কচুরিপানায় বাহারি হস্তশিল্প

আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০১৪, ১০:৪২
দেশে ডোবা ও মজাপুকুরের অতি সাধারণ কচুরিপানা থেকে তৈরি হচ্ছে বাহারি হস্তশিল্প। প্রথমে কচুরিপানা থেকে কাগজ তৈরি করে পরে সেই কাগজ দিয়ে আকর্ষণীয় উপহার সামগ্রী তৈরি করছেন নারী কারিগররা। খ্রীস্টান সমপ্রদায়ের বড়দিনকে সামনে রেখে এখন বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার নারীরা এসব উপহার সামগ্রী তৈরির কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। এখানে কচুরিপানার কাগজে শন, সুতা ও পাটসহ নানা উপকরণ দিয়ে তৈরি হচ্ছে অ্যালবাম, নোটবুক, গহনা, ঝুড়ি, গিফট বক্স, শুভেচ্ছা কার্ড, মালা, ব্যাগ, খেলনা, ওয়ালম্যাটসহ কমবেশি ২৭১টি সৌখিন পণ্য। শুধু তাই নয়, কচুরিপানা দিয়ে নারীদের হাতের তৈরি এসব হস্তশিল্প নিয়মিত যাচ্ছে ইউরোপ ও আমেরিকায়। প্রতি বছর বিশ্বের ২০টি দেশে কমপক্ষে ১৫ কোটি টাকার উপহার পণ্য রপ্তানি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
স্থানীয়রা জানান, ২০ বছর ধরে তারা এ সব সৌখিন পণ্য তৈরি করছেন। বর্তমানে দুই হাজারেরও বেশি নারী এ সব পণ্য তৈরির কাজে যুক্ত। এক সময় যারা পেটের ক্ষুধা নিবারণের জন্য এই কচুরিপানার শিকড় ও ফুল সিদ্ধ করে খেতেন, তারাই এখন এটা দিয়ে নানা রকমের পণ্য তৈরি করে নিজেদের ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়েছেন, স্বাবলম্বী হয়েছেন। বিধবা মিনতি রানী (৫৫) জানান, তাদের হাতের তৈরি পণ্য ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দেশগুলোতে নিয়মিত রপ্তানি হয়। বড়দিন এলে এসব পণ্যের চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। বলতে গেলে তাদের এখন ভরা মৌসুম চলছে।
বাসন্তী নামের অপর এক নারী কারিগর জানান, আগৈলঝাড়ার এ সব নারী জীবনে কোন দিন গীর্জায় যাননি। অথচ বড়দিনের উপহার তৈরি করতে গিয়ে এদের মাঝে খুশীর ঝলক নেমে আসে। বড়দিনের ট্রে সাজানোসহ পছন্দের উপহার সামগ্রী তৈরিতে তারা একেকজন দক্ষ কারিগর হয়ে উঠেছেন। সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে গ্রামের নারীদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় তৈরি এ সব পণ্য সামগ্রী বিদেশিদেরও মন জয় করেছে।
জানা গেছে, আগৈলঝাড়ার কর্মঠ এ সব নারীদের ভাগ্য উন্নয়নে ও কাজের মান বৃদ্ধি করতে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ‘মেনোনাইট সেন্ট্রাল কমিটি (এমসিসি)’ প্রথমে একটি প্রকল্প গ্রহণ করে। সংস্থাটি কুটির শিল্প গড়ে তুলতে কারিগরদের ঋণ সহায়তাও দেয়। এক পর্যায়ে দরিদ্র মানুষ ও কচুরিপানাকে ঘিরে ১৯৮৪ সালে এলাকায় গড়ে উঠে ‘জোবারপাড় এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি প্রকল্প। এ প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত নারীরা শুধুমাত্র ডোবা ও মজাপুকুর থেকে কচুরিপানা সংগ্রহ করে প্রথমে কাগজ তৈরি করেন। সেই কাগজ দিয়ে পুতুলবক্স, খেলনাসহ ১৫০ প্রকার হস্তজাত সৌখিন সামগ্রী তৈরি করতে সক্ষম হন। মাত্র ৩ লাখ টাকা মূলধন নিয়ে ৫৫ শতাংশ জমির উপর গড়ে তোলা এ প্রকল্প নিজেদের তৈরি পণ্য বিদেশে রপ্তানি করে লাভের মুখ দেখে। একই বছর ২৫ শতাংশ জমির উপর স্থায়ীভাবে ‘বাগধা এন্টারপ্রাইজ’ নামের আরো একটি প্রকল্প চালু করা হয়। এ দু’টি প্রকল্পের সাফল্য দেখে ১৯৮৭ সালে গড়ে উঠে ‘কেয়াপাম হ্যান্ডিক্রাফট’ নামের আরো একটি প্রকল্প। তবে এ প্রকল্পটি শুধু কচুরিপানার উপর নির্ভরশীল নয়। এ প্রকল্পের অধীনে তালপাতা, মুলিবাঁশ, কেয়াপাতা ও সুতার ব্যবহার করে আকর্ষণীয় দেড় শতাধিক সৌখিন উপহার সামগ্রী তৈরি করা হয়। ১৯৯৩ সালে ‘বিবর্তন’ নামের আরো একটি প্রকল্প যাত্রা শুরু করে।
বর্তমানে উপজেলায় মোট ৫টি প্রকল্পের অধীনে দুই সহস্রাধিক নারী এসব হস্তশিল্প তৈরিতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। এসব নারীরা গড়ে প্রতি মাসে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা আয় করেন। এ ছাড়া প্রকল্পের মুনাফা থেকে লভ্যাংশ পান। প্রকল্পগুলোর নকশা বিভাগের পরিচালক সুরাইয়া চৌধুরী জানান, সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে টেকসই পণ্য তৈরি করা হয় এ সব প্রকল্পে। কচুরিপানার মতো প্রাকৃতিক উপকরণে তৈরি জিনিস ক্রেতারা খুবই পছন্দ করেন। এখানকার তৈরি পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের ‘ফেয়ার ট্রেড কোম্পানি’ বেশি ক্রয় করে থাকে। এছাড়া জাপানের ‘পিপল ট্রি লিমিটেড’ ও ইটালির ‘সিটিএম’সহ ২০টি দেশের বিভিন্ন ব্রান্ডের কোম্পানি তাদের পণ্য ক্রয় করে সেসব দেশে বাজারজাত করছে বলে তিনি জানান।