‘প্রধানমন্ত্রী ব্যবস্থা নিন সন্তানদের ফিরিয়ে আনুন’

আপডেট : ০৩ ডিসেম্বর ২০১৪, ২৩:৫৩

ছেলের কথা বলতে বলতে বানুয়ারা বেগম অজ্ঞান হয়ে গেলেন। সাত মাস ধরে ছেলের খবর জানেন না। কীভাবে আছে সেই চিন্তায় মায়ের পাগলপারা দশা। বলছিলেন, সাত মাস ধরে আমার ছেলে রুবেল ইরাকে কীভাবে আছে আমরা জানি না। যে কয়বার ছেলের সঙ্গে কথা হয়েছে তাতে বুঝতে পেরেছি অনেক কষ্টে আছে সে। ঠিকমতো খাবারও পাচ্ছে না। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, ‘মা হয়ে কিছু করতে পারছি না। সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা কিছু করেন। জানান, ‘ধার-দেনা ও জমি বিক্রি করে ৪ লাখ ২০ হাজার টাকা দেয়া হয়েছে। আমি নিঃস্ব হয়ে গেছি। তবুও এখন আমি টাকা চাই না, সন্তানকে ফিরে চাই’- বলে কাঁদতে কাঁদতে অজ্ঞান হয়ে যান কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার সিরাজনগরের বানুয়ারা বেগম।

গতকাল বুধবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে ইরাকে শ্রম পাচারের শিকার ১৮০ বাংলাদেশির প্রত্যাবাসন ও ক্ষতিপূরণ বিষয়ে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে বানুয়ারা ছেলে ও তার পরিবারের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরেন।
ইরাকে প্রবাসী শ্রমিক আরিফের মা মাজেদা বেগম বলেন, আরিফ সাত মাস ধরে কীভাবে আছে তার কোন খবর জানি না। ছেলেকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ভিক্ষা চাই কান্নাজড়িত কণ্ঠে মাজেদা বেগম বলেন, টাকা-পয়সার প্রয়োজন নেই, আমি আমার সন্তানকে ফিরে চাই।
শুধু বানুয়ারা বেগম ও মাজেদা বেগম নয়, ইরাকে অবস্থানরত এমন অসংখ্য প্রবাসীর স্বজন তাদের আশঙ্কা ও হতাশার কথা বলেন সাংবাদিক সম্মেলনে। এই সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করে মানবাধিকার সংগঠন রাইটস, যশোর, শিক্ষা স্বাস্থ্য উন্নয়ন কার্যক্রম ও বাংলাদেশ মানবাধিকার পরিষদ নামের তিনটি বেসরকারি সংগঠন।
লিখিত বক্তব্যে তারা জানান, ১৮০ জনের মধ্যে অধিকাংশকেই কাতারে ভালো বেতনে চাকরির প্রলোভন দেয় ক্যারিয়ার ওভারসিজ কনসালট্যান্ট লি. (আরএল নং-৪০৩) নামে একটি রিক্রুটিং এজেন্সি। দালালদের মাধ্যমে তাদের কাছ থেকে ২ থেকে ৫ লাখ বা তারও বেশি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ করেন তারা। বাংলাদেশিদের কাতারে না নিয়ে চলতি বছরের ২ মে থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে ইরাকের নাজা শহরে নিয়ে আটকে রাখা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে পাসপোর্টসহ সকল কাগজপত্র এবং মোবাইল ফোনসেট কেড়ে নেয় কোম্পানির লোকেরা। ইরাকে তাদের একটি কক্ষে বন্দী রাখা হয়। সেখান থেকে তারা মুঠোফোনে স্বজনদের জানান, নিয়মিত খাবার দেয়া হয় না। এক কক্ষে সবাইকে বন্দী রাখা হয়েছে। কোন কাজ নেই। বাড়ি ফিরতে চাইলে মারধর করা হয়। মানবপাচার এবং প্রতারণার জন্য ক্যারিয়ার ওভারসিস-এর বিরুদ্ধে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানিয়ে ভুক্তভোগীরা তাদের স্বজনদের ইরাক থেকে দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানান।
সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন মানবাধিকার সংগঠন রাইটস যশোর এর নির্বাহী পরিচালক বিনয় কৃষ্ণ মল্লিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক সি আর আবরার, ব্যারিস্টার শাহদীন মালিক, বাংলাদেশ মানবাধিকার পরিষদের প্রেসিডেন্ট এইচএম নোমান প্রমুখ।
অধ্যাপক সি আর আবরার বলেন, সব নিয়মকানুন মেনে বৈধ পথে যাওয়ার পরও তারা বিপদে আছেন। এটি কখনোই হতে পারে না। তাদের দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে। যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, তাদের জবাবদিহি করতে হবে।

শাহদীন মালিক বলেন, থানার ওসি থেকে শুরু করে রাষ্ট্রদূত পর্যন্ত সবার কাছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো ধরনা দিয়েছে। কিন্তু কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। সব ভুক্তভোগী পরিবারের কথা শুনে মনে হচ্ছে, দেশ থেকে ইনসাফ চলে যাচ্ছে। গত ছয় মাসে সরকারের কোন প্রতিষ্ঠান এসব মানুষের পাশে দাঁড়ায়নি। তিনি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন এবং ১৬ ডিসেম্বরের আগেই তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার সুস্পষ্ট পদক্ষেপ আশা করেন।