পরিবেশ ও বন মন্ত্রী এবং জাতীয় পার্টি (জেপি) চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেছেন, জাতি গঠন তথা দেশকে অগ্রগতির পথে নিয়ে যেতে মুক্তিযোদ্ধাদের ভূমিকা থাকা একান্ত প্রয়োজন। অনুদান-সাহায্যের পরিমাণ বড় কথা নয়, রাষ্ট্র তাদের যে স্বীকৃতি দিচ্ছে এটাই গুরুত্বপূর্ণ। বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানিত করার মহতী প্রয়াস আজ এ পর্যায়ে আসতে পেরেছে। মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে নতুন প্রজন্মকে সচেতন করে তুলতে হবে। তিনি গতকাল বুধবার পিরোজপুর জেলার ভাণ্ডারিয়া উপজেলার মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে অনুদানের চেক বিতরণ অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন।
আনোয়ার হোসেন বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে অতীতে অনেক ধূম্রজাল সৃষ্টি করা হয়েছে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত অবস্থা থেকে দেশকে অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে। ভিয়েতনামে যুদ্ধ করা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবসরপ্রাপ্ত সেনাদের সে দেশের নতুন প্রজন্মসহ সর্বস্তরের মানুষ সম্মান করেন। অথচ আমাদের দেশে বিগত ৪৩ বছরেও মুক্তিযোদ্ধাদের একটি সঠিক তালিকা তৈরি করতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনাক্ত করা হচ্ছে, চাকরি থেকে অবসরে পাঠানো হচ্ছে এমনকি কেউ কেউ স্বেচ্ছায় পদত্যাগও করছেন।
তিনি বলেন, একটি সরকার ক্ষমতায় আসে আর একটি একটি করে তালিকা তৈরি হয় মুক্তিযোদ্ধাদের। এই তালিকা নিয়ে যখন প্রশ্ন ওঠে বা বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয় তখন স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিতে না পারা বর্তমান প্রজন্মের মাঝে মুক্তিযোদ্ধা তথা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সংশয় জাগে। এই অবস্থার অবসানে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়ন আবশ্যক। যারা জীবন বাজি রেখে পাকিস্তানি শাসন থেকে বেরিয়ে এসে দেশের মানুষকে একটি স্বতন্ত্র আবাস ভূমি দান করেছেন সেই মুক্তিযোদ্ধাদের শ্রদ্ধা জানানোর মানসিকতা সৃষ্টি না হলে মুক্তিযুদ্ধই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে।
পরিবেশ ও বন মন্ত্রী বলেন, আমাদের দেশে ঔপনিবেশিক আইন পরিবর্তন না করায় বাক-স্বাধীনতা, মুক্তভাবে চলাফেরা তথা মৌলিক অধিকার ভোগ করার সুযোগ পরাধীন আমলের মতই রয়ে গেছে। দণ্ডবিধির ৫৪ ধারায় গ্রেফতার, কারাগারে ডাণ্ডাবেড়িসহ বৃটিশ আমলের আইন স্বাধীন বাংলাদেশের ৪৩ বছরে এবং পাকিস্তান আমলের ২৩ বছরে আমরা বাদ দিতে পারিনি। ভারত মানুষের অধিকার হরণের অনেক ঔপনিবেশিক আইন সংশোধন তথা পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছে। আমাদের সে রকম অবস্থা তৈরি করার জন্য বড় ধরনের ঝাঁকুনির প্রয়োজন।
তিনি বলেন, আমরা একটি ভাল দেশ তৈরি করার জন্য যুদ্ধ করেছি। পাকিস্তান আমলের মত অত্যাচারিত-নির্যাতিত হওয়ার জন্য বাংলাদেশের মানুষ লড়াই করেনি। আজ মুক্তিযুদ্ধের আরেক রূপ উন্নয়ন সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে হবে আমাদের। আমাদের প্রচেষ্টা থাকবে বাক-স্বাধীনতার জন্য, ভোটের ব্যবস্থা রক্ষার জন্য। স্বাধীনতা উত্তর কালের রাজনীতি হচ্ছে গড়ার, কাজ করার। অতীতের ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে আলাপ-আলোচনায় ব্যস্ত থাকলে মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন তথা অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটবে না।
আনোয়ার হোসেন বলেন, গত ৩০ বছরে মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে আমি সর্বাগ্রে ঐকমত্যের রাজনীতির কথা বলেছি। সংঘবদ্ধ চিন্তা বা প্রয়াসের অভাবে উন্নয়ন কাজ বিঘ্নিত হয়। উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে প্রয়োজন বরাদ্দকৃত সম্পদের সময়মত যথাযথ ব্যবহার। মেয়াদকালে সম্পদের ব্যবহার সম্পাদন হলে নতুন বরাদ্দ আসে। সঠিক তদারকি, অপচয় রোধ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা কাজের অধিকতর সাফল্য আনে।
মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিত্সার জন্য আর্থিক অনুদানের চেক, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মাঝে ত্রাণের ঢেউটিন ও একটি বাড়ি একটি খামারের সমিতির সদস্যদের মাঝে ঋণ বিতরণ অনুষ্ঠান উপলক্ষে ভাণ্ডারিয়া উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে এ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। উপজেলা চেয়ারম্যান আতিকুল ইসলাম তালুকদার উজ্জলের সভাপতিত্বে এখানে আরও বক্তব্য রাখেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) কাজী মাহবুবুর রশীদ, মহিলা উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আসমা আক্তার, সদর ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম সরওয়ার জোমাদ্দার, ধাওয়া ইউপি চেয়ারম্যান সিদ্দিকুর রহমান টুলু, ভিটাবাড়িয়া ইউপি চেয়ারম্যান মশিউর রহমান মৃধা, ইকড়ি ইউপি চেয়ারম্যান তানভীর হোসেন বাবু, তেলিখালী প্যানেল ইউপি চেয়ারম্যান বাহাউদ্দিন বাদল, জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডেপুটি কমান্ডার এম এ রব্বানী ফিরোজ, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার আব্দুল আজিজ সিকদার, মুক্তিযোদ্ধা আলী বাহাদুর খান ও আব্দুল মতিন খান।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা জাতীয় পার্টি (জেপি) আহ্বায়ক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মনিরুল হক মনি জোমাদ্দার, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মিরাজুল ইসলাম, ভাণ্ডারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মতিউর রহমান, গৌরীপুর ইউপি চেয়ারম্যান বদিউজ্জামান টিপু প্রমুখ। অনুষ্ঠান শেষে উক্ত কর্মসূচিসমূহের সুফল ভোগীদের মাঝে পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু চেক ও টিন বিতরণ করেন। শেষে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর আয়োজিত জাতীয় ইঁদুর নিধন অভিযান-২০১৪ উদ্বোধন করা হয়।
আনোয়ার হোসেন মঞ্জু গতকাল সকালে ভাণ্ডারিয়ার দক্ষিণ শিয়ালকাঠি গ্রামের বাসিন্দা বন বিভাগীয় কর্মকর্তা হুমায়ূন কবির মুন্সির সহধর্মিণী অকাল প্রয়াত সাজিয়া আফরোজ মবিনের জানাজায় শরিক হন। পিরোজপুর সদর আসনের সংসদ সদস্য এ কে এম এ আউয়ালসহ স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ জানাজায় উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে মন্ত্রীর বাসভবনে টেলিভিশন জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন পিরোজপুরের কর্মকর্তাবৃন্দ তাঁর সাথে শুভেচ্ছা সাক্ষাত্ করেন। এ সময় সংগঠনের সভাপতি রশীদ আল মুনান, সাধারণ সম্পাদক শিরিণা আফরোজসহ অন্যরা মন্ত্রীকে ফুলের তোড়া উপহার দেন।
