উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর দুরবস্থা

আপডেট : ১৮ এপ্রিল ২০২২, ০৯:২৫

১৯৭২ সাল থেকে উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রথম ডাক্তার নিয়োগসহ অন্যান্য সরঞ্জাম দিয়ে সজ্জিত করা হয়। চিকিত্সকসহ সেবাদানকারীর বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হয় সেখানে। প্রথম দিকে ডাক্তাররা গ্রামে যেতে অনীহা প্রকাশ করলেও স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ে প্রথম ব্যাচের ডাক্তারদের উপজেলায় যোগদানের মাধ্যমেই উপজেলা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার যাত্রা শুরু। গ্রামাঞ্চল ও পৌরসভার মানুষের চিকিত্সাসেবা পাওয়ার একটি উল্লেখযোগ্য স্থান হচ্ছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। বলে রাখা ভালো, চিকিত্সাসেবা পাওয়া নাগরিকের অন্যতম একটি মৌলিক অধিকার। তাই সরকার যথাযথ চিকিত্সাসেবা প্রদানের লক্ষ্যে গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা, পৌরসভা, জেলা ও সিটি করপোরেশন পর্যায়ে বিভিন্ন ক্লিনিক, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও হাসপাতাল গড়ে তুলেছে।

বিশেষ করে মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের চিকিত্সাসেবা নেওয়ার অন্যতম ভরসা হচ্ছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। কারণ তাদের পর্যাপ্ত টাকা না থাকায় চিকিত্সাসেবা নেওয়ার জন্য বেসরকারি ক্লিনিকে যাওয়া দুঃসাধ্য ব্যাপার। তাই এই মানুষগুলো কম খরচে ভালো চিকিত্সাসেবা পাওয়ার জন্যই আসে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। সরকার জনগণকে সুলভ মূল্যে চিকিত্সাসেবা প্রদানের জন্য এসব কমপ্লেক্স গড়ে তুলেছে।

দুঃখজনক হলেও সত্য, আজকাল এসব স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পর্যাপ্ত চিকিত্সা সেবার ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। বহির্বিভাগে ডাক্তার দেখানোর জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে রোগীকে স্লিপ নিতে শুরু হয় দুর্ভোগ। তারপর, পর্যাপ্ত সংখ্যক ডাক্তার না থাকা এবং ডাক্তাররা ঠিক সময়ে চেম্বারে না আসায় রোগীকে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হয়। যার দরুন রোগী আরো অসুস্হ হয়ে পড়েন। এ ছাড়া ডাক্তারদের নিয়েও রয়েছে রোগীদের নানা অভিযোগ, ডাক্তাররা রোগী ভালো করে দেখেন না, রোগীর কথাগুলো ভালোভাবে শোনেন না ও গতানুগতিক ওষুধ (প্যারাসিটামল, এন্টাসিড ইত্যাদি) লিখে দিয়ে তাদের দায় সারে। এমনও অভিযোগ আছে যে, তারা রোগীদের কাছ থেকে আবারও বাড়তি টাকা নেন, যেসব রোগী ভিজিট দেন, তাদের ভালোভাবে দেখেন আর যারা দেন না, তাদের দায়সারা সেবা দিয়ে বিদায় করেন। এ যেন অফিস টাইমে প্রাইভেট ক্লিনিকে রোগী দেখার মতো অবস্থা।

অনেক ডাক্তার এসব স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়োগ পাবার পরও এখানে আসতে চান না। কেন এই অনীহা? তারা বিভিন্ন প্রাইভেট ক্লিনিকে রোগী দেখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। বিভিন্ন বিভাগে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। ওয়ার্ডগুলোতে ডাক্তার নার্সরা আসেন না বললেই চলে। ডাক্তারের লিখে দেওয়া ওষুধ নেওয়ার জন্যও আবার দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হয়। এ যেন মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা। আবার অনেক সময় লাইনে দাঁড়িয়েও পর্যাপ্ত পরিমাণ ওষুধ পান না। কারণ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পর্যাপ্ত ওষুধ থাকে না। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, প্রতি বছর স্বাস্থ্যখাতে গৃহীত বাজেটের এক অংশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বরাদ্দ করা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত ওষুধ না পাওয়ার পিছনে কারণ কি? কেন রোগীকে বাধ্য হয়ে বাইরের ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনতে হবে? এছাড়াও অনেক স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জরুরি বিভাগে জনবল সংকট খুবই প্রকট। তাই অনেক রোগী জরুরি সেবা থেকে বঞ্চিত হন। অধিকন্তু, অপারেশন থিয়েটারগুলোতেও অস্ত্রোপচার হয় না বললেই চলে। এতে রোগীকে বাধ্য হয়ে জেলা বা বিভাগীয় হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়। ফলে রোগীর অবস্থা আরো খারাপ হয়ে যায়। এক্সরে, আলট্রাসনোগ্রাফির মতো চিকিত্সা সরঞ্জামের সুবিধা একেবারে নেই। তাই রোগীকে বাইর থেকে এক্সরে, আলট্রাসনোগ্রাফি করার জন্য অনেক বেশি টাকা গুনতে হয়। তাছাড়া প্রায় অধিকাংশ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পর্যাপ্ত পরিমাণ অ্যাম্বুলেন্স নেই। টয়লেটগুলোর অবস্থাও খুব শোচনীয়। টয়লেটগুলোতে নেই বিদু্যতের ব্যবস্থা। উল্লিখিত নানাবিধ সমস্যা ও অব্যবস্থাপনার কারণে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর সেবার মান বলতে গেলে শূন্যের কোটায়।

সৃষ্ট সমস্যা সমাধানকল্পে প্রয়োজন প্রথমত, প্রতিটি উপজেলায় যে স্বাস্থ্য কমিটি আছে তার দায়িত্ব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিত্সা সেবার মানোন্নয়ন করা ও জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা; এ ব্যাপারে উদ্যোগী হয়ে উচ্চতর কর্তৃপক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা আনয়ন করা। দ্বিতীয়ত, স্বাস্থ্য কমিটি নিয়মিত স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ব্যবস্থাপনার ওপর রিপোর্টও তৈরি করা, যেখানে জনগণেরও বক্তব্য থাকবে, বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানদের। এক্ষেত্রে, সরকার বা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উচিত এ কমিটির রিপোর্ট বিবেচনায় নিয়ে প্রতিটি উপজেলায় প্রয়োজনীয় কাঠামোগত উন্নয়ন, প্রয়োজনীয় উপকরণ, ওষুধ ও অন্যান্য সরঞ্জাম যথাসময়ে জোগান দেওয়া নিশ্চিত করা। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আগামী পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে শক্তিশালী ও কার্যকর সেবাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে গণমুখী করতে হলে উপজেলা স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে যতখানি সম্ভব স্ব-শাসিত করতে হবে, যাতে তারা প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং তাদের দায়িত্বগুলো চিহ্নিত করে জেলা সিভিল সার্জনের কাছে দায়বদ্ধ করা উচিত। এভাবে যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে যাবতীয় অব্যবস্থাপনা ও সমস্যা দূর করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিত্সা সেবার মানোন্নয়ন করে জনগণের অন্যতম মৌলিক অধিকার চিকিত্সাসেবা নিশ্চিত করা এবং রোগীদের দুর্ভোগ দূর করা।

লেখক: শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন