পাহাড়ে এখনও পড়ছে লাশ, ঝরছে রক্ত

আপডেট : ০১ ডিসেম্বর ২০১৪, ২৩:৫৩

পার্বত্য শান্তি চুক্তির ১৭ বছর

৩০ এপ্রিলের মধ্যে চুক্তি বাস্তবায়নের উদ্যোগ না নিলে ১ মে থেকে অসহযোগ আন্দোলনের হুমকি সন্তু লারমার। প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার বললেন- রাজপথে আন্দোলন মোকাবিলা করা হবে

আজ ২ ডিসেম্বর । পার্বত্য শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের ১৭ বছর পূর্তি। পার্বত্য শান্তি চুক্তির দীর্ঘ এই ১৭ বছরেও পাহাড়ে শান্তি আসেনি। ১৯৯৭ সালের আজকের এই দিনে পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তত্কালীন আওয়ামী লীগ সরকার শান্তি চুক্তি করলেও পার্বত্যাঞ্চলে এখনও থামেনি অস্ত্রের ঝনঝনানি। পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন করা না করা নিয়ে পাহাড়িদের মাঝে যেমন রয়েছে হতাশা, তেমনি পাহাড়ে বসবাসকারী বাঙালিদের মাঝে চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে রয়েছে প্রবল বিরোধিতা।
পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাতিল ও চুক্তি সংশোধনের দাবিতে সমঅধিকার আন্দোলন ও ইউপিডিএফ এবং চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) পাল্টাপাল্টি আন্দোলন আর সংঘাতে আজও উত্তাল পাহাড়ি জনপথ। এবারও বর্ষপূর্তিতে সমঅধিকার আন্দোলন ও জনসংহতি সমিতি বান্দরবানসহ তিন পার্বত্য জেলায় পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। চুক্তির পক্ষে অবস্থানকারী জনসংহতি সমিতি বর্ষপূর্তি উপলক্ষে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, সমাবেশ এবং চুক্তি বাতিলের দাবিতে সমঅধিকার আন্দোলনসহ বাঙালি সংগঠনগুলো আজ মঙ্গলবার কালো পতাকা উত্তোলন, কালো ব্যাজ ধারণ ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে।
আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা) আগামী বছরের ৩০ এপ্রিলের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে সরকারকে সময়সূচিভিত্তিক কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ১ মে থেকে সরকারের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলন শুরু করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
অন্যদিকে, সন্তু লারমার অসহযোগ আন্দোলনকে রাজপথে মোকাবেলা করা হবে বলে পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন সাবেক পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও রাঙ্গামাটি জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি দীপংকর তালুকদার। পার্বত্য চুক্তির ১৭তম বর্ষপূর্তির প্রাক্কালে গতকাল সোমবার জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এই হুঁশিয়ারি দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, অসহযোগ আন্দোলনের নামে সহিংসতা করে পাহাড়ে অশান্তি আর অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা করা হলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তা প্রতিহত করবে।
তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ ও পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদের দ্রুত নির্বাচন দেয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহবান জানিয়ে দীপংকর তালুকদার বলেন, নির্বাচন না হওয়ায় ১৭ বছর ধরে পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ জনসংহতি সমিতির দলীয় কার্যালয়ে পরিণত হয়েছে। তার মতে, পার্বত্য চুক্তির অধিকাংশ ধারা সরকার বাস্তবায়ন করলেও জনসংহতি সমিতির অসহযোগিতার কারণে চুক্তির অনেক ধারাই এখনো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। পার্বত্য চুক্তি নিয়ে জনসংহতি সমিতি ক্রমাগত সত্য গোপন করে অসত্য তথ্য দিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে চলেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। পাহাড়ে চলমান সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও অপহরণ বন্ধে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের ব্যবস্থা নিতেও সরকারের প্রতি আহবান জানান তিনি। পার্বত্য বাঙালি যুব ফ্রন্টও গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে সন্তু লারমার হুঁশিয়ারিকে প্রতিহত করার আহবান জানিয়েছে।
এখনও অস্ত্রের ঝনঝনানি
চুক্তির ১৭ বছর পরেও পাহাড়ে থামেনি অস্ত্রের ঝনঝনানি। এখনও গোলাগুলির শব্দে গভীর রাতে ঘুম ভাঙ্গে এখানকার মানুষের। সশস্ত্র সংঘর্ষে পড়ছে লাশ, ঝরছে রক্ত। অহরহ ঘটছে অপহরণ, গুম ও চাঁদাবাজির ঘটনা। অব্যাহত রয়েছে উপজাতীয় সন্ত্রাসী বাহিনীগুলোর আধিপত্য বিস্তারের লড়াই।
চুক্তির পর নিহত ৭৫৩, অপহূত ১৩৬৫
নিরাপত্তা বাহিনীর সূত্রমতে, শান্তি চুক্তির পর থেকে গত অক্টোবর পর্যন্ত তিন পার্বত্য জেলায় পার্বত্য চট্টগ্রামে সন্ত্রাসীদের হাতে ৭৫৩ জন নিহত ও ৯৩২ জন আহত হয়। এই সময়ে অপহূত হয়েছে ১৩৬৫ জন। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে গ্রেফতার করা হয় ৩৮৬৫ জনকে। গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটেছে ১ হাজার ২৫১টি। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে ২০টি।
শান্তি না আসার কারণ
চুক্তির বিষয়ে বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের সদস্য নিরূপা দেওয়ান হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, শান্তি চুক্তি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত না হওয়ায় পাহাড়ে শান্তি ফিরে আসেনি। পাহাড়ি ও বাঙালিরা বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে দুলছে। নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব ও সাবেক ছাত্র নেতা জাহাঙ্গীর আলম মুন্না বলেন, শান্তি চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী সন্তু লারমারাই আজ বিভক্ত। শান্তি ফিরে না আসার এটি অন্যতম কারণ।
পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক জলিমং মারমা বলেন, সরকার এখনো চুক্তির মৌলিক দিকগুলো বাস্তবায়ন করেনি। বান্দরবান পার্বত্য নাগরিক পরিষদের সভাপতি আতিকুর রহমান বলেন, জনসংহতি সমিতি পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিনিধিত্ব করে না। সে কারণে জনসংহতি সমিতির সঙ্গে যে চুক্তি হয়েছে তা সকলের জন্য কল্যাণকর নয়। বান্দরবান ইউপিডিএফ জেলা সমন্বয়কারী ছোটন কান্তি তঞ্চঙ্গ্যার মতে, শান্তি চুক্তি বর্তমানে মৃতপত্রে পরিণত হয়েছে।
চুক্তির ৭২ ধারার ৩৪টিই অবাস্তবায়িত :সন্তু লারমা
সন্তু লারমা ঢাকায় সাংবাদিকদের বলেছেন, সরকার একদিকে যেমন পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো বাস্তবায়নে তালবাহানা করে চলেছে, অন্যদিকে চুক্তি বাস্তবায়ন বিষয়ে দেশে-বিদেশে অসত্য, বিভ্রান্তিমূলক ও মনগড়া বক্তব্য প্রচার করছে। প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের অনেক মন্ত্রী-আমলারা প্রচার করে আসছেন যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মোট ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি ধারা ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে এবং অবশিষ্ট ধারাগুলোর মধ্যে ১৫টি ধারার আংশিক বাস্তবায়ন হয়েছে এবং বাকি ৯টি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াধীন। সরকারের এ বক্তব্য সর্বাংশে সত্য নয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মূল্যায়নে চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৩৪টি এখনও অবাস্তবায়িত।
সরকারের দাবি তারা আন্তরিক

বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কাজী মজিবর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সরকার তিন পার্বত্য জেলা থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর ক্যাম্প প্রত্যাহার করেছে। তিন পার্বত্য জেলার জন্য আলাদা মন্ত্রণালয় গঠন করা হয়েছে। শান্তি চুক্তির বাকি ধারাগুলো বাস্তবায়নে সরকার আন্তরিক। ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে সরকার পদক্ষেপ নিয়েছে বলেও জানান তিনি।