বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফরাস উদ্দিন বলেছেন, বাংলাদেশ ব্যাংককে সমপ্রসারণমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করতে হবে। সংকোনচমূলক মুদ্রানীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি হতে পারে। কিন্তু আাামাদের জন্য ৬, ৭, ৮ শতাংশ মূল্যস্ফীতি কোন ব্যপার না। প্রবৃদ্ধি করতে গেলে মূল্যস্ফীতি হবেই। সরকার বাজেটে ৭.৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, এটিকে যদি কমিয়ে ৬.২ কেউ লক্ষ্য নির্ধারণ করে তা রাষ্ট্রদ্রোহীতা বলে তিনি উল্লেখ করেন।
৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন উপলক্ষে আজ বৃহস্পতিবার এনইসি সম্মেলনকক্ষে অর্থনীতিবিদ ও বিশ্বদ্যািলয়ের প্রতিনিধিদের সাথে মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। পরিকল্পনা বিভাগের সচিব ভূঁইয়া সফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পণামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন জিইসি সদস্য ড. শামসুল আলম।
মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে ড. ফরাস উদ্দিন বলেন, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল মিথ্যা তথ্য দেয়, দুর্নীতির বিভ্রান্তিকর তথ্য দেয়। তারা যে সূচকের উপর ভিত্তিকরে বিভিন্ন দেশকে দুর্নীতিগ্রস্থ বলে তা সঠিক নয় বলে তিনি মনে করেন।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সংজ্ঞানুযায়ী যারা সপ্তাহে অন্তত এক ঘন্টা কাজ করে তারা বেকার নয়। ড. ফরাসউদ্দিন বলেন আইএলওর সংজ্ঞানুযায়ী দেশের বেকারত্ত্ব মাত্র সাড়ে ৪ শতাংশ, এটা বড় মুর্খতা ছাড়া আর কিছুই নয়। অন্যদিকে মান নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিএসটিআই জড়াজীর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিএসটিআইর বক্তব্য কেউ বিশ্বাস করে না। মধ্যম আয়ের দেশ হবার বিষয়টি রাজনীতিবিদদের জন্য একটি ভালো স্লোগান হতে পারে কিন্তু মাথাপিছু আয়ের ভিত্তিতে নয়, এটি নির্ধারণ করতে হবে মানব উন্নয়ন সূচকের মাধ্যমে।
রেমিট্যান্স বাড়ানোর ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত নার্স তৈরি করে বিদেশে পাঠানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, প্রয়োজনীয় সংখ্যক নার্স ইউরোপসহ উন্নত দেশগুলোতে পাঠানো হলে দেশ বছরে ৫ বিলিয়ন ডলারের মত আয় করবে। তিনি কর্মসংস্থান তৈরিতে সরকারের অন্যতম প্রধান কাজ আখ্যায়িত করে বলেন, দেশে মোট নিয়োজিত শ্রমের ৩৬ থেকে ৩৭ ভাগই প্রকৃতঅর্থে ‘আন্ডার এমপ্লয়মেন্ট’। কাজেই বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে মান সম্মত কর্মসংস্থানে নিয়োজিত করতে পারলে উত্পাদন বাড়বে যা জিডিপিকে বাড়াবে। শিক্ষার মানোন্নয়নে বরাদ্দ বেশি দিতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে জিডিপি’র ২.৪ শতাংশ শিক্ষা খাতে ব্যয় করা হয় যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের প্রতি গুরুত্বারোপ করে বলেন, স্বৈরশাসনের সময় একটি ভালো কাজ হয়েছিল ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, যা পরবর্তী দুই প্রধান রাজনৈতিক দল বাতিল করেছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তাফিজুর রহমান ৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাকে একটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দলিল উল্লেখ করে বলেন, আমরা অনেক কিছু অর্জন করলেও প্রকৃতঅর্থে আমাদের আকাঙ্ক্ষার জায়গাগুলোতে ফাঁক থেকে যাচ্ছে। এ জন্য সুশাসনের খুব প্রয়োজন। শুধু সুশাসন থাকলে বর্তমান বরাদ্দের মাধ্যমেই আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি আরো দুই শতাংশ বাড়াতে পারতাম। তিনি জানান, আমরা যদি শোয়া ডলারের হিসেব না করে দুই ডলারের নিচে আয় করে এমন দরিদ্র্য হিসেব করি তা হলে দরিদ্র্যের হার ২৫ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৬০ শতাংশ হয়ে যাবে। বাংলাদেশ ভৌগলিক দিক থেকে যেহেতু ভারত, চীন ও জাপান এই তিন বড় অর্থনীতির মাঝে অবস্থিত তাই সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে বাস্তবায়ন করা গেলে অর্থনৈতিক ভাবে এর সুফল অনেক বলেও তিনি মত দেন। এ ক্ষেত্রে আঞ্চলিক সহযোগিতা গড়ে তুলার উপর তিনি গুরুত্ব দেন।
সরকারি গবেষণা সংস্থা বিআইডিএসর ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক রুশিদান ইসলাম বলেন, সত্যিকারভাবে নিবিড় উন্নয়নের জন্য সামাজিক সুরক্ষা খাতকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। সেই সাথে অর্থনৈতিক অসমতা যাতে প্রবৃদ্ধি বাড়ার সাথে সাথে বেড়ে না যায় সেদিকে নজর রাখতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, আমাদের দেশে আনুষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থান কমে যাচ্ছে, অনানুষ্ঠানিক যেমন গৃহস্থালী এরকম খাতে কর্মসংস্থান বাড়ছে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক শহীদুল্লাহ শিকদার বলেন, অর্থনৈতিক উন্নয়নে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদেরও সম্পৃক্ত করতে হবে। তাদের সহায়তা দিতে হবে। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিত্সার জন্য বিশেষ বরাদ্দ প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পিআরআই এর নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর সভায় সেবা খাতকে রপ্তানিমুখী করার উপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, দক্ষিণ-দক্ষিণ সম্পর্ক নিয়ে কোন অগ্রগতি নেই। এর কোন ভবিষ্যত্ও নেই। আমাদের এখন চীন-জাপান অর্থাত্ পূর্বমূখী হতে হবে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক গৌর গোবিন্দ গোস্বামী সমুদ্র সম্পদ নিয়ে স্পষ্ট রূপরেখা ৭ম পঞ্চ বার্ষিক পরিকল্পনায় থাকতে হবে বলে মত দেন।
পরিকল্পনা মন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, এবারের ৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় সমাজের সবস্তরের প্রতিনিধিদের মতামত প্রতিফলিত হবে। ধারাবাহিকভাবে সমাজের সবস্তরের প্রতিনিধিদের সাথেই মত বিনিময় সভায় আয়োজন করা হবে। এদের সবার সুনির্দিষ্ট মতামতের ভিত্তিতেই এবারের ৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা তৈরি করা হবে।
ইঅ/চৌফে/শ৬৪৬
