প্রাচ্যের ভেনিস বরিশালে খালের পর হারিয়ে যাচ্ছে পুকুর

আপডেট : ০৪ নভেম্বর ২০১৪, ০১:০৩

‘ধান-নদী-খাল/এই তিনে বরিশাল’ শ্লোগান নিয়ে প্রাচ্যের ভেনিস বরিশালে খাল ভরাটের পর একে একে হারিয়ে গেছে পুকুরগুলো। নগরীর বহু প্রাচীন পুকুরের নাম-নিশানা পর্যন্ত নেই। ভূমিগ্রাসীদের থাবায় ইতিমধ্যেই নগরীর শতবর্ষের পুরনো বহু পুকুর ভরাট হয়ে গেছে।

যেখানে একসময় বিরাট পুকুর ছিল সেখানে এখন বহুতল ভবন গড়ে উঠেছে। মাত্র ১৪/১৫ বছরের ব্যবধানে একে একে পুকুর ভরাট করে বাড়িঘর ও বহুতল মার্কেট নির্মাণ করা হয়েছে। সরকারের জলাশয় রক্ষা আইনসহ নানা আইনে পুকুর ভরাটকারীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন শাস্তির বিধান থাকলেও দেখা যায়, ক্ষমতার পালাবদলের পর পরই নতুন ক্ষমতাধর ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নতুন নতুন পুকুর দখলের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হন। পুকুর চুরির এ অশুভ প্রতিযোগিতায় ক্ষমতার আমলে কেউ কারো চেয়ে কম যান না। খাল ও পুকুরের পাশাপাশি কীর্তনখোলা নদীর তীরে জেগে উঠা চর এবং বিআইডব্লিউটি’র জমি দখলও শুরু হয়েছে অপতত্পরতা। বিআইডব্লিউটিএ’র হিসাব অনুযায়ী তাদের হাজার কোটি টাকার জমি ভূমিদস্যুদের দখলে রয়েছে। নতুন করে নৌ-বন্দর ও চরকাউয়া ফেরীঘাট এলাকার কয়েক কোটি টাকার সম্পত্তি দখলের জন্য একটি চক্র মরিয়া হয়ে উঠেছে। প্রভাবশালীদের সাথে দখলদারদের সখ্য থাকার কারণে সরকারি জমি উদ্ধারে জোরালো অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। 
মহানগরীর বড় পুকুরগুলোর মধ্যে কাউনিয়া ব্রাঞ্চ রোডের দ্বিতীয় পুকুরটি ২০১২ সালের ৮ জানুয়ারি এক রাতেই ভরাট করা হয়। একই প্রক্রিয়ায় ভরাট করা হয়েছে শ্রীনাথ চ্যাটার্জী লেনের দু’টি পুকুর। বঙ্গবন্ধু উদ্যান সংলগ্ন এলাকার একটি পুকুর ভরাট করে নির্মাণ করা হয়েছে ‘মডেল স্কুল এন্ড কলেজ’। আমানতগঞ্জে ইসলামী কলেজের পুকুরটি ভরাট করা হয়েছে দু’ বছর আগে। বর্তমানে দখল প্রক্রিয়ায় রয়েছে মল্লিক রোডের পুলিশ ক্লাব সংলগ্ন বিশাল পুকুরটি। সদর গার্লস স্কুল সংলগ্ন নগরীর প্রাণকেন্দের শক্ত পাইলিং করে দিয়েছেন। ঐ পুকুরটি ভরাট করে দখলের ব্যাপারে স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো জানিয়েছে, নগরীর অপর পুকুরগুলোর মতই জালজালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া ডিক্রি করে পুকুরটি ভরাট করে দখলের উদ্যোগ নেয় স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। পরে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর প্রতিবাদ ও পত্র-পত্রিকায় খবর প্রকাশের পর পুকুরের অর্ধেক জমি পুলিশ ক্লাবের মেনে নিয়ে ছেড়ে দেন দখলকারীরা। বাকিটুকু ভরাট করা হয়েছে।  এ ছাড়াও নগরীর  ঝাউতলার প্রথম গলির দু’টি পুকুর, জজকোর্ট সংলগ্ন পুকুর এবং খ্রিস্টান চার্চের একটি পুকুর দখলের জন্য নানামুখী অপতত্পরতা চলছে।
পুকুরের মতই ভরাট ও দখল হয়ে গেছে নগরীর ঐতিহ্যবাহী খালগুলো। একসময় নগরীর সাথে আশপাশের এলাকার যোগাযোগ মাধ্যম ছিল খালগুলো। জেল খাল, ভাটিখানার খাল, ভাটার খাল, সাগরদী খাল, লাকুটিয়া খাল, আমানতগঞ্জ খাল, কাউনিয়া ও বটতলা খাল দিয়ে বড় বড় নৌকায় মানুষ যাতায়াত করার পাশাপাশি পণ্য আনা-নেয়া করা হতো। সেইসব খালের দু’পাড়েই নানা স্থাপনা তৈরি করে ভূমিগ্রাসীরা জবরদখল করে নেয়। খালগুলোতে পানির প্রবাহ এতে বাধাগ্রস্ত হওয়ায় তা ভরাট হয়ে যায়। এসব খালের মধ্যে ভাটিখানার খাল ভরাট করে ড্রেন তৈরি করে দেয়া হয়েছে। বটতলার খাল ভরাট করে সিটি কর্পোরেশন বহুতল মার্কেট নির্মাণ করেছে। চানমারী, জেল খাল ও ভাটার খাল এখন মৃতপ্রায়। লাকুটিয়ার খালটি কোনরকমে টিকে থাকলেও এখন আর জোয়ার-ভাটার পানি কাজে লাগাতে পারছে না কেউ। খাল দিয়ে নৌকা চলাচলও বন্ধ হয়ে গেছে।
মৃত্যুর প্রহর গুণছে লাকুটিয়া খালটি। আমানতগঞ্জসহ কয়েকটি খাল পুনঃখনন করে উদ্ধারের জন্য সরকারিভাবে টাকা বরাদ্দ দেয়া হলেও তা খননের নামে শুধুই দলীয় নেতা-কর্মীদের পকেট ভারি হয়েছে। খাল আর হারানো যৌবন ফিরে পায়নি।
এ সব খাল ও পুকুরের মতই কীর্তনখোলা নদী ভরাট হয়ে পোর্ট রোড ও লঞ্চ ঘাট সংলগ্ন এলাকায় যে চর জেগে উঠেছে তা দখল করে মিনি শহর তৈরি করেছেন ভূমিগ্রাসীরা। রসুলপুর ও মোহম্মদপুর নামে দু’টি চরে বসতি গড়ে উঠেছে এক যুগেরও বেশি সময় আগে। ঐ জমি সরকারি খাস সম্পত্তি হলেও তা ভূমিদস্যুদের কব্জায় চলে গেছে। খাসজমি দখলের পাশাপাশি প্রভাবশালী ভূমিগ্রাসীরা কীর্তনখোলা তীরবর্তী বিআইডব্লিউটিএ’র হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি দখল করে নিয়েছে। রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দখলে থাকা এসব সম্পত্তি উদ্ধারে প্রশাসনিক সহায়তা মিলছে না বলে অভিযোগ করেন বিআইডব্লিউটি’র স্থানীয় কর্মকর্তারা। আবার বিআইডব্লিউটিএ’র কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে তারাই দিনে দিনে টাকার বিনিময় অবৈধ দখলদারদের জমি দখলে সহায়তা দিয়েছেন। 

জেলা প্রশাসক মো. শহিদুল আলম জানান, বিপুল পরিমাণ জমি দখলদারদের কব্জায় চলে যাওয়া রহস্যজনক। এর দায়-দায়িত্ব বিআইডব্লিউটিএ’র। জমি উদ্ধারে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে মতানৈক্য থাকলেও দখলদাররা জোটবদ্ধ হয়ে দখল প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছেন। সর্বশেষ ২৬ অক্টোবর রাত থেকে কীর্তনখোলার তীরবর্তী চরকাউয়া খেয়াঘাট এলাকায় সিটি কর্পোরেশনের দখলে থাকা সম্পত্তি দখল করে নেয়ার ব্যর্থ চেষ্টা চালায় ক্ষমতাসীন দলের কয়েক নেতা। তারা রাতের অন্ধকারে সিটি কর্পোরেশনের প্রায় দু’শ ফুট জমি দখল করে ৭/৮টি দোকানঘর নির্মাণ করেন। পরদিন সিটি কর্পোরেশনের কর্মীরা আনসার বাহিনী নিয়ে দখলদারদের হটিয়ে দেন। এর দু’দিন পর পুনরায় তা দখলে নেয় শাসকদলের দখলদাররা। একই সময়ে  ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের গৌরনদী পৌর এলাকার নীলখোলা ও হরিসেনা নামক এলাকায় সড়ক ও জনপথ বিভাগের জমিসহ সরকারি খাল দখলের অভিযোগ পাওয়া গেছে সরকারি দলের কয়েকজন স্থানীয় নেতার বিরুদ্ধে।