চাঞ্চল্যকর ডা. শামারুখ মাহজাবিন সুমীর মৃত্যুরহস্য উদঘাটনে আদালতের নির্দেশে বৃহস্পতিবার যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দ্বিতীয় দফা ময়না তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। দাফনের ২১ দিন পর লাশ তুলে পুনরায় ময়না তদন্ত হলো। যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবিএম নাজমুল হুদাকে সভাপতি করে গঠিত ৩ সদস্যের মেডিকেল বোর্ড ময়না তদন্ত সম্পন্ন করে। মেডিকেল বোর্ডের ওপর দুইজন সদস্য হলেন- যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রভাষক ডা. হুসাইন সাফায়েত ও ডা. জেসমিন সুমাইয়া।
মেডিকেল বোর্ডের সভাপতি সহকারী অধ্যাপক এবিএম নাজমুল হুদা ইত্তেফাককে জানান, ‘পরীক্ষার জন্য ১১টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে গোরস্থান থেকে ৫টি এবং শরীরের ৬টি। এসব নমুনা পরীক্ষার ফরেনসিক সাইন্স ল্যাবরেটরি যশোরে নেই বলে আলামত আজ-কালের মধ্যে ঢাকার মহাখালীতে পাঠানো হবে। এছাড়া মৃতদেহের ৪টি এক্সরে করা হয়েছে।’ শরীরে কোনো ফ্র্যাকচার আছে কিনা তা বোঝার জন্যই এক্সরে করা হয়েছে বলে তিনি জানান। বোর্ডের সাথে যুক্ত অপর একটি সূত্র জানায়, মৃতদেহে পচন ধরলেও গলায় জখমের একটি স্পষ্ট চিহ্ন রয়েছে। দ্বিতীয় দফায় সুরতহাল রিপোর্টেও এ জখমের উল্লেখ করা হয়েছে। কবর থেকে লাশ তোলার পর সিআইডি ঢাকার রমনা জোনের এএসপি মুন্সী রুহুল কুদ্দুস নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আব্দুস সালামের উপস্থিতিতে এ সুরতহাল রিপোর্ট করেন।
এদিকে হাসপাতাল মর্গের সামনে সুরতহাল রিপোর্ট দেখার পর মেডিকেল বোর্ডের সভাপতি সহকারী অধ্যাপক এবিএম নাজমুল হুদা যশোরের সিভিল সার্জনকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘প্রথমবার যিনি ময়না তদন্ত করেছেন, তিনি সহকারী অধ্যাপক। আমিও সমমর্যাদার। আমার ডিএফএম ডিগ্রি নেই- যেটা আগের জনের ছিল।’ এ কথায় বিব্রতকর অবস্থায় পরে সিভিল সার্জন ডা. আতিকুর রহমান খান বলেন, ‘আমি কোর্টের নির্দেশে এখানকার ডাক্তার দিয়ে মেডিকেল বোর্ড করেছি। আপনার কোনো আপত্তি থাকলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে জানান। যা করার উনি করবেন। এসময় আইও সিআইডি’র এএসপি বলেন, ‘এটা আমার দায়িত্ব না।’ এসময় ফরেনসিক মেডিসিনের নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি কেন জানতে চাইলে সিভিল সার্জন ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমি খুলনা মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপককে আসতে বলেছিলাম। কিন্তু উনি প্যারালাইজড হয়ে যাওয়ায় আসতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তাহলে ঢাকা থেকে কেন বিশেষজ্ঞ আনেননি জানতে চাইলে বলেন, ‘এটা আমার এখতিয়ারের বাইরে। আমি স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক (প্রশাসন)-কে বিষয়টি জানিয়েছি।’
মেডিকেল বোর্ড গঠনের ক্ষেত্রে ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের নিয়ম অনুসরন করা হয়নি বলে অভিযোগের ব্যাপারে গত তিনদিন ইত্তেফাকে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। দ্বিতীয়বার মেডিকেল বোর্ড গঠন করতে হলে সহকারী অধ্যাপকের চেয়ে জ্যেষ্ঠ কাউকে প্রধান করার নিয়ম। অথচ যশোরের সিভিল সার্জন ডা. আতিকুর রহমান খানের গঠিত মেডিকেল বোর্ডে যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবিএম নাজমুল হুদাকে ‘সহযোগী অধ্যাপক’ উল্লেখ করে তার নেতৃত্বে বোর্ড গঠন করা হয়।
বৃহস্পতিবার বেলা পৌনে ১১টায় কবর থেকে লাশ তোলার কাজ শুরু হয়। বেলা পৌনে ১টায় যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালে লাশ আনা হয়। বেলা ৩টা পর্যন্ত চলে ময়না তদন্তের কাজ। বিকেলে একই কবরে লাশ দাফন করা হয়। লাশ তোলার সময় কারবালা গোরস্থানে উৎসুক মানুষের ভিড় জমে যায়। এসময় নিহত ডা. শামারুখ মেহজাবীন সুমীর বাবা প্রকৌশলী নূরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, প্রথমবার ময়না তদন্তের রিপোর্ট সুষ্ঠু হয়নি বলেই দ্বিতীয়বার করতে হলো। যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, এবার সুষ্ঠু ও ন্যায়বিচার পাব বলে আশাবাদী। এ ব্যাপারে তিনি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
এদিকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মুন্সী রুহুল কুদ্দুস বলেন, ‘আমি মেয়ের বাবাকে আশ্বস্ত করেছি, যেহেতু মামলা সিআইডিতে সেহেতু প্রকৃত সত্য আমরা উন্মোচন করতে পারব।’ এরই মধ্যে তিনি ধানমন্ডির ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
