রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এ কে এম শফিউল ইসলাম লিলনের খুনের সঙ্গে রাজশাহী যুবদলের ১১ জন জড়িত বলে দাবি করেছে র্যাব। এঘটনায় জড়িত ৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলেও জানায় র্যাব। গতকাল রবিবার এই ৬ জনকে র্যাব সদর দফতরে সাংবাদিকদের সামনে হাজির করা হয়। এসময় ড. শফিউল হত্যায় কারা জড়িত ছিল এবং কি কারণে তাকে হত্যা করা হয়েছে সে বিষয়ে র্যাব তাদের তথ্য উপস্থাপন করে।
র্যাবের ভাষ্যমতে, রাজশাহী জেলা যুবদলের সদস্য আব্দুস সামাদ পিন্টুর স্ত্রী নাসরিন আক্তার রেশমা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ভবনে হিসাব শাখার সেকশন অফিসার। নাসরিনের সাথে অধ্যাপক শফিউল বেশ কয়েকবার অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। বিষয়টি নিয়ে মধ্যস্থতা করার জন্য পিন্টু রাজশাহী জেলা যুবদলের আহবায়ক আনোয়ার হোসেন উজ্জ্বলের কাছে যান। উজ্জ্বল অধ্যাপক শফিউলের সঙ্গে দেখা করতে গেলে তখনও তাদের মধ্যে বাক-বিতন্ডা হয়। পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, অধ্যাপক শফিউলকে এজন্য শাস্তি দিতে হবে। সে অনুযায়ী রাজশাহীর কাঁটাখালী পৌর যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক আরিফুল ইসলাম মানিকের নেতৃত্বে খুনের অপারেশন পরিচালিত হয়।
গ্রেফতারকৃতরা হলেন রাবি জেলা যুবদলের সদস্য আব্দুস সামাদ পিন্টু, কাঁটাখালী পৌর যুবদলের সাংগাঠনিক সম্পাদক আরিফুল ইসলাম মানিক, যুবদল সদস্য ইব্রাহিম খলিল বাবু, যুবদল সদস্য সবুজ শেখ, মানিকের চাচাতো ভাই আল মামুন ও যুবদল সদস্য সিরাজুল ইসলাম কালু। গত শনিবার রাতে রাজশাহী ও গাজীপুরের টঙ্গীতে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়। র্যাব জানায়, তাদের কাছ থেকে হত্যায় ব্যবহূত চাপাতি, ছুরি ও হাসুয়া উদ্ধার করা হয়েছে। খুনের মিশনে অংশ নেয়া ১১ জনের মধ্যে আরিফ, সাগর ও জিন্নাহ পুলিশের হাতে আগেই গ্রেফতার হয়েছে। এই খুনের নির্দেশদাতা রাজশাহী জেলা যুবদলের আহবায়ক আনোয়ার হোসেন উজ্জ্বল ও যুবদল নেতা হন্ডি ব্যবসায়ী জামাই বাবু পলাতক রয়েছেন বলে র্যাব জানিয়েছে।
সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান, গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লে.কর্নেল আবুল কালাম আজাদ, লিগ্যাল এ্যান্ড মিডিয়া শাখার পরিচালক কমান্ডার মাহমুদ খান, উপ-পরিচালক মেজর রুম্মন ও সহকারী পরিচালক ক্যাপ্টেন মাকসুদ।
সাংবাদিক সম্মেলনে র্যাবের মিডিয়া এ্যান্ড লিগ্যাল শাখার পরিচালক কমান্ডার মাহমুদ খান বলেন, ২০০৩ সালের রাবি ছাত্রদল শাখার সহ-সভাপতি ছিলেন আব্দুস সামাদ পিন্টু। সেসময় বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫৪৪ জন কর্মচারীর গণনিয়োগ হয়। পিন্টুর স্ত্রীও সেসময় নিয়োগ পান। তিনি মতিহার থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিনের ভাতিজি।
র্যাবের ওই কর্মকর্তা জানান, শফিউল হত্যার ঘটনার ১০/১৫ দিন পূর্বে নাসরিনের সঙ্গে অধ্যাপক শফিউল অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। পরে এ নিয়ে পিন্টুর সঙ্গেও শফিউলের কথা কাটাকাটি হয়। পিন্টু বিষয়টি জানান জেলা যুবদলের আহ্বায়ক আনোয়ার হোসেন উজ্জলকে। উজ্জ্বল বিষয়টি নিয়ে অধ্যাপক শফিউলের সঙ্গে কথা বলেন। সেখানে তাদের মধ্যেও উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়। উজ্জ্বল নিজেও অপমানিত বোধ করেন। সে থেকে শিক্ষককে সায়েস্তা করার পরিকল্পনা করা হয়। ঘটনার ৮/১০দিন আগে একটি চায়ের দোকানে মানিক, উজ্জ্বল ও পিন্টু চা খায়। সেখানে পরিকল্পনা হয় অধ্যাপক শফিউলকে শায়েস্তা করতে হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী উজ্জ্বল ও পিন্টু তারই পরিচিত কাঁটাখালী পৌরসভার যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মানিককে দায়িত্ব দেয়।
এদিকে অধ্যাপক শফিউল খুনের ঘটনার সঙ্গে জঙ্গিদের সংশ্লিষ্টতা পায়নি বলে র্যাব জানায়। যদিও শফিউলের একমাত্র ছেলে সৌমিন শাহরিদ জেভিন ও শফিউলের বোন হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই দাবি করে আসছিল জঙ্গিরাই তাকে খুন করেছে তার মতাদর্শের কারণে। কমান্ডার মাহমুদ খান বলেন, ব্যক্তিগত অসৌজন্যমূলক আচরণের ঘটনার জের ধরেই অধ্যাপক শফিউল খুন হয়েছেন।
হত্যাকাণ্ডের পরপরই ‘আনসার আল ইসলাম বাংলাদেশ-২’ নামে একটি সংগঠন হত্যার দায় স্বীকার করে ফেসবুকে একটি পেজ আপলোড করে। সেখানে শফিউলকে মুরতাদ ঘোষণা করে তার ছবিতে ক্রস চিহ্ন দেয়। ওই পেজটি কারা আপলোড করেছে তা এখনো শনাক্ত হয়নি। সাংবাদিক সম্মেলনে গ্রেফতারকৃতরা জানান, তারা ফেসবুকে ওই পেজ আপলোড করেননি। অন্যদিকে, র্যাবের দাবি অনুযায়ী নাসরিন ও শফিউলের মধ্যে অসৌজন্যমূলক আচরণ সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেউ কিছু বলতে পারেনি। প্রশাসন ভবনের হিসাব শাখার একজন পদস্থ কর্মকর্তা জানান, অধ্যাপক শফিউল প্রায়ই তার কক্ষে আসতেন। তাদের মধ্যে বন্ধু সুলভ সম্পর্কের জের ধরে আড্ডা চলতো। তিনি বলেন, নাসরিন তার বিভাগে চাকরি করলেও কখনো বলেননি শফিউল তার সঙ্গে খারাপ আচরণ করেছেন। এমনকি তাদের মধ্যে কথা হয়েছে কিনা এটাও আমি জানি না। শফিউল হিসাব শাখায় আসলেও কখনো নাসরিনের সঙ্গে কথা বলতে দেখেনি।
তিনি আরো জানান, নাসরিনের স্বামী পিন্টু যুবদলের নেতা হলেও তার পরিবার কঠোর আওয়ামী পন্থি। এই পরিবারের মেয়ের সাথে আওয়ামী পন্থি শিক্ষক অধ্যাপক শফিউলের অসৌজন্যমূলক আচরণের ঘটনা ঘটলে সেটি পারিবারিকভাবেই সমাধান করা যেতো বলে ওই কর্মকর্তা মন্তব্য করেন।
অধ্যাপক শফিউলের সঙ্গে ব্যক্তিগত ভাবে ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত রাবির হিসাব পরিচালক আশরাফ উল হুদা ইত্তেফাককে বলেন, তার অধীনস্থ কর্মকর্তা নাসরিনের সঙ্গে অধ্যাপক শফিউলের কথিত ঝামেলার কথা কোনো দিন শুনিনি। এরকম হলে দুই জনের কারো এমনকি অফিসের স্টাফদের মাধ্যমেও বিষয়টি জানাজানি হতো বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জানা গেছে, নাসরিনের পুরো পরিবার আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তার বাবা শামসুল আলম কাবিল ৩০ নম্বর ওয়ার্ড (উত্তর) আওয়ামী লীগের নির্বাহী সদস্য। তার চাচা আলাউদ্দিন নগরীর মতিহার থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। আরেক চাচা রাব্বেল হোসেন ৩০ নম্বর ওয়ার্ড (উত্তর) আওয়ামী লীগের সভাপতি ও রাবির একাডেমিক সেকশনের সহকারী রেজিস্ট্রার। তার ছোট চাচা মাসুদ রানা মতিহার থানা ছাত্রলীগের যুগ্ম-আহ্বায়ক। এই পারিবারিক পরিচয় দিয়ে রাব্বেল হোসেন ইত্তেফাককে জানান, তার বড় ভাইয়ের মেয়ে নাসরিন হিসাব পরিচালকের দপ্তরে পরিবহন ও স্টুয়ার্ড শাখার ফাইল দেখেন। এছাড়া রেশমা রাজশাহী কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স ও মাস্টার্স করেন। অধ্যাপক শফিউলের সঙ্গে কথিত ঝামেলা তো দূরে থাক রেশমার সঙ্গে তার কোনো পরিচয়ও ছিল না। এমনকি অধ্যাপক শফিউলকে রেশমা কোনো দিন দেখেননিও বলে দাবি করেন আওয়ামী লীগ নেতা রাব্বেল। তবে তিনি স্বীকার করেন, স্বামীর পরিচয়ে বিগত বিএনপি সরকারের আমলে রেশমা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি পেয়েছেন।