গত ২০ নভেম্বর সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যামপাসে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে ছাত্রলীগ কর্মী সুমন চন্দ্র দাস সহ আরো কয়েকজন ছাত্রলীগ কর্মী গুলিবিদ্ধ ও আহত হওয়ার ঘটনার পর কেন্দ্রীয় সভাপতি তাদেরকে ছাত্রলীগের নয় বলে মন্তব্য করলে সিলেট ছাত্রলীগ,বিভিন্ন ছাত্র সংগটন, সূধী মহল বিষ্ময় প্রকাশ করেছেন। ছাত্রলীগসহ অনেকেই মর্মাহত হয়েছেন। বিশেষ করে সংঘর্ষে গুলি খাওয়া ছাত্রদের বেশ পিড়ীত করেছে। একই সঙ্গে তারা খুবও প্রকাশ করেছেন। ক্ষোভ ও বেদনা নিয়ে গুলিবিদ্ধ আহত সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ছাত্রলীগ সভাপতি হুসাইন মোহাম্মদ সাগর সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় গত রবিবার রাতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি খোলা চিঠিতে ঘটনার বর্ণনা দেন। সাগরের ই-মেইল থেকে চিঠিটি বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমেও পাঠানো হয়।
ঐ দিন সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত ছাত্রলীগের কর্মী সুমন চন্দ্র দাস শা‘বি ক্যামপাসে সাগরের সঙ্গে গিয়েছিলেন। ঘটনার পরপরই পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার দেখায় এবং নিহত সুমন ছাত্রলীগের কেউ নয় বলে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতির বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সাগর খবই ব্যথিত হয়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি খোলা চিঠি লিখেন।
চিঠিতে তিনি লিখেছেন শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপট, সুমন হত্যাকাণ্ড ও আমাদের বহিরাগত বলে ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহের চেষ্টা হচ্ছে বলে অসুস্থ অবস্থায় সহকর্মীর মাধ্যমে চিঠি লিখেছি এবং তাতে প্রকৃত বিষয় তুলে ধরেছি।
খোলা চিঠিতে সাগর লেখেন, ‘‘আমি হুসাইন মোহাম্মদ সাগর। সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, মাস্টার্স প্রথম বর্ষের একজন ছাত্র। বংশ পরাক্রমায় আমরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। আমি যখন বুঝতে শিখিনি তখনই বাবা-ভাইদের সঙ্গে গ্রামের মেঠোপথ ধরে জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে ছোট বাজারে যাই। আমার বড় ভাই ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি। যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি, সে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের প্রস্তাবিত কমিটির সভাপতি আমি। এ বিশ্ববিদ্যালয়টি মূলত শিবিরের আস্তানা হিসেবে সিলেটে পরিচিত ছিল। যার প্রতিটি সেমিস্টারে ছিল শিবিরের সাংগঠনিক কমিটি। আজ এই ক্যামপাসটি শিবিরমুক্ত। আমি, নিহত সুমন চন্দ্র দাস ও ছাত্রলীগের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে আমরা ক্যামপাসটি শিবিরমুক্ত করি, যা তখন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এসেছে। সিলেটের আওয়ামী রাজনীতির জ্যেষ্ঠ নেতাদের কাছে আমাদের আলাদা গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। সুমন হত্যা ও শাহাজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁদের যাওয়ার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।
বলা হয়েছে-সেদিন সকাল নয়টার দিকে আমার কাছে খবর আসে, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) ছাত্রলীগের সহসভাপতি অঞ্জন দাসের ওপর হামলা হয়েছে। নিজের একজন সহকর্মী ভাইয়ের ওপর হামলার কথা শুনে আমি, সুমন চন্দ্র দাসসহ ১০-১৫ জনসহ তাত্ক্ষণিক ছুটে যাই। গিয়ে সেখানে হতবিহ্বল হই। পূর্ব থেকে ওত্ পেতে থাকা সন্ত্রাসীরা বৃষ্টির মতো গুলি চালায়। ওদের গুলি আমার সামনে থাকা সুমন চন্দ্র দাসের ওপর লাগে। সে তত্ক্ষণাত্ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তাকে উদ্ধার করতে গিয়ে একটি গুলি আমার পেটে লাগে। আরও কয়েকজন বন্ধু গুলিবিদ্ধ হয়।
সুমন চন্দ্র দাস হাসপাতালে আনার সঙ্গে সঙ্গে মারা যায়। আমিসহ আরও কয়েকজন বন্ধু শাবিপ্রবি ছাত্রলীগের নেতা অঞ্জন দাস গুলিবিদ্ধ হয়ে এখনো হাসপাতালের বেডে শুয়ে নিহত সুমনের যাত্রী হওয়ার প্রহর গুনছি। সুমন যেন আমাদেরই ডাকছে। বলছে, বাড়ি থেকে মায়ের হাতের নাড়ু এনেছি। আমি কি একা খাব, তোমরা খাবে না? এই অবস্থায় পুলিশ আমাদের গ্রেপ্তার করে নজরবন্দী করে রাখে।’’
গুলিবিদ্ধ হয়ে গ্রেপ্তার এবং পরবর্তীতে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতির বক্তব্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেন সাগর। চিঠিতে তিনি বলেন, ‘‘গুলিবিদ্ধ হলাম আমরা। এক সহযোদ্ধাকে সারা জীবনের জন্য হারালাম। আমরা আবার গ্রেপ্তার। তাতেও দুঃখ নেই। এরচেয়ে বড় দুঃখ হচ্ছে, আমাদের কেন্দ্রীয় সভাপতি বদিউজ্জামান সোহাগ ভাই সত্যিকার ঘটনা না জেনে (যা পত্রপত্রিকায়ও এসেছে) তথ্য বিভ্রাটে প্ররোচিত হয়ে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, নিহত সুমন চন্দ্র দাস ছাত্রলীগের কেউ নয়। তখন আর বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে না, প্রাণপ্রিয় নেত্রী। সুমন ছিল একজন মুক্তিযোদ্ধা বাবার সন্তান। তিন বোনের একমাত্র আদরের ভাই। সে আমাদের প্রায়ই বলত, ছাত্রলীগের রাজনীতি করে তাঁর মুক্তিযোদ্ধা বাবার ইচ্ছা ও অনুপ্রেরণাতে। সেজন্য সব সময় মিছিলের অগ্রভাগে নেতৃত্ব দিত। তাঁর মৃত্যু হয়েছে সামনে থাকার জন্য।’’
ক্ষোভের সঙ্গে প্রশ্ন তুলে সাগর চিঠিতে বলেন, ‘‘মাননীয় নেত্রী, আপনার কাছে প্রশ্ন, ছাত্রলীগের কমিটিতে কয়জন কর্মীর স্থান আছে? প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের হাজার হাজার, লাখ লাখ কর্মী রয়েছে। আপনি জানেন, অধিকাংশ কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে ১০ বছর পর্যন্ত পার হয়ে যায়। তাই সুমন চন্দ্র দাসের মতো ত্যাগী কর্মীরা নেতা হতে পারে না। এরা কর্মী হয়ে বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে বাঁচিয়ে রাখে। আর সুমনও আমাদের মতো কর্মী দিয়ে সোহাগ ভাইরা নেতা। এ জন্য সুমন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হয়ে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ হূদয়ে ধারণ করে, সন্ত্রাসীদের গুলিতে জীবন দিয়েও ছাত্রলীগের কর্মী হতে পারল না। আমার মনে হয়, তাঁর নামের সঙ্গে দাস না থাকলে হয়তো তাঁকে শিবির কর্মী বলে চালিয়ে দেওয়া হতো।’’
সাগর আরো লিখেন,‘‘নেত্রী আপনার কাছে আকুল আবেদন, বাঁচব কিনা মরব জানি না। বাঁচলে পুলিশি নির্যাতন কবে বন্ধ হবে জানি না। কিন্তু আপনার মুখ থেকে শুনতে চাই, কমিটি গঠনের দীর্ঘসূত্রতায় যে লাখ লাখ কর্মী কমিটিতে স্থান পায় না, তারাও ছাত্রলীগের কর্মী। আমার বন্ধু মারা গেছে, আমরা গুলিবিদ্ধ হয়েছি, পুলিশ নির্যাতন চালাচ্ছে, তাতে কষ্ট নেই। আপনি শুধু সোহাগ ভাইকে একবার বলুন, আমরা ছাত্রলীগের কর্মী, বঙ্গবন্ধুর সৈনিক। আমাদের সেই অধিকারটুকু যাতে উনি কেড়ে না নেন। -বিনীত, হুসাইন মোহাম্মদ সাগর, ছাত্রলীগের একজন কর্মী’’
