জাপানের কাছে ৮ গোলে হেরে হতাশায় বাংলাদেশের হকি খেলোয়াড় কোচ কর্মকর্তাদের মুখে শব্দ ছিল না। দলের পাকিস্তানী কোচ নাভিদ আলমও রুমের ভেতের বসে ছিলেন। ওদিকে সংবাদ সম্মেলনের কক্ষে বাংলাদেশ কোচের অপেক্ষায় সাংবাদিকরা। জাপানের কোচ এসে সম্মেলেন কক্ষে দাঁড়িয়ে আছেন। বাংলাদেশের পরই জাপান কথা বলবে। নাভিদ আলম আসছেন না বলে জাপানের কোচ কিউনউক ক্যাংকে সংবাদ মাধ্যমের সাথে কথা বলার অনুরোধ করলেন গেমস হকির অফিসিয়ালরা। তখনও বাংলাদেশ দলের ড্রেসিং রুমের বাইরে মালয়েশিয়ার খেলোয়াড়রা দাঁড়িয়ে, তারা ভেতরে ঢুকবেন। ম্যাচের প্রস্তুতি নিবেন। কথাটা বাংলাদেশ হকি দলকে জানানোর পর তারা ড্রেসিং রুম থেকে বেরিয়ে আসেন। কোচ আসলেন সংবাদ সম্মেলনে আর খেলোয়াড়রা গেলেন গ্যালারিতে। সবাই যেন ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়লেন। পূর্ব পাশের গ্যালারিতে হাসান জুবায়ের নিলয়, তার ক্ষানিকটা দুরে পুস্কার খিসা মিমো, তারই পাশে আরো দুজন খেলোয়াড় তোয়ালে দিয়ে মুখ ঢেকে বসে ছিলেন। পশ্চিম পাশে অন্য খেলোয়াড়রাও যেন একই অবস্থায়। কারো মুখে কথা নেই। মাঠের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। ‘এ’ গ্রুপে আজ মালয়েশিয়ার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের দ্বিতীয় ম্যাচ।
এশিয়ান গেমস হকির উদ্বোধনী ম্যাচে খেলতে নেমে জাপানের কাছে ৮-০ গোলে হারবে বাংলাদেশ, এটা যেন খেলোয়াড়রা কল্পনাও করতে পারেননি। হারবে সেটা আগেই আশংকা ছিল। কিন্তু কেন এই ব্যবধান। পাকিস্তানী কোচ সংবাদসম্মেলনে এসে কোনো রাকঢাক না করে দুঃক্ষ প্রকাশ করেছেন। বলেছেন, চার পাঁচ গোলে হারতে পারি। কিন্তু ৮ গোলে হারাটা ঠিক হয়নি।’ শুধু আট গোলই না। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে হ্যাটট্রিক করেছেন ফরোয়ার্ড কেন্তা তানাকা। হকির নতুন নিয়ম অনুসারে চার কোয়ার্টারের প্রথম পর্বে ২-০, দ্বিতীয় কোয়ার্টারে ১-০, তৃতীয় কোয়ার্টার ২-০ এবং শেষ কোয়ার্টারে ৩-০ হয়। শেষ দুই কোয়ার্টারে হ্যাটট্রিক হয়। একটা সময় গেম ভিলেজে ফেরার পথে টিম বাসে খেলোয়াড়দের মধ্যে আলোচনায় উঠে আসলো জাহিদের মতো গোলকিপার নেই। রক্ষনে চন্দন নেই। আক্রমনে জিমি নেই। জুনিয়র খেলোয়াড়রা তখন চোখ বন্ধ, মাথা নিচু করে বসে। গত এশিয়ান গেমস হকিতে জাপানের কাছে ৩-১ এবং মালয়েশিয়ায় এশিয়া কাপে ৫-১ গোলে হারে বাংলাদেশ। অথচ ১৯৮৫ সালে ঢাকায় এশিয়া কাপ হকিতে বাংলাদেশ ১-১ গোলে ড্র করেছিল জাপানের বিরুদ্ধে।
গেমস হকির আগে পাকিস্তানী কোচ তার দল নিয়ে যেভাবে গলা ফাটিয়ে ছিলেন তার বিন্দুমাত্র ভালো খেলা দেখাতে পারেনি বাংলাদেশ। দলের ১১ জন খেলোয়াড়রাই মাত্র এশিয়ান গেমস প্রথম বার খেলতে এসেছে। অভিজ্ঞ খেলোয়াড় বলতে অধিনায়ক চয়ন, মিমো, নিলয়, কৃষ্ণা, তাপষ। কোচ নাভিদ আলম বলেছিলেন তার ছেলেদের আতœবিশ্বাস আছে।স আর চার কোয়ার্টারে খেলা হগলে সেটা বাংলাদেশের জন্য ভালো হবে। কিন্তু কাল ম্যাচে নেমে নতুনদের যেন পা কাপছিল। ১৫ মিনিট করে চার কোয়ার্টারে ৬০ মিনিটের ম্যাচে কোনো কিছুই করতে পারেনি শিটুল, ফরহাদ, ইরফানুল, মিলনরা। চার কোয়ার্টার পেয়ে সিনিয়র সাথে তাল মিলিয়ে খেলার কোনো সুযোগই পাননি। জাপান ৮ গোল করেছে ঠিকই। তবে তাদের খেলায় আত্মসমপর্ন হওয়ার মতো কিছু ছিল না। যা দেখে বাংলাদেশের ছেলেরা পাহাড়ের নিচে চাপা পড়তে পারে। জাপানকে যেন বাংলাদেশেই জায়গা করে দিয়েছে। আর তারা আক্রমন করে গেছে। এতো দিন প্রশিক্ষন নিয়ে কি উন্নতি হলো তা নিয়ে প্রশ্ন উঠলো মাঠে। অধিনায়ক মামুনুর রহমান চয়ন বললেন, অনেক অনেকের এশিয়ান গেমস হকিতে খেলার অভিজ্ঞতা নেই। এতো নতুন খেলোয়াড় নিয়ে খেলা যায় ? আমাদের তো একেবারে জুনিয়র টিম।’
কোচ নাভিদ আলম বললেন, আমি কখনও জাপানের বিরুদ্ধে জিতবো বলিনি। আমি চেয়েছিলাম জাপানের বিরুদ্ধে কেলে খেরোয়াড়রা উজ্জীবিত হবেন। সেটা হয়নি। আর তা ছাড়া আমরা ১৫ মিনেট তিন গোল হজম করার পর নতুন ছেলেরা মানিয়ে নিতে পারেনি।’ তবে ৮ গোলের হারটাকে নাভিদ আলম বিপর্যয় বলতে নারাজ। বাংলাদেশের দুরাবস্থা দেখে জাপানের কোচ কিউনউক ক্যাং বলেছেন, আমি এতো সহজ ম্যাচ হবে ভাবিনি। বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের শারীরিক সক্ষমতার অভাব এবং টেকনিক্যাল সমস্যা রয়েছে।’ টেকনিক্যাল সমস্যার কথা উঠলে সেটি নাবিদ আলমের উপর বর্তায়। তবে জাপানী কোচের কথার সাথে একমত না নাভিদ আলম। তিনি বলেছেন এটা জাপানী কোচের অভিমত। আমি বলবো ৩ গোল হজম করার পর দল আর দাঁড়াতে পারেনি।’
গোলকিপার অসীম গোপ কাল ছিলেন সুপার ফ্লপ। এবার প্রথম এশিয়ান গেমস হকিতে খেলছেন। মাঠে তার মুভমেন্ট ছিল না। কোনো ফুট ওয়ার্ক নেই। গোলের পর গোল হজম করে যাচ্ছেন তারপরও নাভিদ আলমের প্রতিকার নেই। ৮ গোল হজম করার পর ম্যাচের চার মিনিট বাকি থাকতে গোলকিপার অসীম গোপকে তুলে নিয়ে নামালেন নিপ্পনকে। তিনি ঝড়ের মধ্যে নেমে ভালোই সামাল দিয়েছেন। গোল করতে দেননি জাপানকে। নাভিদ আলম বললেন, অসীম তো ওয়ার্ল্ড হকি লিগ ভালো খেলেছিল বলেই আমি ওকে মাঠে রেখে ছিলাম। তা ছাড়া নিপ্পন আরো নুতন গোলকিপার আমি ঝুঁকি নিতে চাইনি।’ কেন এমন হলো ? অসীম গোপের কাছে জানতে চাইলে কথা বলতে পারছিলেন না তিনি। একজন খেলোয়াড় জানালেন, আমাদের দলটা একেবারেই তরুন। তার উপর ২২ ঘন্টা ব্যাংককে ট্রানজিট ছিল। কোরিয়ায় এসে কোনো খেলোয়াড়ের ঘুম হয়নি ভ্রমন ক্লান্তি কাটেনি। এটাও একটা বড় সমস্যা ছিল ম্যাচে, যেকারনে ম্যাচে ইনজুরি হয়েছে একাধিক খেলোয়াড়ের। কৃষ্ণা, তাপষ, কৌশিক, মিলন, খোরশেদের মাসলে টান লেগেছে বলে জানা গেছে। আজ খেলতে পারবেন কিনা আশংকা রয়েছে।
কাল একই মাঠে বাংলাদেশর গ্রুপের অন্য খেলায় মালয়েশিয়া ৮-২ গোলে সিঙ্গাপুরকে হারায়।
