শিক্ষিত যুবকরা এখন আর সরকারি কিংবা বেসরকারি চাকরির জন্য বসে থাকছে না। তারা নতুন নতুন পেশায় জীবিকা নির্বাহের পথ বেছে নিচ্ছে। নদীবেষ্টিত এ অঞ্চলের বেকার যুবকরা নতুন নতুন সড়কপথে মোটরসাইকেল, অটোরিকশা ও নৌপথে স্পিডবোট চালিয়ে জীবিকা নির্বাহের নতুন পথ আবিষ্কার করেছে। বেকারত্বের অভিশাপমুক্ত হয়ে এলাকাভিত্তিতে এরা উপার্জনের ক্ষেত্র তৈরি করে নিয়েছে।
এ বিভাগের নদীবেষ্টিত জনপদ ভোলা, ঝালকাঠী, পটুয়াখালী, বরগুনা ও পিরোজপুরের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের এখন প্রধান বাহন হচ্ছে মোটরসাইকেল। একসময় যেসব এলাকার মানুষ মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে অথবা নৌকায় শহর-বন্দরে যাতায়াত করতো তাদের এখন প্রধান বাহন মোটরসাইকেল। কালের বিবর্তনে নৌকা চলাচল বলতে গেলে বন্ধ হয়ে গেছে। মোটরসাইকেলে উঠে মানুষ ছুটছে প্রত্যন্ত অঞ্চলে। আর এ মোটরসাইকেল চালনাকে জীবিকা নির্বাহ করার একটি মাধ্যম হিসেবে বেছে নেয় এ অঞ্চলের বিশাল বেকার জনগোষ্ঠী। এখন এমন কোন উপজেলা বা বড় হাট-বাজার নেই যেখান থেকে ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল পাওয়া যায় না। গ্রামের পর গ্রামে মোটরসাইকেলের দাপট বেড়েছে। শিক্ষিত বেকার যুবকরা মোটরসাইকেলে যাত্রী নিয়ে হর্ন বাজিয়ে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে ছুটে যাচ্ছেন। অধিকাংশই উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে চাকরি না পেয়ে শক্ত হাতে মোটরসাইকেলের হ্যান্ডেল ধরেছেন। কারো কারো রয়েছে উচ্চতর ডিগ্রি। নৌকা চালানো বা দিন-মজুরের কাজে আপত্তি থাকলেও মোটরসাইকেলে যাত্রী বহন করে অর্থ উপার্জনে আপত্তি নেই এই শিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত যুবকদের।
নগর সংলগ্ন চরমোনাই ইউনিয়নের বেলতলা খেয়াঘাট থেকে বুখাইনগর পর্যন্ত মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরত্বে দৈনিক মোটরসাইকেল চলে ২/৩শ’। মোটরসাইকেল চালকরা জানান, প্রতিদিন সকল খরচ বাদ দিয়ে ৪/৫শ’ টাকা আয় হয়। রোজার ঈদ-কোরবানি ও চরমোনাই’র মাহফিলের সময় উপার্জন দ্বিগুণ বা তিন গুণ ছাড়িয়ে যায়। একই অবস্থা কলাপাড়া, হাজীপুর, মহিপুর, আলীপুর, তালতলী, আমতলী কিংবা পটুয়াখালীর দুর্গম চর বড় বাঁশদিয়া ও ছোট বাঁশদিয়াসহ বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলোতে। যেখানে কোন সড়ক যোগাযোগ গড়ে উঠেনি। সেখানকার মানুষের সহজ যোগাযোগ মাধ্যম হচ্ছে এই মোটরসাইকেল। সাগর সংলগ্ন এলাকায় যেমন পর্যটকদের যাতায়াতের উপর মোটরসাইকেল চালকদের আয়-উপার্জন নির্ভর করে তেমনি অপর এলাকাগুলোতে ঈদুল ফিতর ও কোরবানির সময় আয়-রোজগার বৃদ্ধি পায় চালকদের।
মোটরসাইকেল চালকদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, গ্রামগঞ্জে যারা মোটরসাইকেল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন তারা সকলেই পরিবার-পরিজন নিয়ে ভালভাবে দিন কাটাচ্ছেন। দক্ষিণাঞ্চলের কমপক্ষে ৭/৮ হাজার বেকার যুবক মোটরসাইকেল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। দুর্ঘটনা ছাড়া তেমন কোনো ঝুঁকি নেই এ পেশায়। দুর্ঘটনার আশংকায় কেউ কেউ দুই চাকার মোটরসাইকেলের পরিবর্তে তিন চাকার অটোরিকশা আবার কেউ কেউ ৪ চাকার মাইক্রোবাস চালিয়ে যাত্রী পরিবহন করে পরিবারের রুটি-রুজির ব্যবস্থা করছেন। মোটরসাইকেলে জীবিকা নির্বাহ করতে পুঁজি খুব কম লাগে। অটোরিকশা বা মাইক্রোবাস ক্রয় করে যাত্রী পরিবহন করতে ৩/৪ গুণ বেশি পুঁজির প্রয়োজন। তার উপর রয়েছে ট্রাফিক পুলিশের বাড়তি ঝামেলা। যুবকদের অধিকাংশই মোটরসাইকেল চালানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ। শুধুমাত্র শহরমুখি বেশি আয়ের স্বপ্ন যাদের তারাই অধিক লাভের আশায় মোটরসাইকেল বিক্রি করে পুরনো প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস ও রোগী বহনকারী এ্যাম্বুলেন্স ক্রয় করে রাস্তায় নামছেন। ক্রয়কৃত গাড়ি চালিয়ে উপার্জনের টাকা সঞ্চয় করে কেউ কেউ একাধিক গাড়ির মালিক হয়েছেন। তারা সহকর্মীদের কাছেই দৈনিক অথবা চুক্তিভিত্তিক এসব যানবাহন ভাড়া দিয়ে বাড়তি আয়-রোজগার করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। একটি গাড়ি থেকে ২/৩টি গাড়ির মালিক হওয়ার নজির রয়েছে। যারা ২/৩টি বা তার অধিক গাড়ির মালিক হয়েছেন তারা ট্রাফিক পুলিশ ম্যানেজ করেই ব্যবসা পরিচালনা করেছেন। রাজনৈতিক মিছিল-মিটিং ছাড়া অন্য যে কোথাও গভীর রাতে গাড়ির ভাড়া দিতে এদের আপত্তি নেই। একটু চেনা-জানা হলে দ্বিগুণ-তিনগুণ ভাড়ায় গভীর রাতেও যাত্রী পরিবহনে এদের কোনো আপত্তি নেই।
মোটরসাইকেল চালকরা বশে আনতে পারেননি ট্রাফিক পুলিশকে। প্রায়ই গাড়ির কাগজপত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে হয়রানি করা হয় বলে অভিযোগ। এক এলাকার গাড়ি অন্য এলাকায় চালাতে গেলে ঝামেলায় পড়তে হয়। স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা মালিক কিংবা শ্রমিক ইউনিয়নের নামে কঠোর পরিশ্রমের টাকা তাদের হাতে তুলে দিয়ে আসতে হয়। না হলে নানা সমস্যায় পড়তে হয় মোটরসাইকেল চালকদের।
সড়কপথের পাশাপাশি নৌপথে নৌকার পরিবর্তে এসেছে আধুনিক নৌযান স্পিডবোট। এ পেশার সাথে বরিশাল অঞ্চলের ৬/৭শ’ যুবক জড়িত হয়েছে। সময়ের মূল্য দিয়ে মানুষ যেভাবে আধুনিক যানে দ্রুত যাতায়াতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। আধুনিক এ নৌযান পরিচালনা করে নিজের জীবন-জীবিকার পথ খুঁজে নিয়েছে বেকার কিছু যুবক। জেলা-উপজেলা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের নদী-নালা, খাল-বিলে এ স্পিডবোট চলছে সমান গতিতে। আগে হাতগোনা কয়েকটি স্পিডবোট কতিপয় যুবক বরিশাল-ভোলা ও মেহেন্দিগঞ্জ-হিজলা রুটে পরিচালনা করে মাঝে মধ্যে ধনাঢ্য যাত্রীদের বহন করতো। এখন এসব রুট ছাপিয়ে বাউফল, কালাইয়া, কালিশুরী, বগা, পটুয়াখালীর দুর্গম এলাকায় স্পিডবোট চলাচল করছে। ভোলা-বরিশাল সড়কপথে আড়িয়ল খাঁ নদ পারাপারের জন্য যুক্ত হয়েছে প্রায় অর্ধশত স্পিডবোট।
নির্ধারিত ভাড়ায় যাত্রী পারাপার করে বেকার যুবকরা আয়-রোজগারের পথ খুঁজে নিয়েছেন। চাকরির জন্য বিভিন্ন স্থানে ধরনা দিয়ে যারা ব্যর্থ হয়েছেন তারাই যাত্রী বহনে নানা পথ খুঁজে নিজের জীবিকা নির্বাহের এসব পথে পা বাড়িয়েছেন। চাকরিজীবীদের চেয়ে এদের আয়-রোজগার কোনো অংশে কম নয়। নিজের কাজ নিজে করে বেশ ভালোভাবেই জীবন কাটছে দক্ষিণাঞ্চলের এই শিক্ষিত যুবকরা। নিজের উদ্যোগে যে আয় হচ্ছে তাতেই পরিবার-পরিজন নিয়ে সাবলম্বী হচ্ছে এসব বেকার যুবক।