পরিবেশ ও বন মন্ত্রী এবং জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেছেন, দেশে স্থিতিশীল পরিস্থিতি তথা শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকলে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন করা সহজ হয়। আমাদের লক্ষ্য হতে হবে স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে তোলা। লেখা-পড়া করে যাতে ছেলে-মেয়েরা চাকরি করতে পারে রাষ্ট্র তারও সুযোগ নিশ্চিত করবে। গতকাল বৃহস্পতিবার পিরোজপুর জেলার জিয়ানগর উপজেলায় পৃথক দু’টি অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, বর্তমান জোট সরকার ১৪/১৫টি দল নিয়ে দেশ পরিচালনা করছে। প্রধানমন্ত্রী জাতীয় স্বার্থে অন্যান্য ছোট ছোট দল নিয়ে সরকার চালাচ্ছেন। আমরাও মিলেমিশে এলাকার তথা দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে কাজ করে যাচ্ছি। গত ৩০ বছর ধরে অবহেলিত দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নে মানুষের ঐক্যবদ্ধ সহযোগিতার ফলে অনেক কাজ করা সম্ভব হচ্ছে। আমরা উন্নয়নের ক্ষেত্রে ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছি। দেশে এখন প্রযুক্তিগত শিক্ষা যুগে প্রবেশের প্রক্রিয়া চলছে। তথ্য প্রযুক্তিতে অভ্যস্ত হতে শিক্ষার কৌশল বদল হয়েছে। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর সাথে পাল্লা দিতে, সমতা আনয়নে আমাদের ছেলে-মেয়েরা শিখন-পঠন পদ্ধতির পরিবর্তন ধারায় রয়েছে। এই নতুন পরিস্থিতির সাথে আমাদের খাপ খাওয়ানোর মানসিকতা গড়ে তোলা আবশ্যক। যাতে অর্জিত শিক্ষা ব্যবহার করে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা যায়। আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, ৪৩ বছর ধরে দেশে মানুষের উন্নত জীবন-যাপনের চেষ্টা চলছে। তারপরও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ের অগ্রগতি হচ্ছে না। অনেক উন্নত দেশ দু’শ বছর ধরে তাদের জীবনমানের পরিবর্তনের চেষ্টারত। এসব শিল্পউন্নত দেশের কাজ সময়ের প্রয়োজনে অব্যাহত রাখতে হয়। আমাদেরও জীবন-জীবিকার সংগ্রাম নিরলসভাবে চালিয়ে যেতে হবে। এ কাজে নিয়ম-শৃঙ্খলা শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা অপরিহার্য। আইন-শৃঙ্খলার অভাব এলাকার উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করে। আইনের চর্চা ন্যায় বিচারকে নিশ্চিত করে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব পালন নিরপেক্ষ-নির্বিঘ্ন করে। কোন ক্রমে আইন হাতে তুলে নেয়ার প্রবণতা গ্রহণযোগ্য নয়। রাজনীতি জীবন খুবই সংক্ষিপ্ত হয়। রাজনীতি চলে নদীর প্রবাহের মত আঁকাবাঁকা পথে। ছোট খাটো বিষয় নিয়ে সময় নষ্ট করলে মানুষ অধিকার হারায়।
পরিবেশ ও বন মন্ত্রী বলেন, রাজনৈতিক আন্দোলন, সংগ্রাম ঠেকাতে তথা নিজেদের ক্ষমতা রক্ষা করতে সরকারকে যদি ব্যস্ত থাকতে হয় তা হলে মানুষের কল্যাণে কাজ করার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। আমাদের সম্পদ অপ্রতুল। দেশে বৈরী পরিবেশ থাকলে বিদেশিরা যারা আমাদের অর্থ সাহায্য করে তারাও আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। তাই শান্তি-শৃঙ্খলা-ঐক্য ও কাজের পরিবেশ বজায় রাখতে দলমত নির্বিশেষে সবার একমত থাকা আবশ্যক। তা না হলে অবহেলিত গ্রামের মানুষের ন্যায্য হিস্যা শহরবাসীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
মন্ত্রী গতকাল দুপুরে জিয়ানগর কলেজ পরিদর্শন করেন। এ সময় কলেজের ব্যবস্থাপনা কমিটি, শিক্ষক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে এক শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে মিলিত হন এবং সেখানে বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি পিরোজপুর সদর আসনের সংসদ সদস্য এ কে এম এ আউয়াল স্বাগত বক্তব্য দেন। বিকালে তাঁর নির্বাচনী এলাকা জিয়ানগর উপজেলার ঘোষেহাটে মন্ত্রী স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের জলবায়ু পরিবর্তন সহনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন (সিসিআরপি) প্রকল্পের আওতায় বাজার উন্নয়ন কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এ সময় এক সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠানে উপস্থিত জনগণের উদ্দেশে বক্তব্য দেন। পত্তাশী ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা জাতীয় পার্টির (জেপি) আহ্বায়ক আসাদুল কবির তালুকদার স্বপনের সভাপতিত্বে এ অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন উপজেলা চেয়ারম্যান মাসুদ সাঈদী, পিরোজপুরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মনিরুজ্জামান তালুকদার, ইউএনও সিদ্ধার্থ শংকর কুন্ড, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক ফায়জুল কবির তালুকদার, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান সাহিদা বেগম, বালিপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা জেপি’র সদস্য সচিব মশিউর রহমান মঞ্জু, পাড়েরহাট ইউপি চেয়ারম্যান শাহ আলম হাওলাদার প্রমুখ। জিয়ানগরে পরিবেশ ও বন মন্ত্রীর সফর সঙ্গীদের মধ্যে ছিলেন ভান্ডারিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান আতিকুল ইসলাম তালুকদার উজ্জল, ভাইস চেয়ারম্যান মিরাজুল ইসলাম, ভান্ডারিয়া ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম সরওয়ার জোমাদ্দার, ধাওয়া ইউপি চেয়ারম্যান সিদ্দিকুর রহমান টুলু, টুঙ্গীপাড়া আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক হাফিজুর রশীদ তারিক প্রমুখ।
ভান্ডারিয়া সংবাদদাতা ফজলুর রহমান জানান, পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু গত বুধবার রাতে ভান্ডারিয়া উপজেলার দক্ষিণ রাজপাশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠ ও রাজপাশা মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে স্থানীয় জনগণের সাথে পৃথক দু’টি মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন। এসব অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, আমাদের দেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। এখানে বিভিন্ন সমস্যা আছে। আমাদের সীমাবদ্ধতাও আছে। সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে আয় এবং ব্যায়ের হিসাব করে সমাধান করতে হবে। এরশাদ সরকারের আমলে সাত বছর মন্ত্রী ছিলাম। তখন অনেক মানুষ বিদ্যুত্ নিতে রাজি হয়নি। এখন মানুষ বিদ্যুতের খুঁটি চায়, রাস্তা চায়। এ অঞ্চলের মানুষ কাদার মধ্য দিয়ে হাঁটত। এখন যে তারা তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়েছে এবং প্রয়োজন সম্পর্কে তাদের আত্মোপলব্ধি হয়েছে এটাই হল পরিবর্তন। আমাদের পরিকল্পনার মধ্যে সব কিছু করতে হবে। আমাদের দেশে অপরিকল্পিতভাবে বাড়ি-ঘর নির্মাণ করার ফলে বিদ্যুত্ সংযোগ ও রাস্তাঘাট নির্মাণ করা দুরূহ ব্যাপার। সরকার যদি আবাসিক এলাকা স্থাপন করে সেখানে সকল সুযোগ সুবিধা পাবে। তিনি আরো বলেন, বর্তমান সরকার ২০২০ সালের মধ্যে সোলার প্যানেলসহ বিদ্যুত্ সুবিধা দেয়ার পরিকল্পনা করেছে।
আনোয়ার হোসেন মঞ্জু আরো বলেন, ১৯৮৪ সালে এ অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো ছিল না। নৌকাই ছিল যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম আর এখন গাড়ি নিয়ে চলাচল করা যায়। আপনারা সচেতন হয়েছেন, নিজেদের সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন এটাই আমার ৩০ বছরের সাধনার সফলতা। সকলে মিলেমিশে একটি সুখী সমৃদ্ধ পরিবার গড়ে তুলতে হবে। মতবিনিময় সভায় জাতীয় পার্টি জেপি’র ভান্ডারিয়া উপজেলা সদস্য সচিব ও ধাওয়া ইউপি চেয়ারম্যান মো. সিদ্দিকুর রহমান টুলুর সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন ভান্ডারিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান আতিকুল ইসলাম উজ্জল, ইউএনও কাজী মাহবুবুর রশিদ, ভিটাবাড়িয়া ইউপি চেয়ারম্যান মো. মশিউর রহমান মৃধা, উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আ. রশিদ মৃধা, জেপি নেতা ও ইউপি সদস্য এম এ কাইয়ুম জামান, ধাওয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হুমাউন কবির পিন্টু, উপজেলা যুব সংহতির যুগ্ম আহবায়ক ও ইউপি সদস্য ফিরোজ হোসেন মুন্সি, আব্দুল হালিম মৃধা, হাবিবুর রহমান সিকদার প্রমুখ। এছাড়াও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মতিউর রহমান, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান আসমা আক্তার, গৌরীপুর ইউপি চেয়ারম্যান বদিউজ্জামান টিপু, উপজেলা জেপি’র যুগ্ম আহবায়ক আবুল কালাম পোদ্দার, উপজেলা যুব সংহতির আহ্বায়ক মো. শহীদুজ্জামান রাজু, সদস্য সচিব মো. মনির সরদার ও উপজেলা ছাত্র সমাজের আহবায়ক আরিফুল ইসলাম শিমুল, সদস্য সচিব সালাহ উদ্দিন রাহাত জোমাদ্দার ছাড়া জেপি ও আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
পরে পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের উদ্যোগে নির্মিত রাজপাশা মাধ্যমিক বিদ্যালয় নবনির্মিত ভবনের উদ্বোধন করেন এবং দোয়া ও মোনাজাতে শরিক হন। এসময় উক্ত অতিথিবৃন্দ ছাড়াও ভান্ডারিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মো. মিরাজুল ইসলাম মিরাজ, জেপি নেতা ইউসুফ আলী আকন ও জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মেনহাজুল হকসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।