অনেক ঢাকঢোল পিটিয়ে ২০১২ সালে নতুন ভ্যাট আইন পাশ করা হয়। আগামী বছরের জুলাই থেকে এটি কার্যকর করার কথা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবায়নের সময় ঘনিয়ে আসতেই ব্যবসায়ীদের তীব্র বিরোধিতায় অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে নতুন এ আইনের বাস্তবায়ন। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে ১০০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণচুক্তির অন্যতম শর্ত ছিল নতুন ভ্যাট আইন পাশ ও তা কার্যকর করা। ইতিমধ্যে ওই ঋণের বেশির ভাগ অর্থ ছাড়ও হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আইনটির কার্যকর বাস্তবায়ন নিয়ে উভয় সংকটে রয়েছে সরকার। কারণ ব্যবসায়ীদের সমর্থন ছাড়া ভ্যাট আইনের বাস্তবায়ন কঠিন। উদ্ভূুত পরিস্থিতিতে আগামীকাল বুধবার আইনটি নিয়ে ব্যবসায়ীদের সাথে বসছে রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এ সেমিনারে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণায়ের মন্ত্রীরা উপস্থিত থাকবেন। এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, আজকের সেমিনারে নতুন আইনের প্রেক্ষাপট ও যৌক্তিকতা তুলে ধরবে এনবিআর। অন্যদিকে এফবিসিসিআইয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নতুন আইনের স্থলে বিদ্যমান আইনটিকে সংস্কার ও যুযোপযোগী করে তা বাস্তবায়নের দাবি জানাবেন ব্যবসায়ীরা। নতুন আইনের প্রয়োজন রয়েছে কি না, প্রয়োজনে তা নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে জরিপ করারও দাবি জানাবেন তারা।
নতুন আইন বাস্তবায়নের বিরোধিতা করে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই অর্থমন্ত্রীকে গত ২১ জুলাই একটি চিঠি পাঠিয়েছিল। ওই চিঠিতে এফবিসিসিআই সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদ নতুন ভ্যাট আইনের তীব্র বিরোধিতা করে বলেন, ১৯৯১ সালের ভ্যাট আইনে ব্যবসায়ী তথা করদাতাদের অভ্যস্ত হতে ২৩ বছর সময় লেগেছে। করদাতাগণ এখন ভ্যাট প্রদানে অভ্যস্ত হয়েছে। ঠিক সেই মুহুর্তে ‘হঠাত্’ করে নতুন ভ্যাট আইন কোন ভাবেই বাস্তবসম্মত নয়। এর পরই ভ্যাট আইন নিয়ে ব্যবসায়ীদের সাথে আরো আলোচনার আগ্রহ প্রকাশ করেন অর্থমন্ত্রী।
তবে এফবিসিসিআইয়ের হঠাত্ এই অনড় অবস্থানে অস্বস্তিতে পড়েছেন খোদ অর্থমন্ত্রী। এফবিসিসিআইয়ের এই অবস্থানকে দু:খজনক আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, সংগঠনটি বড় দেরিতে এই মতামত উপস্থাপন করল। ওই চিঠির মন্তব্যে তিনি বলেন, ভ্যাট আইনের সংস্কার হবে - এই ঘোষনা ২০০৯ সাল থেকে। পাঁচ বছর পর কি এফবিসিসিআই ঘুম থেকে উঠল? তিনি দাবি করেন, নতুন ভ্যাট আইনের শর্ত আইএমএফ দেয় নি। আমরা ঘোষনা করি যে, ভ্যাট আইনের সংস্কার করব। এবং তা শুরু করি আইএমএফের এই কর্মসূচী শুরুর আগেই।
ব্যবসায়ীদের দাবি, নতুন আইনে বাছবিচারহীনভাবে সব ধরণের পন্য ও সেবাকে ভ্যাটের আনা হয়েছে। নতুন আইন অনুযায়ী, সঙ্কুচিত ভিত্তিমূল্য তুলে দিয়ে সব ধরণের পণ্যে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আদায় করা হবে। এছাড়া ব্যবসায়ীদের শায়েস্তা করার জন্য ভ্যাট কর্মকর্তাদের হাতে অবাধ ক্ষমতা দিয়ে দেয়া হচ্ছে।
তবে ব্যবসায়ীদের এ অভিযোগের জবাব দিতে এনবিআরের পক্ষ থেকে একটি বক্তব্য তৈরি করা হয়েছে। আজকের সেমিনারে তা তুলে ধরা হবে। এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, নতুন আইনে ক্ষুদ্র ব্যবসায়কে ভ্যাটের আওতা বহির্ভূত রাখা হয়েছে। এছাড়া ২৪ লাখ টাকা পর্যন্ত বার্ষিক টার্নওভার (লেনদেন) বিশিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ভ্যাটের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। যাদের বার্ষিক টার্নওভার ২৪ লাখ টাকা থেকে ৮০ লাখ টাকার মধ্যে তাদের ক্ষেত্রে ৩ শতাংশ হারে টার্নওভার কর প্রয়োজ্য। ৮০ লাখ টাকার অধিক টার্নওভার বিশিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ভ্যাট প্রযোজ্য। অন্যদিকে কর্মকর্তাদের ক্ষমতা বাড়ানো হয় নি। বরং ব্যবসায়ে স্বচ্ছতা আনার মাধ্যমে নতুন ভ্যাট আইনে কর্মকর্তাদের ক্ষমতা কমবে। একটি প্রতিষ্ঠান একবারই নিরীক্ষা করা হবে। এছাড়া সব স্তরের ব্যবসায়ীর জন্য লেভেল প্লেইং ফিল্ড তৈরি করা, কর ও করদাতাবান্ধব পরিবেশ তৈরি হবে এবং ব্যবসায়ের খরচ কমবে। আজ এনবিআরের বক্তব্যে এসব বিষয়ে বিশেষভাবে আলোকপাত করা হবে।
ব্যবসায়ীদের দাবি, নতুন আইন প্রণয়নে তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। তারা মনে করেন, ভ্যাট ব্যবস্থার মূল বিষয় হচ্ছে উপকরণ কর রেয়াত ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণে ব্যবসায়ীদের পরামর্শে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ট্যারিফ ভ্যালু এবং সংকূচিত মূল্য ভিত্তি নির্ধারণ করা হয়েছে যা পর্যায়ক্রমে অপসারণ করা যেতে পারে। এজন্যে ১৯৯১ সালে প্রণীত সফল আইনটি বাতিল করা গ্রহনযোগ্য নয়।
নতুন আইনে ভ্যাট আদায়ের পরিধি ব্যাপকতর করা হয়েছে। এ আইনে আমদানি, উত্পাদন, ব্যবসায়ী পর্যায় এবং সেবার উপর ছাড়াও স্থাবর সম্পত্তি, লীজ, গ্রান্ট, লাইসেন্স, পারমিট, রাইট, ফ্যাসিলিটি ইত্যাদির উপর ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। ফলে ভ্যাটের ভিত্তি সমপ্রসারিত হয়েছে। এফবিসিসিআই মনে করে, ভ্যাটের ভিত্তি সম্প্রসারণ করার জন্য নতুন করে আইনের প্রয়োজন নেই। বর্তমান আইনে এই ধারা অন্তর্ভুক্ত করলেই ভ্যাটের ভিত্তি সম্প্রসারিত হয়ে যাবে। এ ছাড়াও যে সব সংস্কার
আনার লক্ষ্যে নতুন আইন করা হয়েছে এর সঙ্গে একমত নয় ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন। এফবিসিসিআই মনে করে, বিদ্যমান
আইনে এসব ধারা যুক্ত করেও চলমান আইনটি রাখা যায়।
নতুন ভ্যাট আইনের আওতায় এনবিআর অটোমেশন কার্যক্রম শুরু করেছে। এই অটোমেশনের সাথে কোন পর্যায়ে বেরসরকারী খাতকে অন্তর্ভুক্ত
করা হয়নি বলেও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ। তাদের অভিযোগ, উদ্দেশ্যমূলকভাবে ভ্যাট অটোমেশনে বেসরকারি খাতকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে।
ইঅ/চৌফে/শ৬৭৪
