টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলাসহ ১১ উপজেলায় প্রাথমিক সমাপনীর (পিএসসির) খাতা মূল্যায়নে অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে। জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার একক সিদ্ধান্তে প্রতিটি উপজেলায় অব্যবস্থাপনার মধ্যে এক রুমে দুই শতাধিক এবং কোন কোন উপজেলায় আরও বেশি শিক্ষক গাদাগাদি করে বসে পিএসসি খাতা দেখায় সঠিক মেধা যাচাই এবং সঠিকভাবে খাতা মূল্যায়ন সম্ভব হচ্ছে না বলে শিক্ষকরাই অভিযোগ করেছেন।
গতকাল মঙ্গলবার মির্জাপুর উপজেলাসহ কয়েকটি উপজেলা সরেজমিনে পিএসসির খাতা মূল্যায়নে অব্যবস্থাপনার এমন চিত্র দেখা গেছে। তবে টাঙ্গাইল জেলা শিক্ষা অফিসার মোঃ এনামুল হক উপস্থাপিত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, নকল প্রতিরোধসহ বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতি দূর করতে এমন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
গত ২৩ নভেম্বর প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা শুরু হয়ে ৩০ নভেম্বর শেষ হয়। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নির্দেশমতে পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরদিন থেকে জেলা ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস পরীক্ষক, নিরীক্ষক ও প্রধান পরীক্ষক নিয়োগ দিবেন। উপজেলা শিক্ষা অফিস শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে তাদের মধ্যে খাতা বণ্টন করে বাড়ি বাড়ি পাঠাবেন খাতা সঠিকভাবে মূল্যায়নের জন্য। পরীক্ষকদের (শিক্ষক) বাড়িতে বসে সঠিকভাবে খাতা মূল্যায়ন করে নিরীক্ষকদের কাছে ফলাফলসহ খাতা জমা দিতে হবে। নিরীক্ষকরা আবার খাতা যাচাই-বাছাই ও ফলাফল দেখে প্রধান পরীক্ষকদের নিকট জমা দিবেন। প্রধান পরীক্ষক সেই খাতা দেখে উপজেলা শিক্ষা অফিসারের নিকট ফলাফল জমা দিবেন। কিন্তু এ বছর টাঙ্গাইল জেলায় সরকারি সে নির্দেশ পালন করা হচ্ছে না। টাঙ্গাইল জেলা শিক্ষা অফিসার প্রতিটি উপজেলার শিক্ষা অফিসারদের নির্দেশ দিয়েছেন বাড়ি বাড়ি খাতা না দেয়ার জন্য। পরীক্ষক নিয়োগ দিয়ে উপজেলা পরিষদের এক রুমে বসে খাতা মূল্যায়ন করে ফলাফল দিতে হবে বলে জানিয়ে দেন।
খাতা দেখার কাজে নিয়োজিত শিক্ষকরা অভিযোগ করেছেন, জনপ্রতি ২শ’ খাতা দিয়ে সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে দুইদিন। দুইশ থেকে আড়াইশ শিক্ষক এক রুমে গাদাগাদি বসে খাতা দেখায় সঠিকভাবে মেধা যাচাই সম্ভব হচ্ছে না। অভিযোগ উঠেছে, কম সময় দেয়ায় দূর-দূরান্ত থেকে আসা শিক্ষকরা খাতা দেখতে হিমশিম খাচ্ছেন। এছাড়া তাদের যে পারিশ্রমিক দেয়া হচ্ছে তার চেয়ে যাতায়াতে খরচ হচ্ছে বেশি। বিশেষ করে মহিলা শিক্ষকরা বিপাকে পড়েছেন বলে অভিযোগ। টাঙ্গাইল সদর, মির্জাপুর, বাসাইল, দেলদুয়ার, নাগরপুর, সখীপুর, কালিহাতী, ভুঞাপুর, ঘাটাইল, মুধুপর ও ধনবাড়ী উপজেলায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিটি উপজেলাতেই অব্যবস্থাপনার মধ্যে পিএসসি খাতা দেখা হচ্ছে। খাতা দেখার কাজে নিয়োজিত শিক্ষকরা চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
মির্জাপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক অফিসসূত্র জানায়, এ বছর মির্জাপুরে বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ইবতেদায়ী মাদ্রাসা থেকে পরীক্ষা দিয়েছিল ৮ হাজার ৯৮৬ জন। ৩৪টি কেন্দ্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। খাতা দেখার জন্য পরীক্ষক, নিরীক্ষক ও প্রধান পরীক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে ৩শ জন। খাতা দেখায় বিভিন্ন অনিয়ম করা হচ্ছে বলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন প্রধান শিক্ষক ও সাধারণ শিক্ষক অভিযোগ করেছেন। তারা জানিয়েছেন, নিয়ম অনুযায়ী যে শিক্ষকদের বা ছেলেমেয়ে সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে তাদের খাতা মূল্যায়ন এবং পরীক্ষার হলে ডিউটি থেকে বিরত থাকতে হবে। কিন্তু মির্জাপুরে সেই নিয়ম মানা হয়নি। যাদের ছেলে বা মেয়ে পরীক্ষা দিয়েছে তাদের দিয়ে পরীক্ষা হলে ডিউটি এবং খাতা মূল্যায়ন হচ্ছে ।
জেলা শিক্ষা অফিসসূত্র জানায়, ১১ উপজেলায় প্রায় ৮১ হাজার ছাত্রছাত্রী পিএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। খাতা মূল্যায়ন কাজে প্রায় ২ হাজার ৮শ পরীক্ষক, নিরীক্ষক ও প্রধান পরীক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
এ ব্যাপারে টাঙ্গাইল জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোঃ এনামূল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, পরীক্ষার খাতা সঠিকভাবে মূল্যায়ন এবং অনিয়ম ও দুর্নীতি দূর করতে এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। একসঙ্গে বসে খাতা মূল্যায়নে অনিয়মের কোন সুযোগ থাকে না। এছাড়া এক উপজেলার খাতা অন্য উপজেলায় দেয়া হয়েছে এবং খাতায় কোড নম্বর দেয়ায় দুর্নীতির কোন সুযোগ নেই। শিক্ষকদের খাতা দেখতে যদি সমস্যা হয় তবে তাদের আরও সময় দেয়া হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।