নৌ ধর্মঘটে বহির্নোঙ্গরে আটকা পড়েছে খাদ্য ও শিল্পপণ্য

আপডেট : ১১ নভেম্বর ২০১৪, ০০:১১

নৌ শ্রমিকদের নিরাপত্তা, নিখোঁজ শ্রমিক-কর্মচারীদের উদ্ধার নৌপথে ডাকাতি ও চাঁদাবাজি বন্ধসহ কতিপয় দাবিতে নৌযান শ্রমিক ফেডারেশন ডাকা ধর্মঘট অব্যাহত রয়েছে। এদিকে গতকাল সোমবার নৌপরিবহন মন্ত্রীর সাথে নৌ শ্রমিক ফেডারেশনের নেতৃবৃন্দের বৈঠকের পর নৌযান ধর্মঘট প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়েছে। 

গত রবিবার লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়নের একাংশ কতিপয় শর্ত সাপেক্ষে ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা দিলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি। সকালে লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়নের লোকজন বাংলাবাজার ঘাট এলাকায় জাহাজ থেকে পণ্য খালাস শুরু করলেও প্রতিপক্ষের বাধার মুখে কাজ বন্ধ হয়ে যায়।
লাইটারেজ শ্রমিকদের ধর্মঘটের কারণে সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন বাল্ক কার্গো আমদানিকারকগণ। এর মধ্যে খাদ্যপণ্যবাহী এবং শিল্প কারখানার কাঁচামাল রয়েছে। গত তিন দিন ধরে লাইটারেজ শ্রমিকদের ধর্মঘটের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে ২৪টি মাদার ভেসেল (বড় জাহাজ) আটকা পড়েছে। এ সকল জাহাজে ৫ লক্ষাধিক পণ্য খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে। এ সকল পণ্যের মধ্যে রয়েছে চিনি, গম, সিমেন্ট ক্লিংকার, সারসহ অন্যান্য পণ্য। মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাস বন্ধ থাকায় আমদানিকারকদের পণ্যের ভাড়া বৃদ্ধি পাচ্ছে। একইসাথে জাহাজ মালিকরাও আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। লাইটারেজ শ্রমিকদের ধর্মঘটের কারণে চট্টগ্রাম থেকেও দেশের বিভিন্ন স্থানে সকল ধরনের পণ্য পরিবহন বন্ধ রয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রতিদিন চট্টগ্রাম থেকে ৫০/৬০ হাজার টন পণ্য লাইটারেজ জাহাজ যোগে দেশের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছায়।
গত রবিবার রাতে মুন্সীগঞ্জের ষাটনল এলাকায় ওয়াটার হেভেন-১ ও মাস্টার সোহেল-২ নামে দু’টি পণ্যবাহী জাহাজে ডাকাতির সংবাদে আবারো শ্রমিকদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। এ সময় ধর্মঘট প্রত্যাহারের সমর্থনকারীরাও ধর্মঘটে সমর্থন জানায়। ফলে গতকাল এক প্রকার নির্বিঘ্নে লাইটারেজ জাহাজসমূহে ধর্মঘট পালিত হয়। নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনভুক্ত লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়নের উদ্যোগে গতকাল বাংলাবাজার এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে শ্রমিক নেতৃবৃন্দ তাদের দাবি পূরণের আহবান জানান।
এদিকে গত শুক্রবার রাতে এমভি কর্ণফুলী-৫ জাহাজের নিখোঁজ এক শ্রমিকের লাশ পুলিশ উদ্ধার করেছে। কমলনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির ইত্তেফাককে জানান, নূর নেওয়াজ (৩৪) নামে নিখোঁজ একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। তার মাথায় আঘাতের চিহ্ন ছিল। পুলিশ ৩ জনকে উদ্ধার করে। নিখোঁজ অন্যান্যদের উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। কমলনগর থানা পুলিশ বাতিতর খাল এলাকা থেকে জাহাজটিকেও অরক্ষিত অবস্থায় উদ্ধার করে। এ ঘটনার প্রেক্ষিতে নৌযান শ্রমিক ফেডারেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য পণ্যবাহী জাহাজে ধর্মঘট আহবান করে।
চট্টগ্রাম বন্দরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাগণ বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরমুখী মাদার ভেসেল আটকা পড়ে থাকায় দেশের বাইরে খারাপ বার্তা যাবে। তাই দ্রুত লাইটারেজ জাহাজ শ্রমিকদের ধর্মঘট প্রত্যাহার করতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছি। এদিকে লাইটারেজ জাহাজ ও শ্রমিকরাও অলস বসে থাকায় উভয়পক্ষই আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের অন্তর্ভুক্ত লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নবী আলম বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরসহ দেশের কোথাও পণ্যবাহী জাহাজে কাজ হয়নি। তিনি বলেন, নৌযান শ্রমিকদের নিরাপত্তা, নিখোঁজ শ্রমিকদের উদ্ধার, ডাকাতি, চাঁদাবাজি বন্ধসহ তাদের দাবিসমূহ মেনে নেয়ার আহবান জানানো হয়।
অপরদিকে লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ শাহাদাত হোসেন বলেন, শর্ত সাপেক্ষে ধর্মঘট প্রত্যাহার করলেও পালন করা সম্ভব হয়নি। গতকাল সোমবার পুনরায় দু’টি জাহাজে ডাকাতির কারণে শ্রমিকরা ধর্মঘটে অংশগ্রহণ করে।
রাজধানীতে নৌপরিবহন মন্ত্রী ও সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সাথে নৌ শ্রমিক ফেডারেশনের নেতৃবৃন্দের বৈঠকের পর নৌযান ধর্মঘট প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়েছে। গতকাল সোমবার রাতে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
এদিকে গতকালের বৈঠকের সভাপতি নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান ইত্তেফাককে বলেন, নৌযান শ্রমিক নেতৃবৃন্দের সাথে ফলপ্রসূ আলোচনার প্রেক্ষিতে তারা নৌযান ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নিয়েছে। বুধবার সচিবালয়ে নৌ নিরাপত্তার ব্যাপারে আরো বৃহত্তর পরিসরে ব্যাপক আলোচনা হবে।
বৈঠকে উপস্থিত নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মো. শাহ আলম ইত্তেফাককে জানান, তারা নৌযান ধর্মঘট প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বৈঠকে সরকারের পক্ষ থেকে নৌ নিরাপত্তা, বিশেষ করে ডাকাতি, চাঁদাবাজিসহ নিখোঁজ লোকজনের উদ্ধারের আশ্বাসের প্রেক্ষিতে তারা নৌযান ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। তিনি বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে নৌ নিরাপত্তার অংশ হিসাবে আজ মঙ্গলবার থেকে কোস্টগার্ড ও নৌ পুলিশ নৌপথে টহল দেয়া শুরু করবে। আগামী সাত দিনের মধ্যে কর্নফুলী-৫ লাইটার জাহাজে সংঘটিত ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতার এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করার আশ্বাস দেয়া হয়েছে। একইসাথে নিখোঁজ লোকজনকে উদ্ধারে আরো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হবে। নিহত লোকজনের জন্য একটি তহবিলের ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেয়া হয়। গতকাল নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিব, নৌ পুলিশের ডিআইজি, ডিজিশিপিং, কার্গো ওনার্স এসোসিয়েশন সভাপতি, কোস্টগার্ডের উপ-পরিচালকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

মংলা (বাগেরহাট) সংবাদদাতা জানান, নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের ডাকা পরিবহন ধর্মঘটের কারণে সোমবার মংলা বন্দরসহ সারাদেশে নদী পথে সকল ধরনের পণ্য পরিবহন ব্যাহত হয়। মংলা বন্দরের পশুর চ্যানেল ও ফেয়ারওয়ের বহিঃনোঙ্গরে অবস্থানরত সকল দেশি-বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজের পণ্য বোঝাই-খালাস ও পরিবহন বন্ধ থাকায় অচল হয়ে পড়েছে এ বন্দর। এছাড়া বন্দরের শিল্প এলাকা ও ইপিজেডে পণ্য উত্পাদন ব্যাহত হচ্ছে।