশ হিসেবে পৃথিবীর মানচিত্রে প্রতিষ্ঠা করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হই।

লেখক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক 

ইত্তেফাক/এসজেড