কখনও বিআরটিএ কর্মকর্তা কখনও ডিবি পুলিশ

আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০১৪, ০০:০৪

কী নেই তাদের কাছে? গুলি ও ম্যাগজিনসহ অস্ত্র, ওয়ার্লেস সেট, ব্লু-বুক, রোড পারমিট, ট্যাক্স টোকেন, রেজিস্ট্রেশন স্লিপ, ড্রাইভিং লাইসেন্স, কোর্টের অর্ডারশিট, পুলিশের জাল কেস স্লিপ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মিডিয়ার (ইটিভি) স্টিকার থেকে ইন্টারন্যাশনাল ড্রাইভিং রুট পারমিট পর্যন্ত! এসব তৈরির কম্পিউটার-প্রিন্টার তো ছিলই। ক্লান্ত শরীরে স্বস্তির(?) পরশ পেতে গাঁজা পর্যন্ত তাদের কব্জায়। বিআরটিএ’র এমনই এক দালাল চক্রের সন্ধান মিলেছে যশোরে। গত ২-৩ বছর কখনও বিআরটিএ কর্মকর্তা, কখনও ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে প্রতারণা চালিয়ে এসেছে চক্রটি। যশোর থেকে ঢাকা পর্যন্ত দৌর্দণ্ড প্রতাপশালী চক্রকে পুলিশ রবিবার রাতভর অভিযানে আটক করেছে। সোমবার সকালে যশোরের পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি করা হয় তাদের।

প্রেস ব্রিফিংয়ে যশোরের পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান জানান, ঝিকরগাছা থানা পুলিশ কৃষ্ণনগরের একটি বাসা থেকে প্রতারক চক্রের হোতা পবিত্র বিশ্বাস ওরফে পলাশকে আটক করে। সে খুলনার পাইকগাছার সলুয়া   গ্রামের দীলিপ বিশ্বাসের ছেলে। বছরখানেক আগে পলাশ কৃষ্ণনগরের সনত্ কুমার বোসের বাসা ভাড়া নিয়ে যশোর অঞ্চলে বিআরটিএ’র জালিয়াতি কারবার শুরু করে। একইসাথে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে প্রাইভেট কার ছিনতাইও করত। এর জন্য তার দখলে ছিল ইতালির তৈরি অত্যাধুনিক নাইন এমএম পিস্তল, গুলি ও ম্যাগজিন। ব্যবহার করত ওয়ার্লেস সেট, হ্যান্ডকাপ। গাড়িতে থাকত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্টিকার। এই স্টিকারের সুবাদে মন্ত্রণালয়সহ সবখানে তাদের অবাধ যাতায়াত ছিল। বাড়িওয়ালা ও স্থানীয় সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে দখলে থাকা বিভিন্ন অবৈধ সামগ্রিসহ পলাশকে আটক করা হয়। তার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী ওই রাতেই যশোর কোতোয়ালী মডেল থানা পুলিশ এবং ডিবিকে যুক্ত করে পরবর্তী অভিযানে নামে পুলিশ। যশোর শহরের খালধার রোড এলাকা থেকে গোলাম আহমেদের ছেলে শাকিল আহমেদ এবং বারান্দীপাড়া এলাকা থেকে লিয়াকত বিশ্বাসের ছেলে মো. জাফর হোসেনকে আটক করা হয় ভোররাতে। আটক শাকিলের বাড়ি থেকে প্রিন্টারসহ কম্পিউটার উদ্ধার করা হয়। এই কম্পিউটারের সাহায্যে যাবতীয় ভুয়া কাগজ তৈরি করে প্রিন্ট দেয়া হতো বলে পুলিশ জানায়।
পুলিশ সুপার জানান, আটক পলাশ ইতিপূর্বে মাস্টার রোলে বিআরটিএ-তে চাকরি করত। এই অফিসের অফিস সহকারীর জাল পরিচয়পত্র ছাড়াও নিজেরই রয়েছে দুটি জাতীয় পরিচয়পত্র। এ দুটিতে মা-বাবার নাম ঠিক থাকলেও একটিতে পলাশ বিশ্বাস এবং অপরটিতে পবিত্র বিশ্বাস নাম। নাম্বার দুটিও ভিন্ন। দুটি পরিচয়পত্রই বাতিলের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে লেখা হবে বলে তিনি জানান। তিনি আরও জানান, চক্রটির সাথে ঢাকার মিরপুর এবং যশোরের বিআরটিএ অফিসের একশ্রেণীর কর্মকর্তা-কর্মচারীর আঁতাত রয়েছে। তদন্তের স্বার্থে পুলিশ তাদের নাম প্রকাশ করেনি। আটককৃতদের বিরুদ্ধে ঝিকরগাছা থানায় অস্ত্র, মাদক, জাল-জালিয়াতি ও ভুয়া ডিবি পরিচয়ের জন্য ৪টি এবং কোতোয়ালী মডেল থানায় তথ্যপ্রযুক্তি আইনে একটিসহ মোট ৫টি মামলা হয়েছে। প্রতারক চক্রের প্রধান পলাশ খুলনার পাইকগাছা থানার মাদক, চুরি ও জাল কাগজ তৈরির ৩টি মামলার চার্জশীটভুক্ত আসামি।
ছেলে অপহরণ করে চক্রের ফাঁদে!

প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের কাছে আটককৃত শাকিল দাবি করেন, ৭-৮ মাস আগে তার ৩ বছরের শিশুপুত্র প্রিয়কে অপহরণ করে পলাশ। ছেলেকে ফিরে পাবার জন্য তাদের দলে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়। তার মা এবং স্ত্রী সাংবাদিকদের কাছে এসে ঘটনার ব্যাখ্যা দেবে—এমন কথা বলার পর কোতোয়ালী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তাকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দেন। এ সময় শাকিল ‘আমি আমার ছেলেকে এখনও ফিরে পাইনি। আমার ছেলেকে ফিরে পেতে চাই। আমার মানবাধিকার নিয়ে কী কিছুই বলার নেই’ বলে চিত্কার করে ওঠেন।