একটি দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য শুধু পেটে ভাত থাকলেই হবে না, মানবাধিকারও থাকতে হবে। আমাদের দেশে মানবাধিকার চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মানবাধিকার উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সরকারের এগিয়ে আসা প্রয়োজন। শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে নাগরিক ঐক্য আয়োজিত ‘চীনের সাফল্য এবং বাংলাদেশের সম্ভাবনা’ শীর্ষক গোল টেবিল আলোচনায় বক্তারা এ সব কথা বলেন। নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলী খান, গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর, সাপ্তাহিকের সম্পাদক গোলাম মর্তুজাসহ আরো অনেকে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. আকবর আলী খান বলেন, মাত্র ১০ বছরে চীনের মাথাপিছু আয় দ্বিগুণ হয়েছে। এটা অনন্য সাধারণ সাফল্য। তবে দেশটি সুশাসনে সেরা নয়। গণতন্ত্রও নেই। গণতন্ত্র থাকলে উন্নয়ন আরো বেশি হতো। তিনি বলেন, চীনের সাফল্য থেকে আমাদের কিছু শিক্ষা নেয়ার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে মানবাধিকারের বিষয়ে। কারণ, সার্বিক উন্নয়নের জন্য শুধু পেটে ভাত থাকলেই হবে না, মানবাধিকার নিশ্চিত করাও প্রয়োজন। ড. আকবর আলী খান বলেন, চীনের সাফল্য থেকে আমাদের তিনটি বিষয়ে শিক্ষা নিতে হবে। প্রথমত, সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে হবে। সরকার যা বলবে তা অবশ্যই করবে। এক সরকার যে প্রকল্প শুরু করবে পরবর্তী সরকার অবশ্যই তার ধারবাহিকতা রাখবে। এ সংস্কৃতি চালু করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রশাসনে দলীয় বিবেচনা নয় দক্ষ, সত্ ও ভালো লোকের কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তন করতে হবে। শুল্কমুক্ত গাড়ি আনা কিংবা ঢাকায় ফ্ল্যাট নেয়া ও অর্থ উপার্জনের জন্য রাজনীতিতে আসার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে।
ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, চীনের উদাহরণ দিয়ে আমাদের দেশে গণতন্ত্রের চেয়ে এক নায়কতন্ত্রের যৌক্তিকতা জাহির করার চেষ্টা করা ঠিক হবে না। কারণ, চীনে গণতন্ত্র না থাকলেও পরিবারতন্ত্র বা একনায়কতন্ত্র নেই। একজনের কথায় সব কিছু হয় না। বরং ১০ বছর পর পর তাদের নেতৃত্বে পরিবর্তন আসে। দক্ষতা ও মেধার ভিত্তিতে নেতা আসে, সন্ত্রাসী করার ক্ষমতার মাধ্যমে নয়। তিনি বলেন, জিডিপির আকার বড় হওয়ায় বিশ্বে বৃহত্ অর্থনীতির দেশ হলেও চীনে আয়ের বৈষম্যসহ বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে। তবে দেশটি তাদের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড (কর্মক্ষম যুব সমাজের প্রাধান্য) কাজে লাগাতে পেরেছে। আমরা যদি তা না পারি তবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন একটি বৃত্তের মধ্যে আটকে পড়বে। ড. আহসান মনসুর শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য শ্রমিকদের মানসম্পন্ন ও প্রয়োগিক প্রশিক্ষণ দেয়া দরকার। এ ছাড়া, পণ্য উত্পাদনে বহুমুখীকরণ ও রপ্তানির বাজার বহুমুখীকরণ করতে হবে। অবকাঠামো উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আগামী ৫০ বছরের প্রয়োজনীয়তা চিন্তা করে অবকাঠামো উন্নয়ন করতে হবে। এ ছাড়া, জাপানসহ যেসব দেশ বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী তাদের বিশেষ অর্থনৈতিক জোন গঠনসহ সার্বিক সহায়তা দিতে সরকারকে তত্পর হওয়ার পরামর্শ দেন ড. আহসান এইচ মনসুর।
অনুষ্ঠানে গোলাম মর্তুজা বলেন, দুর্নীতিযুক্ত স্বৈরশাসক দিয়ে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে সব বিষয়ে আমাদের তুলনায় দিয়ে লাভ নেই। কারণ, আমাদের সংস্কৃতি এক নয়। আমাদের দেশে সঠিক গণতন্ত্রের মাধ্যমে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষা ও অবকাঠামো খাতে অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। মাহমুদুর রহমান মান্না সভাপতির বক্তব্যে বলেন, দেশে একদলীয় শাসন চলছে। একক ক্ষমতার কারণে দুর্নীতিতে দেশ ছেয়ে গেছে। এ দিকে, অর্থনৈতিক উন্নয়নে সরকারের উল্লেখযোগ্য কোনো পরিকল্পনা দেখা যাচ্ছে না। প্রধান দুই দলই ক্ষমতায় আসা ও ক্ষমতায় থাকা নিশ্চিত করতে ব্যস্ত। এভাবে একটি দেশের উন্নতি হতে পারে না। মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রচুর সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও নেতৃত্বের অদক্ষতা ও নেতৃত্বে দ্বন্দ্বের কারণে সম্ভাবনাগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় আমাদের গণতন্ত্রের উন্নয়ন, শিক্ষা ও অবকাঠামো খাতের উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে এগিয়ে আসতে হবে।
