চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলার ১০টি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি গ্রাহকদের ৬৬ কোটি টাকা নিয়ে উধাও হয়ে গেছে। অন্য ৫টি সমিতি গ্রাহকদের পাওনা ৪২ কোটি টাকা পরিশোধ করছে না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। উপজেলা সমবায় কার্যালয়, ভুক্তভুগী গ্রাহক ও একাধীক সমবায় সমিতির কর্তা ব্যক্তিদের সাথে কথা বলে উপরোক্ত তথ্য জানা গেছে।
পালিয়ে যাওয়া সমিতিগুলোর মধ্যে রয়েছে, মেঘনা মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি ১৪ কোটি, ইক্রা বহুমুখী সমবায় সমিতি ৩ কোটি, বসুন্ধরা বহুমুখী সমবায় সমিতি ৩ কোটি, স্বদেশ মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি ২০ কোটি, আল-ফারুক প্রপাইটিজ ৩ কোটি, গ্রিন সোসাইটি ১০ কোটি, আমার দেশ বহুমুখী সমবায় সমিতি ৮ কোটি, আরডিপি ফাইন্যান্স ও ইনভেস্টমেন্ট কো-অপারেটিভ সোসাইটি দেড় কোটি, সবুজ-বাংলা কো-অপারেটিভ সোসাইটি ৩ কোটি ও রুরাল কো-অপারেটিভ সোসাইটি ৫০ লাখ টাকা।
এ ছাড়া আরও ৫টি সমিতি গ্রাহকের পাওনা ৪২ কোটি টাকা পরিশোধ করছে না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সমিতিগুলোর মধ্যে রয়েছে, সাইমুম বহুমুখী সমবায় সমিতি ১৭ কোটি, বিজয় মাল্টিপারপার্স কো-অপারেটিভ সোসাইটি ১০ কোটি, চাঁদপুর বন্ধু বহুমুখী সমবায় সমিতি ৫ কোটি, ইসলামী বহুমুখী সমবায় সমিতি ৭ কোটি এবং নীল দিগন্ত প্রপাইটিজ ৩ কোটি টাকা।
হাজীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শাহ্ আলম জানান, এ পর্যন্ত থানায় ২টি সমবায় সমিতির বিরুদ্ধে ৩টি মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। একজনকে গ্রেপ্তার করে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া থানায় আরো অর্ধশত অভিযোগ রয়েছে। ওসি জানান, ৪০৬ ও ৪২০ ধারা দুইটি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অতিভুক্ত হওয়ায় থানায় সরাসরি মামলা নেয়া যায় না। আদালত থেকে আবেদন আসলে আমরা ব্যবস্থা নিতে পারি।
সমবায় কার্য্যালয় থেকে পাওয়া তথ্য মতে সমিতিগুলোর প্রতারণার শিকার গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার। এসব সমিতির অর্ধশতাধিক গ্রাহকের সাথে আমাদের প্রতিনিধির কথা হয়েছে।
গ্রাহকের অভিযোগ স্থানীয় সমবায় কার্যালয় এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে যথাযথ আইনী প্রদক্ষেপ গ্রহণ না করায় সমিতির কর্তা ব্যক্তিরা কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে গা ঢাকা দিয়েছেন। একটি সমিতি আরেকটি সমিতিকে অনুসরণ করে পালিয়েছে।
উপজেলা কালচোঁ উত্তর ইউনিয়নের মহব্বতপুর গ্রামের মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, মাসিক ২ হাজার টাকা লাভে আমার ও আত্মীয় স্বজনের ২২ লাখ টাকা মেঘনা মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটিতে এফ.ডি.আর (স্থায়ী আমানত) রেখেছি। ২০১২ সালের শেষ দিকে তারা পালিয়ে গেছে। এ ঘটনায় দুদকে মামলা করেও কোন ফল পাইনি।
উপজেলার বড়কুল গ্রামের খোরশেদ আলম জানান, তিনি সাইমুম বহুমুখী সমবায় সমিতিতে ৪ বছর আগে ৬ লাখ টাকা এফডিআর রেখেছেন। এখন আসল ও লাভ কোনটাই পাচ্ছেন না। শাহ্রাস্তির নিজ মেহের এলাকার সামছুন্নাহার জানান, আমার স্বামী একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি জমি বিক্রি করে ১০ লাখ টাকা গ্রিন সোসাইটিতে রেখেছেন। ৬ মাস আগে তিনি মারা যান। আমার স্বামীর চিকিৎসার জন্য তাদের হাতে পায়ে ধরেছি এক টাকাও পাইনি। পরে হাজীগঞ্জ থানায় অভিযোগ করার পর পুলিশ তিন লাখ টাকা আদায় করে দিয়েছে। বাকি টাকা কবে পাব জানি না।
সেন্দ্রা গ্রামের বায়েজিদ হাসান জানান, তিনি ৫০ লাখ টাকা আমার দেশ বহুমুখী সমবায় সমিতিতে এফডিআর রেখেছেন। টাকা ফেরৎ চাওয়ায় সমিতির চেয়ারম্যান সোহেল তাকে মারধর করে প্রাণনাশের চেষ্টা করেছেন। মামলা করার পর ২৩ নভেম্বর পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে।
সাইমুম বহুমুখী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক ওসমান হারুন বলেন, আমাদের আড়াই হাজার গ্রাহকের মধ্যে ১৭৩০ জন গ্রাহককে সম্পত্তি দিয়ে ১৩ কোটি টাকা সমন্বয় করেছি। অন্য গ্রাহকরা সম্পত্তি নিতে চাচ্ছেন না। যে কারণে ৪ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। তিনি যে সব গ্রাহকরা এখনোও টাকা পাননি তাদের কার্যালয়ে যোগাযোগ করে সম্পদ নেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন।
ইসলামী বহুমুখী সমবায় সমিতির চেয়ারম্যান আবু ইউসুফ দাবি করেন, গ্রাহকের পাওনা ৭ কোটি টাকা তিনি পরিশোধ করেছেন, কিন্তু গ্রাহকের কাছে তার বিনিয়োগ করা ৯২ লাখ টাকা তুলতে পারছেন না। এ টাকা তোলার জন্য তিনি প্রশাসন ও সাংবাদিকদের সহযেগিতা চান। বিজয় মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটির চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান জানান, তার সমিতি পাওনাদারদের টাকা পরিশোদের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করছেন।
উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা আলো রানী সরকার জানান, প্রতিদিন ভুক্তভুগী গ্রাহকরা তার কাছে অভিযোগ নিয়ে আসছে। আমরা তাদের অভিযোগগুলো শুনানির জন্য জেলা কার্যালয়ে পাঠিয়ে দেই। তিনি বলেন, আমাদের হাতে কোন নির্বাহী ক্ষমতা না থাকায় ব্যবস্থা নিতে পারছি না। পালিয়ে যাওয়া সমিতিগুলো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দিন দিন এর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আরো কয়েকটি সমিতির অবস্থা ভালো না।
জেলা সমবায় কর্মকর্তা শেখ কামাল হোসেন বলেন, আমি এপ্রিল মাসে চাঁদপুর এসেছি। তার দাবী তিনি আসার পর কোন সমিতি পালায়নি। পালিয়ে যাওয়া সমিতিগুলোর বিষয়ে ডিসি ও এসপি স্যার একাধিক বার বৈঠক করেছেন। বর্তমানে কয়েকটি সমিতি গ্রাহকের টাকা পরিশোধ করছে না প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন।
