বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাড়া করা বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে গতকাল রবিবার দুপুরে তৌহিদুর রহমান টিটু নামে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) এক শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। নিহত তৌহিদ বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে তৃতীয় বর্ষে পড়তেন। এ ঘটনায় বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ও ভাড়া করা অন্তত ৩০টি বাসে আগুন ধরিয়ে দেয়। এসময় আরো অন্তত ১০টি বাস ভাঙচুর করে শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাপক ভাঙচুর ও ছাত্র-পুলিশ সংঘর্ষের ঘটনায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে ইবি কর্তৃপক্ষ বিকালে সিন্ডিকেটের জরুরি সভা ডেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে। ছাত্রদের গতকাল সন্ধ্যা ৬ টার মধ্যে ও ছাত্রীদের আজ সোমবার সকাল ১০ টার মধ্যে হল ছাড়ার নির্দেশ দেয় কর্তৃপক্ষ। এদিকে তৌহিদের মৃত্যু ও গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা তদন্তে সাবেক প্রো-ভিসি প্রফেসর ড. কামাল উদ্দিনকে প্রধান করে ছয় সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটিকে আগামী ২১ দিনের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে। তদন্ত কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন— প্রফেসর ড. রুহুল কে এম সালেহ, প্রফেসর ড. মাহবুবুল আরফিন, প্রফেসর ড. ইকবাল হুসাইন, প্রফেসর ড. আব্দুস শাহীদ মিয়া এবং উপ-রেজিস্ট্রার আব্দুল লতিফ।
অন্যদিকে বাস ভাঙচুর ও পুড়িয়ে দেয়ার ঘটনার প্রতিবাদে কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহ বাস মালিক সমিতি ৫টি সংগঠনের পক্ষে অনির্দিষ্টকালের বাস ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে। পরিবহন ধর্মঘটের কারণে কুষ্টিয়ার সঙ্গে সারাদেশের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে।
নিহত তৌহিদ ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলার খালিশপুর গ্রামের আবদুল আজিজের ছেলে। চার বোন এবং দুই ভাইয়ের মধ্যে তৌহিদ তৃতীয়। আর দুই ভাইয়ের মধ্যে তৌহিদ ছিল বড়। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, বাসায় ফিরতে তৌহিদ ক্যাম্পাস থেকে ঝিনাইদহ যাওয়ার দুপুর ১২টার বাস ধরার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের কাছে আসে। সাগর নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাড়া করা বাসে (কুষ্টিয়া জ-১১-০০৪২) উঠতে গিয়ে সে পড়ে যায়। এসময় বাসের পেছনের চাকা তৌহিদের উপর দিয়ে চলে গেলে তার মাথা দেহ থেকে প্রায় আলাদা হয়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর সংবাদ দ্রুত ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়লে তার সহপাঠী ও অন্য বিভাগের শিক্ষার্থীরা ঘটনাস্থলে আসে। তৌহিদের বীভত্স মৃতদেহ শিক্ষার্থীদের আরো ক্ষুব্ধ করে তোলে। সঙ্গে সঙ্গে ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে রাখা ৩০টি বাসে আগুন ধরিয়ে দেয়। প্রশাসনিক ভবন, ভিসির বাংলোসহ বিভিন্ন অফিসে ব্যাপক ভাঙচুর চালাতে থাকে তারা। এছাড়া আরো অন্তত ১০টি বাস ভাঙচুর করে শিক্ষার্থীরা। ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে গাছের গুঁড়ি ফেলে ও টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ মহাসড়ক অবরোধ করে রাখে। আগুন নেভাতে ফায়ার সার্ভিসের টিম এসেও শিক্ষার্থীদের বাধার মুখে ঘটনাস্থলে যেতে পারেনি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ছাত্রদের লক্ষ্য করে টিয়ারসেল ও রাবার বুলেট ছুঁড়তে থাকে। ছাত্ররাও তাদের লক্ষ্য করে পাল্টা ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। এভাবে প্রায় চার ঘন্টা ধরে চলতে থাকে সংঘর্ষ, পুরো ক্যাম্পাস পরিণত হয় রণক্ষেত্রে। পুলিশ শতাধিক রাউন্ড টিয়ারসেল ও রাবার বুলেট ছুঁড়েছে। এতে তিন পুলিশসহ ২০ শিক্ষার্থী আহত হয়েছে। আহত শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় চিকিত্সা কেন্দ্র, কুষ্টিয়া সদর হাসপাতাল ও কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহের বিভিন্ন চিকিত্সা কেন্দ্রে চিকিত্সা দেয়া হয়েছে।
ছাত্ররা অভিযোগ করেন, প্রায় চার ঘন্টা ধরে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনা চললেও প্রক্টরসহ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কেউ ঘটনাস্থলে আসেনি। প্রশাসনের নির্লিপ্ততায় তৌহিদের লাশ দীর্ঘ সময় ফলিত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অনুষদ এবং কলা অনুষদের সামনে একটি ভ্যানের ওপর পড়েছিল। পরে বিকাল সাড়ে তিনটার দিকে তৌহিদের লাশ তার চাচাতো ভাই আরিফুল এসে নিয়ে যান।
পরিবহন প্রশাসক প্রফেসর ড. মামুনুর রহমান বলেন, বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ও ভাড়া করা ৩০টি গাড়িতে আগুন দিয়েছে এবং ১০টি গাড়িতে ব্যাপক ভাংচুর চালিয়েছে। ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
প্রক্টর প্রফেসর ড. ত ম লোকমান হাকিম বলেন, একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার ব্যথিত। ঘটনাস্থলে না আসার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, চাকরি প্রত্যাশীসহ অপরিচিত অনেক দুর্বৃত্ত ঘটনাস্থলে থাকায় নিজেদের নিরাপত্তার অভাবে আমরা তাত্ক্ষণিক ঘটনাস্থলে যেতে পারিনি।
ইবি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মহিবুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে ভাংচুর চালিয়েছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে উক্ত ঘটনায় একটি মামলার প্রস্তুতি চলছে।
এদিকে বিকাল সাড়ে পাঁচটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক ছাত্রীরা তৌহিদুরের মৃত্যুতে প্রশাসন ভবনের সামনে পুনরায় বিক্ষোভ করতে থাকে। সন্ধ্যা ছয়টার দিকে ছাত্রীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. আবদুল হাকিমের সঙ্গে দেখা করে আবাসিক হল বন্ধের সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এসময় তারা ভিসির কাছে জানতে চান কোন ঘটনা ঘটলে কর্তৃপক্ষ সুষ্ঠু বিচার না করে কেন যখন তখন আবাসিক হল বন্ধ ঘোষণা করে। এসময় ভিসি তাদের জানান, শহর থেকে ক্যাম্পাস অনেক দূরে হওয়ায় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে তাদের এ সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচারের আশ্বাস দেন ভিসি। একইসঙ্গে অনির্ধারিত এই বন্ধের কারণে আগামী ২৫ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া শীতকালীন ছুটি বাতিল করার বিষয়টি ভেবে দেখা হবে বলে তিনি ছাত্রীদের জানান।
ভিসি প্রফেসর ড. আবদুল হাকিম সরকার সাংবাদিকদের বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় সিন্ডিকেটের জরুরি সভায় বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তৌহিদুরের মতো একজন মেধাবী ছাত্রের মর্মান্তিক মৃত্যুতে আমরা ব্যথিত। তিনি বলেন, তদন্ত কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
কুষ্টিয়া বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাসান আবুল ফজল সেলিম জানান, ক্ষতিপূরণ ও সুষ্ঠু বিচারের দাবিতে বাস মালিক সমিতি, মোটর শ্রমিক ইউনিয়ন, ট্রাক মালিক সমিতি ও ট্যাংক লরি শ্রমিক ইউনিয়নসহ ৫টি সংগঠনের পক্ষ থেকে ঘটনার প্রতিবাদে অনির্দিষ্টকালের পরিবহন ধর্মঘট ডাকা হয়েছে।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রের মর্মান্তিক মৃত্যুতে শোক ও শোক-সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে, শিক্ষক সমিতি, বঙ্গবন্ধু পরিষদ, শাপলা ফোরাম, জিয়া পরিষদ, গ্রিন ফোরাম, ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, জাসদ ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্র মৈত্রী।