রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও সিনেটের নির্বাচিত সদস্য ড. একেএম শফিউল ইসলামকে (৩৯) কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। গতকাল শনিবার বিকাল ৩ টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন নগরীর চৌদ্দপাই এলাকার বিশ্ববিদ্যালয় হাউজিং সোসাইটির গেটের কাছে এই হামলার ঘটনা ঘটে। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে বিকালে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে তার মৃত্যু হয়। তবে কে বা কারা কি কারণে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তা জানা যায়নি।
এদিকে ড. শফিউল ইসলামের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের খবরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। তারা হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে এবং খুনিদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ক্যাম্পাসের মেইন গেটের কাছে রাজশাহী-ঢাকা মহাসড়ক অবরোধ করেন। ঘণ্টাব্যাপী এই অবরোধের কারণে সড়কের দুই পাশে শত শত যানবাহন আটকা পড়ে। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিষ্ট্রার ও প্রক্টরসহ বিভাগীয় শিক্ষকরা সুষ্ঠু বিচারের আশ্বাস দিলে শিক্ষার্থীরা অবরোধ তুলে নেন।
অন্যদিকে শিক্ষক হত্যার প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি আজ রবিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে। সমিতির সভাপতি
প্রফেসর কামরুল হাসান মজুমদার বিষয়টি নিশ্চিত করে ইত্তেফাককে জানান, দূর-দূরান্ত থেকে আসা শিক্ষার্থীদের ভোগান্তির কথা বিবেচনা করে আজ শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষের ভর্তি কার্যক্রম চালু থাকবে।
প্রফেসর কামরুল হাসান মজুমদার বিষয়টি নিশ্চিত করে ইত্তেফাককে জানান, দূর-দূরান্ত থেকে আসা শিক্ষার্থীদের ভোগান্তির কথা বিবেচনা করে আজ শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষের ভর্তি কার্যক্রম চালু থাকবে।
পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ড. শফিউল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চৌদ্দপাই এলাকার বাসায় ফিরছিলেন। তিনি হাউজিংয়ের গেটের কাছে পৌঁছলে কিছু বুঝে ওঠার আগেই কয়েকজন দুর্বৃত্ত ধারালো অস্ত্র নিয়ে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। দুর্বৃত্তরা তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে আইসিইউতে চিকিত্সাধীন অবস্থায় বিকাল ৫টার দিকে কর্তব্যরত চিকিত্সক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। সন্ধ্যায় মরহুমের ময়নাতদন্ত শেষে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নিকট লাশ হস্তান্তর করা হয়। রাত ৯ টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে মরহুমের প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত মরহুমের একমাত্র পুত্র জেবিন রাজশাহী এলে লাশ নিজ বাড়ি বগুড়ার সোনাতলায় দাফনের জন্য নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
রামেক মর্গে নিহতের ময়নাতদন্তে সংশ্লিষ্ট চিকিত্সকরা জানান, ড. শফিউল ইসলামের মাথা, ঘাড়সহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের গভীর জখম ছিল। তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করা হয়েছে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়েছে।
মতিহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলমগীর হোসেন সাংবাদিকদের জানান, চৌদ্দপাই এলাকায় ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক থেকে শফিউল ইসলামের ভাড়া বাসার দূরত্ব প্রায় একশ’ গজ। বিকালে বাড়ির সামনের নির্জন এলাকায় কে বা কারা তাকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে একটি চাপাতি ও তার ব্যবহূত মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করেছে। ওসি আরো জানান, তিনি একজন বাউলভক্ত মানুষ। পারিবারিক কিছু ঝামেলাও রয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে। তবে কারা কেন তার ওপর হামলা চালিয়েছে তা এখনও জানা যায়নি। বিষয়টি তদন্ত না করে বিস্তারিত এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না।
অধ্যাপক শফিউল আলম ১৯৯১ সালে রাবির সমাজবিজ্ঞান বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। তিনি প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের প্যানেল থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সিনেটের নির্বাচিত সদস্য ছিলেন। এক সন্তানের জনক এই শিক্ষকের প্রথম স্ত্রী ২০০২ সালে আত্মহত্যা করলে তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেন। কিন্তু চৌদ্দপাই এলাকার ভাড়া বাসায় তিনি একাই থাকতেন।
ড. শফিউল ইসলামের এই অস্বাভাবিক মৃত্যুতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর মুহম্মদ মিজান উদ্দিন, উপ-উপাচার্য প্রফেসর চৌধুরী সারওয়ার জাহান সজল, ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার প্রফেসর এম এন্তাজুল হক এবং রাবি প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ নেতৃবৃন্দ গভীর শোক ও নিন্দা জানিয়েছেন। শিক্ষকবৃন্দ এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্ত্রাসীদের চিহ্নিত করে দ্রুত বিচারের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানান।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. এএইচএম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘শফিউল আমার খুবই কাছের ছাত্র ছিল। সে যে এভাবে নিহত হবে আমি ভাবতে পারছি না। হত্যা করার মতো অপরাধ সে করতে পারে না।’
এই হামলার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য এমনকি কোনো প্রত্যক্ষদর্শীও পাওয়া যায়নি। তবে হামলার ধরন দেখে অনেকে ধারণা করছে, পূর্বশত্রুতার জের অথবা মৌলবাদী গোষ্ঠী এই ঘটনা ঘটাতে পারে। রাবি’র ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক গোলাম সরওয়ার সাংবাদিকদের বলেন, ‘শফিউল ইসলাম বাউলিজম চর্চা করতেন। তিনদিন আগে তার বাসায় বিশাল পাঠচক্রের আয়োজন করেন। প্রতিক্রিয়াশীল চক্র এ বিষয়টি জানতো। এটাও হত্যাকাণ্ডের কারণ হতে পারে।’
সূত্র জানায়, বছর চারেক আগে ড. শফিউল ইসলাম আধ্যাত্মিক জগতে জড়িয়ে পড়েন। স্বাভাবিক পোশাক ছেড়ে তিনি রীতিমত বাউলদের পোশাক সাদা লুঙ্গি ও পাঞ্জাবী পরতেন। সর্বদা লালন ও বাউল ভক্তদের সঙ্গে নিয়ে ঘুরতেন। এ কারণে তার হত্যাকাণ্ডে মৌলবাদী গোষ্ঠী জড়িত থাকতে পারে বলে পুলিশ কর্মকর্তারাও ধারণা করছেন।
প্রসঙ্গত, এর আগে ২০০৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর নগরীর বিনোদপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রফেসর মোহাম্মদ ইউনুছ এবং ২০০৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ভূ-তত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. এস তাহের আহমেদ নিজ বাসভবনে সন্ত্রাসীদের হাতে নৃশংসভাবে খুন হন। ইউনুছ হত্যা মামলায় নিম্ন আদালতের রায়ে আত্মস্বীকৃত এক জঙ্গির ফাঁসি ও অপর ছয় জঙ্গি বেকসুর খালাস পেয়েছে। অন্যদিকে ড. তাহের হত্যা মামলায় বিভাগীয় শিক্ষক ড. মিয়া মহিউদ্দিন ও নিহতের কেয়ারটেকার জাহাঙ্গীরসহ চার আসামির ফাঁসি ও তত্কালীন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র শিবিরের সভাপতি মাহবুবুল আলম সালেহীসহ দুই আসামি বেকসুর খালাস পেয়েছে। উভয় মামলা বর্তমানে হাইকোর্টে আপিল শুনানিতে রয়েছে।
